ম্যাডাম, আপনার আইকিউ কত?

0

নাসরীন মুস্তাফা:

ম্যাডাম নদী যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন। খবরে দেখলাম, তিনি এতে বড়ই মন:ক্ষুন্ন হয়ে পুলিশকে অনুরোধ করেছেন, তাকে কোনো এক পাঁচ তলার ছাদে নিয়ে যেতে। সেখান থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করবেন।

মন:ক্ষুন্ন হওয়ারই কথা।

প্রাচীন মিশরের মমি মাটির তলা থেকে বেরিয়ে এলে যেরকম কংকালসার রূপে দেখা যায়, ম্যাডামের অসামান্য আদরে এক সামান্য আদুরি সেই রকমের চেহারাসুরত নিয়ে আবিষ্কৃত হয়েছিল চার বছর আগে। তিনি নিজেই নাকি ডাস্টবিনে ফেলতে গিয়েছিলেন আদুরিকে। মানুষ হলে ফেলতেন না। ছোটলোকরা মানুষ হয় না বলেই তাকে পচে যাওয়া খাবার বা নষ্ট হয়ে যাওয়া জিনিষপত্তর ভেবে ডাস্টবিনে ফেলতে গিয়েছিলেন। পচা সব কিছু তো ডাস্টবিনেই জমা হয়, তাই না?

ম্যাডাম নদী শিক্ষিত মানুষ। ছোটবেলা থেকে ডিম-দুধ খেয়ে মাথার চুলে ঝলক যেমন এনেছেন, খুলির ভেতরকার গ্রে ম্যাটারেও পুষ্টি যুগিয়েছেন কম না। আর তাই পুষ্টির গুণে তিনি উচ্চমাত্রার আইকিউওয়ালা মানুষ। আর তাই তিন বোঝেন, কিভাবে কোন্ কাজটি সম্পন্ন করতে হয়। এই আইকিউ দিয়েই বুঝেছিলেন, পচা আদুরিকে ডাস্টবিনে ফেলতে হবে। এই আইকিউ দিয়েই বুঝলেন, পাঁচ তলা থেকে তার লাফিয়ে পড়া উচিত।

সমাজের সবার আইকিউ সমান নয়। ম্যাডাম নদী নিশ্চয় তাজ্জব হয়েছিলেন যখন দেখলেন কেউ তার আইকিউওয়ালা পজিশনের গুরুত্ব দিল না। ডাস্টবিনে পচা আদুরিকে ফেলার অপরাধে গড়পড়তা আইকিউওয়ালা পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গেল। হতদরিদ্র আদুরির মা, যার আইকিউ আছে কী নেই, তা নিয়ে সেমিনার হতে পারে, সে কী না মামলা ঠুকে দিল! বিজ্ঞ আদালত সেই মামলার রায় ঘোষণা করেছেন। এতে ম্যাডাম নদীর আইকিউ-এর প্রতি সম্মান দেখানো হয়নি। আইকিউসমেত মাথাটা নিয়ে ম্যাডাম নদীকে জেলে কাটাতে হবে দিন। এই দুঃখেই তিনি আবদার করেছেন, তাকে পাঁচ তলা থেকে লাফিয়ে পড়তে দিতে হবে। পাঁচ তলা থেকে লাফিয়ে পড়ার পর যদি মরেন তো, ল্যাঠা চুকে গেল। আর যদি না মরেন, হাত-পা ভেঙ্গে দলা হয়ে পড়লে ছোটলোকদের কাতারেই কিন্তু ঠাঁই হবে। উচ্চমাত্রার আইকিউ কোন্ পানিতে গুলিয়ে খাবেন তখন, তা কি ভেবেছেন ম্যাডাম?

এতো কিছু ভাবতাম না। কে পাঁচ তলা না দশ তলা থেকে লাফাবে, তার খোঁজ নেওয়ার সময় কি পাই আমি? এরপরও ভাবতে হলো। ম্যাডাম নদীর যাবজ্জীবন হয়েছে, এই খবরের সাথে সব পত্রিকায় দেখছিলাম আদুরির এখনকার মুখ আর তখনকার কংকালসার শরীর। যে মা শিশু আদুরিকে খেতে দিতে না পেরে ম্যাডাম নদীর বাসায় কাজে দিয়েছিল, সে মা তাকে পেয়েছিল না খেয়ে কংকাল হয়ে যাওয়া অবস্থায়। সেই মা-ই তাকে এই চার বছরে বেশ গোলগাল মুখের মিষ্টি কিশোরীতে পরিণত করেছে। যদিও আদুরির চোখ এখনো সেই রকম। চার বছর আগে যেমন ছিল, এখনো আদুরির চোখের দৃষ্টিতে হাহাকার। মানসিক ধাক্কা সামলে নিতে ওর আর কত সময় লাগবে, কে জানে!

কেন ম্যাডাম নদী মেয়েটার ওরকম হাল করেছিলেন? যাবজ্জীবন খবর প্রকাশের পর আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা ম্যাডামদের নানা রকমের আলাপ শুনছি। কাজের মেয়েদের গায়ে হাত তুললে হৈ চৈ হয়, কাজের মেয়েগুলো যে কী জিনিস, তা নিয়ে দীর্ঘশ্বাস-চাপা গরগর-দপ্ করে জ্বলে ওঠা চোখের দৃষ্টিও নজরে এলো। আদুরিদের পেটানোতে সায় আছে বাহে, কিন্তু ধরা পড়ে গেলে মানবতার নাম জপো।

এই যে কর্নেলের স্ত্রী আয়েশা লতিফ, ডিম ঠিকঠাক করে ভাজার মতো আইকিউ নেই বলে সাবিনাকে পিটিয়ে তক্তা করতেন নিয়মিতভাবে। খবরটা চাউর হয়েছে বটে, ম্যাডাম ধরা পড়েননি এখনও। সেই খবর অন্তত আমরা পাইনি। ধরা যদি না-ই পড়েন, তাহলে তো তার কোনো দোষ নেই। দিনগত অভ্যেসে কে আর মনে রাখবে তার পাপ? সাবিনার ক্ষতকে ভুলে যাওয়া তো আরও সহজ।

হ্যারি পটারের একখানা চাদর ছিল, যা গায়ে জড়ালে অদৃশ্য হয়ে যেত। কেউ দেখতে পেত না। আয়েশা লতিফ ম্যাডাম সেরকমই এক জাদুর চাদর গায়ে পরেছেন, আমার আইকিউ দিয়ে এইটুকু অন্ততঃ বুঝেছি। চাদরের আড়ালে সাবিনার ক্ষতও আছে, আর তাই চোখের আড়ালে পড়ে যাওয়া সাবিনা ও সাবিনার ক্ষত ভুলে যাবো আমরা। এই জাদুর চাদরটা কেন আমাদের সবাইকে এক সাথে জড়িয়ে নেয় না? তাহলে তো আমরাও অদৃশ্য হতে পারতাম আমাদের থেকে।

আমাদের কপালে অত সুখ নেই বলে কেবলি ভাবনারা কুটকুট করে। কেন ম্যাডামদের সাথে সাবিনা-আদুরিদের সম্পর্ক এমন? ওরা কোনো কাজ ঠিকমতো করতে পারে না। কথা শোনে না। আলসে। বেয়াদ্দপ। কিছু বললে গোঁজ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। চান্স পেলেই বাচ্চার দুধটা-সিরিয়ালটা খেয়ে ফেলে। নোংরার হদ্দ। দেখলেই গা জ্বলে। শোকর নেই। ভালো ভালো খায়, ভালো ভালো জামা পরে, তা-ও মানুষ হলো না। আমার আশেপাশের ম্যাডামদের এতো কথা আর হাবভাব দেখে আমিই প্রশ্ন করি, ম্যাডাম আপনার আইকিউ কতো?

আপনারা কত কিছু জানেন, কেবল জানেন না গরীবের বাচ্চার শরীর অপুষ্ট। পুষ্টির অভাবে মস্তিষ্কের বিকাশ ঠিকমতো হয় না। এই গরীবের বাচ্চাদের আইকিউ খুব কম, কখনো কখনো একদমই নেই। তাই ওরা আপনার মতো করে বোঝে না। আপনার মস্তিষ্কের মতো করে কিছুতেই ওদের মস্তিষ্ক কাজ করতে পারে না।

সাম্প্রতিক ঘটনা জানেন তো? অভাব যে শিশুর মস্তিষ্ক সঠিকভাবে বিকশিত হতে দেয় না, তা বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করে ফেলেছেন। বিশ্বাস রাখুন বিজ্ঞানের সত্যে। সম্মান করুন নিজের আইকিউকে। আর শুনুন, সৃষ্টিকর্তা আদুরি-সাবিনাদেরকে আইকিউ কম দিয়েছেন বলে দোষটা সৃষ্টিকর্তার, মারতে হলে তাকেই মারুন। এই আইকিউহীন আদুরি-সাবিনাদের গালে ছুরি পুড়িয়ে ছ্যাঁকা দিলেও যে ওদের আইকিউ বাড়বে না, এইটা আপনি বোঝেন না ম্যাডাম?

এই কথাটা বোঝার জন্য আর কত আইকিউ দরকার হবে আপনার, বলুন তো?

লেখাটি ১,৭০৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.