নারী কোটা থেকে কবে মুক্তি পাবেন ‘হেনা দাস’রা?

0

সুচিত্রা সরকার:

রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হেনা দাস ২০০৯ সালের ২০ জুলাই মারা যান। হেনাদি’র মৃত্যুদিন আমারও ব্যক্তিগত শোকের দিন। একলা একলা হেনাদি’কে নিয়ে স্মৃতি-কাতর হবার দিন। ব্যক্তিগত শোকের দিন হেনা দাসের পরিবারের (দীপা আন্টি আর চম্পা আন্টির)। আর কারো নয়!

এর কারণ দুটো।

প্রথমত মানুষ অতীতকে পেছনে ফেলে সামনে এগোয়! প্রথমত, মানুষ শোকে বুঁদ হয়ে হাজার বছর বাঁচতে পারে না। প্রথমত, দিবসে নয়, মানুষ মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে কর্মে।

প্রথম কারণটা বারবার বলে, নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম। আর এরই মধ্যে নিজেকে গুছিয়ে নিলাম দ্বিতীয় (আসলে এটাই মুখ্য কারণ) কারণটা বলার জন্য! হেনা দাস ১৪ বছর বয়সে ছাত্র আন্দোলন করেছিলেন। সময়ের প্রয়োজনে ছিলেন নানকার বিদ্রোহীদের সঙ্গে। চা শ্রমিকরা, তাদের আন্দোলনে পাশে পেয়েছিলেন তাঁকে। দেশের মুক্তির সংগ্রামে, নিজের মতো করে লড়াই করেছেন পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সঙ্গে। শিক্ষা আন্দোলনে ছিলেন সামনের কাতারের যোদ্ধা। সুফিয়া কামাল নারীমুক্তির জন্য লড়াই করছেন। সঙ্গে ছিলেন হেনাদিও।

আর এর বাইরে দেশের যত আন্দোলন, সংগ্রাম, প্রগতিশীল প্রতিবাদ- হেনা দি’ কখনো পিছপা হননি। তাঁর বিরাশি বছর বয়সে, তাঁর চোখের ‘বিকল্প চোখ’ ডাকতেন আমায়! দেখেছি তখন, দেশের বিপদে কেমন আকুল! মরীয়া তিনি! ভুলেই যেতেন, এখন আর শরীর লড়াই করতে পারছে না। চোখ স্পষ্ট দেখছে না। রক্তকণিকা বলছে, আমায় এবার বিশ্রাম দাও! জীবনীশক্তি থেমে যেতে চাইলেও কাজকে তিনি অবসর দেননি! আন্দোলনকে, লড়াইকে অস্বীকার করেননি! হুইলচেয়ারে করেই সামিল হয়েছেন আন্দোলনে!

সেই হেনা দি’র মৃত্যুর পর পত্রিকাগুলো ছবি, শোকগাঁথা, স্মৃতিকথায় সয়লাব তিনি। সেও সময়ের প্রয়োজনেই। একটা নাগরিক শোকসভা হল শহীদ মিনারে! বোদ্ধা ও বিজ্ঞগণের মৃত্যুর পর বা সত্তর বা আশিতম জন্মদিনেই তাঁর নামে স্মারকগ্রন্থ বেরিয়ে যায় আজকাল! হেনাদি’র মৃত্যুর পর বছরখানেক অপেক্ষা করেছিলাম। না, কেউ প্রকাশ করতে উদ্যোগী হয়নি স্মারকগ্রন্থ! হয়তো গ্রন্থ হবার মতো অতো বড় ছিলেনই না দিদি! অথবা তাঁর চেয়ে আয়তনে ছোট যারা, তারা পুরুষ বলে ‘ইগো’তে লেগেছে! হয়তো তারা ভেবেছেন, তাঁকে নিয়ে স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ না পেলে, কিছু যাবে আসবে না!

মৃত্যুর দুবছর পর একটা রাজনৈতিক দলের মুখপত্রে (নাম উল্লেখে আপত্তি) আমাকে লিখতে বলা হলো। তবে, নারীপাতায়! আমার ঘোর আপত্তি! নারী পাতায় কেন! হেনাদি’ কি শুধু নারীর সম্পত্তি! তাঁকে নিয়ে লিখতে হলে, সম্পাদকীয়তেই লিখবো। লিখলাম না। বদলে দেখলাম সম্পাদকীয় পাতায়, হেনাদিকে নিয়ে আমারই একটা পুরোনো লেখার নিচে দু’লাইন বাড়িয়ে দিয়ে একজন নারী স্মরণ করেছেন তাঁকে! দীনতায় হাসলাম। কাঁদলাম হেনাদি’র জন্য।

যে মানুষটা সারা জীবন ব্যয় করেছেন, মানুষের ‘মঙ্গলের’ জন্য, সেই মানুষটা মৃত্যুর পর হয়ে গেল স্রেফ একজন নারী। ‘কোটাবন্দি নারী’। যাকে নিয়ে লিখতে গেলে ‘নারী হওয়া চাই’ অথবা একটা নারী পাতা! আচ্ছা, পুরুষতন্ত্রের কোন যুক্তিতে এটা পড়ছে? হেনা দাসকে স্মরণ করতে হলে, নারীদেরই কেন এগিয়ে আসতে হবে? পুরুষদের কলম চলে না? তারা একজন নারীকে নিয়ে, তাঁর আত্মত্যাগকে নিয়ে, তাঁর অবদানকে নিয়ে লিখতে পারবেন না? একজন নারী যেমন করে লেখে, তেমনি? একজন বিপ্লবীর মৃত্যুদিন কেন নারী শাখার আড়ম্বরে আটকে থাকবে? সংকটটা কার? কাদের? কোন গোষ্ঠীর!

সংকটটা এই যে, আমরা গুলিয়ে ফেলেছি মনীষীদের অবদান। আমরা ভুলে যাচ্ছি, মানবতার মূল কথা! বেগম রোকেয়া নারীদের জন্য স্কুল খুলেছিলেন, শুধু নারীদের জন্য নয়! মানুষের জন্য। সে মানবজাতির একটা অংশের জন্য। যারা পিছিয়ে আছে। পেছনের সারিতে সেদিন যদি পুরুষরা থাকতেন, বেগম রোকেয়া তাদের জন্যই স্কুল খুলতেন! তাঁর কথাগুলো বারবার পড়ে, আমি এই বুঝেছি! প্রীতিলতা ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে, শিরিন বানু মিতিল মুক্তিযুদ্ধে পুরুষের পোষাক পড়ে যুদ্ধ করেছেন। নারীদের কোটা থেকেই কি সেদিন গিয়েছিলেন যুদ্ধে? প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, নারী কোটা থেকেই কি একটা সায়ানাড গ্রাম মুখে তুলে নিয়েছিলেন? ওরিয়ানা ফাল্লাচি নারী কোটা থেকে লিখেছিলেন ‘হাত বাড়িয়ে দাও’? বা ভার্জিনিয়া উলফ? সিমোন দ্য বোভেয়ার এর ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’ এ কি নারী-পুরুষের উভয়ের সমতার কথা লেখা নেই?

তাহলে কেন, নারীদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে হলে, নারীদেরই এগিয়ে দিতে হয়? কেন, নারী দিবসগুলো শুধু নারীর উদযাপনের অনুষঙ্গ হয়ে রয়? এটাও রাজনীতি। বেগম রোকেয়াসহ অন্য সবাই যুগে যুগে, এই রাজনীতি ভেঙেই নারী-পুরুষের সমতার সমাজ গড়ার কথা বলেছেন। কোনো ‘কোটাবন্দি’ সমাজ সেটা নয়!

আর এই পুরুষতন্ত্র নামক রাজনীতির পাণ্ডারা চায়, নারীরা লড়ছে, লড়ুক। দেখি-ই না কী করে! যতসব ছেলেমানুষি! আর মনে মনে বলছে, আজ থেকে তাদের আমরা ‘একঘরে’ করলুম! তারা করুক, তাদের মতো করে লড়াই- সংগ্রাম! পুরুষের ‘বৃহৎ পরিসরে’ একসঙ্গে চলার ক্ষমতা এখনো তাদের হয়নি! সেদিন পর্যন্ত নারীরা ‘স্মরণদিবসে’ও ‘কোটাবন্দি’ হয়েই থাকুক!

বেচারা পুরুষতন্ত্র! জানেই না কোটাবন্দি থাকতে থাকতে কতটা শক্তি সঞ্চয় করছি আমরা, একটা সমতার সমাজের জন্য!

২০.০৭.২০১৭ লালবাগ, ঢাকা রাত ১১.৩৪ মিনিট

লেখাটি ৩৬৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.