“অন্যের ব্যক্তিজীবন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি বন্ধ করুন”

0

দিনা ফেরদৌস:

ডিভোর্স দিতেও যোগ্যতা লাগে, তাকদ লাগে, কথাটি শুনতে খারাপ লাগলেও বলবো, যে সমাজে এখনও ডিভোর্সকে ভালো দৃষ্টিতে দেখা হয় না, একজনের ঘর ভাঙ্গার খবর নিয়ে দশজনে গল্প করে, আড্ডা দিয়ে মজা লুটে। নারীদের ক্ষেত্রে কথায় কথায় চরিত্রে আঙ্গুল তোলে। পরিবারের লোকজন তখন আত্নীয়-স্বজন, প্রতিবেশিদের এড়িয়ে চলে, তা না হলে হাজার জনের হাজার প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়।
সেই সমাজে সবকিছু উপেক্ষা করে যে বা যারা ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নেন, তাদের সাহস আছে বলতে হয়। সামাজিক এইসব ভয়ে (বিশেষ করে মেয়েদের) পরিবার পর্যন্ত ডিভোর্স নিতে নিরুৎসাহিত করেন। মেয়ে যদি স্বাবলম্বী হয়, পরিবাবে না গিয়ে একা থাকতে চায়, সেখানেও সমাজ থেকে বাধা আসে। প্রতি পদে পদে তাকে তার ব্যক্তিগত জীবনের সিদ্ধান্তের জন্য জবাবদিহি করতে হয়, যার কাছে বা যেখানে তার করার কথা নয়। সব পুরুষের যে এই সময়টা ভালো কাটে তা না, মানসিক দিক দিয়ে খারাপ গেলেও সামাজিক দিক দিয়ে তার কোনো জবাবদিহিতা থাকে না, ফলে ব্যাপারটা কাটিয়ে উঠা অনেকটা সহজ হয়।
সিলেটে আমাদের পাড়ায় ‘সুরতুন’ নামে এক পাগলী ছিল। কালো শরীর, জটানো চুল, ঠোঁটের দু’পাশে ঘা, শরীরের আঁশটে গন্ধ দূর থেকে নাকে আসতো। রাস্তায় ঘুমাতো আর ভিক্ষা করে খেতো। প্রতি বছর তার কোলে থাকতো নতুন বাচ্চা। তার কোনো বাচ্চাকেই বড় হতে দেখিনি আমরা। কেউ চাইলেও সে বাচ্চা দিতো না। সুরতুনের স্বামী নেই, সুরতুনের বাচ্চার বাপ নেই, সমাজ নেই, ধর্ম নেই। সুরতুনকে কেউ ঘাঁটাতে আসে না। চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন করে না, সে কিভাবে বাঁচে, কোথায় থাকে, কার সঙ্গে ঘুমায়, কীভাবে বাচ্চা প্রসব করে, ইত্যাদি কোন বিষয় নিয়ে এই সমাজের কারো মাথা ব্যথা নেই। পাগল হয়ে সুরতুন বড় বাঁচা বেঁচে গেছে। পাড়ার সকলে তাকে ভিক্ষা দেয়, কাপড় দেয়, খাবার দেয়। সুরতুন খেয়ে পরে বাঁচতে পারে। এই হচ্ছে পাগলী সুরতুনের স্বাধীন  জীবন।
সুরতুনের জীবনের গল্প এখানে প্রসঙ্গিক না। কিন্তু চাইলে অনেক কিছু আমরা বলাবলি না করে স্বাভাবিক ভাবেও যে নিতে পারি, তার জন্য এই গল্প। সুরতুনও একটি মেয়ে, যে তার মতো করে বাঁচে, বা আমরাই বাঁচিয়ে রাখি বিনা প্রশ্নে।
এখন আসি আমাদের ভদ্রলোকদের সমাজে। যেখানে সব সময় থাকতে হবে, পাছে লোকে কিছু বলে ফেলতে পারে এই ভয়ে ভয়ে। এখানে বিয়ে করলেও লোকজন খোঁচাবে, না করলেও খোঁচাবে। বিয়ে করে সুখী দেখাতে না পারলেও খোঁচাবে। ইন্টারনেটের যুগে সুখ-অসুখ ভেতরে যাই থাক, সুখী দেখানোটা খুব সহজ এখন। দু’জনের ঘেঁষাঘেঁষি একটি সেলফিই যথেষ্ট।
বলতে চাচ্ছি না যে, সকলে নাটক করে। ভাল মুহূর্ত তুলে ধরে রাখতে পারা অনেক আনন্দের। কিন্তু সবাই যখন ভালো মুহূর্তের ছবি তুলে রাখছে, অনেকে হয়তো আগে রাখতো, এখন পারছে না। ঠিক সেই সময়ে যদি কেউ ইনবক্স করে জানতে চায়, “ব্যাপার কি? বহুদিন একসঙ্গে ছবি দেখি না, দু’জনকে একসঙ্গে দেখতে কী যে ভালো লাগে, প্লিজ প্লিজ প্লিজ দু’জনের একসঙ্গে ছবি দিন”। এ জাতীয় কথা জেনে ভাবার দরকার নেই, যে তিনি আপনাকে খুব ভালবাসেন। এর অর্থ হচ্ছে আপনাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক কেমন যাচ্ছে তা অনুসন্ধান করা। হতেও তো পারে আপনি সেই মানুষটি থেকে ধীরে ধীরে নিজেকে সরিয়ে নিতে চাচ্ছেন। কিন্তু কারো সঙ্গে বিষয়টি শেয়ার করতে চাচ্ছেন না।
আসল কথা হচ্ছে, আপনি ব্যক্তিগত জীবনের কৈফিয়ত কারো কাছে দিতেও তো বাধ্য না। সংসার যার, তার ভালো লাগলে করবে; না লাগলে করবে না। ইচ্ছে হলে এক সাথে ছবি দেবেন ,ইচ্ছে না হলে দেবে না। কিন্তু সমাজের বেশিরভাগ লোকেরই অভ্যাস হচ্ছে, অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলানো, সে ফেইসবুকে হউক বা সরাসরি।
এজন্যই এই সমাজে একা থাকতে সাহস লাগে, ডিভোর্স দিতে যোগ্যতা লাগে। কারণ মেয়েদের একা থাকার উপযোগী আমাদের এই সমাজ না, মেয়েদের নিরাপত্তার দায়িত্ব তার একার। সেজন্য অনেক নারীই ডিভোর্সের পূর্বে প্রস্তুতি নেন। সেই নামটি বা ছবিটি ধীরে ধীরে মুছে ফেলতে চেষ্টা করেন। নিজের মতো করে আলাদা পরিচয়ে থাকতে চান। সেখানেও বাধা আসে, যাতে মেয়েটি বুঝতে পারে পুরুষ ছাড়া কোনো কিছুই একা একা সম্ভব নয়। রাম, শ্যাম, যদু,মধু সকলে তার পিছনে লেগে পড়েন। একসময়কার জড়াজড়ি করা সেলফিতে লাইক মেরে, মুখে যারা বলতেন; সব ঢং ,আজ তারাই বলছেন, একসাথে দু”জনকে দেখে কী যে ভাল লাগতো! কেমনে কী হলো? কেমনে কী হলো’র দুঃখে দুনিয়া জানাতে লাগলেন। আহা উহু করে মায়াকান্না জুড়ে দিলেন। তাই বলি, দয়া করে এইসব মায়াকান্না বন্ধ করুন।

যারা ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাদের নিজেদের মতো করেই থাকতে দিন। হতে পারেন তিনি সেলিব্রিটি, কিন্তু সংসার’টাতো তাকে ব্যক্তিগত বোঝাপড়া করেই করতে হয়। কে কয়বার সংসার ভাঙ্গবে আর কয়বার গড়বে এটা তার একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে চুলকানি বন্ধ করুন। আপনাদের কারণেই মানুষের জীবনটা এতো জটিল হয়ে উঠে। এজন্যই বলা ডিভোর্স দিতে যোগ্যতা লাগে। আর প্রেমহীন সংসার মানিয়ে নিয়ে, মেনে চলতে মেরুদণ্ডহীনতাই যথেষ্ট। ভালো থাকতে পারে না বলেই মানুষ ডিভোর্স দেয়। সুখের সাগরে ভেসে কেউ ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নেয় না। তাই ডিভোর্সকে সম্মান করতে শিখুন। আর অন্যের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি বন্ধ করুন।

লেখাটি ৬,১৮৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.