‘মেঘের ওপর যে বাড়িতে আছেন, ভাল আছেন তো’?

humayun-ahmed.জিনাত জোয়ার্দার রিপা: খুব ছোটবেলায় একটা নাটক দেখেছিলাম। নাটকে আমার বয়সী মেয়েটা পাঠ্যবই ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করছে। কী যে তৃপ্তি পেয়েছিলাম! আমি যা করতে চাই কিন্তু পারছি না, সেটা কাউকে করতে দেখলে একধরনের আনন্দ কাজ করে। এটা সেই আনন্দ। অনেক পরে বুঝেছি মেয়েটা শীলা। ওই নাটকের যিনি জনক, মেয়েটিরও তিনি। আচ্ছা, আপনাদের কি মনে পড়ছে নাটকটির কথা? লেখাটি যাঁরা পড়ছেন তাঁদের মধ্যে আশিভাগের মনে পড়ার কথা। ‘প্রিয় পদরেখা’ নামের নাটকটি ঘন্টাখানেকের জন্য আশির দশকের মধ্যবিত্তকে এক করেছিল।

তাঁর নাটকের রস, মধ্যবিত্ত আবেগ, কান্না, হাসি শুধু এই একটি নাটকেই আটকে ছিল? না তো! ‘এই সব দিনরাত্রি’র টুনির মৃত্যু চোখে জল এনেছে সবার, ‘বহুব্রীহি’ প্রাণ খুলে হাসায়নি কাকে?
মনে করতে পারেন বাঙ্গালি মুক্তিযুদ্ধের পর শেষ কবে এক হয়েছিল? আমার মনে আছে, যদিও তখন খুব ছোট আমি। সেই যেবার ‘কোথাও কেউ নেই’-এর বাকেরের ফাঁসির রায় হল, তখন তার ফাঁসির রায়ের বিরোধিতা বাঙ্গালিকে এক করেছিল মায়ায়, এক তীব্র আবেগের টানে।
একজন লেখক কতখানি শক্তিধর হলে গল্পের এক চরিত্র বিশ শতকের আধুনিক মানুষকে এতটা আন্দোলিত করতে পারে!
এই লেখকের ক্ষমতা যখন আমাকে প্রভাবিত করেছে, তারও অনেক পরে প্রভাবের কার্যকারণগুলো ‘বোদ্ধাদের’ কল্যাণে আমি বুঝেছি।
সম্পূর্ণ বিপরীত বিষয় একই সঙ্গে ধারণ করার এক অলৌকিক ক্ষমতা ছিল তাঁর। যুক্তি আর অযুক্তিবাদের প্রবাদ পুরুষ তাঁরই সৃষ্টি দুই চরিত্র মিসির আলী এবং হিমু। মানুষের চেতন আর অবচেতন অবস্থার ধারক হওয়ার আশ্চর্য ক্ষমতা এই দুই চরিত্রকে দিয়েছিলেন তাদের স্রষ্টা।
বৈপরীত্য ছিল তাঁর আবেগের জায়গাতেও। একই সঙ্গে ম্যাটেরিয়াল এবং নন-ম্যাটেরিয়ালকে ভালবাসতে শিখেছি তাঁরই বদান্যতায়। সেই যে আমার তের বছর বয়সের প্রেম, তার জন্য জনম জনম কাঁদার আনন্দ তিনিই শিখিয়েছেন। বর্ষা, কদম, জোৎস্না, হাসি, কান্না আর যত আবেগের ফুলঝুড়ি-তার সবকিছুকে আমার গহন মগ্নতায় ঠাঁয় করে দিয়েছেন তিনিই! এগুলো সব অ্যাবস্ট্রাক্ট-বিমূর্ত।

ভাপ ওঠা শিউলী ফুলের মত ভাত, তাতে ছড়িয়ে দেওয়া ঘি, সঙ্গে একটা শুকনো লঙ্কা পোড়া-আমার খাওয়ার রুচিতে বাঙ্গালিয়ানার দখলদারও যে তিনিই। একবার মিলিয়ে দেখুন তো, বর্ষা, কদম, জ্যোৎস্না, হাসি, কান্নার সঙ্গে ভাপ ওঠা ভাত, ঘি, শুকনো লঙ্কা পোড়া জিনিসগুলো কন্ট্রাডিক্ট করছে কী না! করছে বৈ কী! তবে? আসলে মানুষটা ভালবাসতে শিখিয়ে গেছেন, অকাতরে, অগাধ।

আমার সংগ্রহে হুমায়ূনের সব বই আছে শুনে বছর তিনেক আগে একটি বাংলা পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক বলেছিলেন, ‘ভাল বই পড়েন। অখাদ্য পড়ে কিছু শেখা যায় না।’ খুব জানতে ইচ্ছে করে, তিনি যেখানে আছেন সেখান থেকে কী দেখতে পাচ্ছেন, শুনতে পাচ্ছেন আমাদের? তাঁকে খুব বলতে ইচ্ছে করে নিজের পাণ্ডিত্য জাহিরের মোহে আমার কখনো ইচ্ছেই করেনি নিমবুদ্ধিজীবী সাজতে। আজ জানি, আমি ভালবাসতে শিখেছি। জোৎস্নাকে, বৃষ্টিকে, কদমকে, রবীন্দ্রনাথকে, ঝগড়া, অভাব আর মধ্যবিত্তকে, লজিক আর অ্যান্টিলজিককে! কে বলে তিনি শেখাতে পারেননি?

বড় বড় পত্রিকাগুলো জীবিতাবস্থায় তাঁর সঙ্গে থাকা লোকগুলোকে স্মৃতিকথা লিখতে বলে, সেগুলো ছাপে। আমার হাসি পায়। যে মানুষটা আমার বেড়ে ওঠায়, আবেগে, আকাঙ্খায়, ভালবাসায়, কান্নায়, চমকে-চাওয়ায়, কৌতুকে-কথায় মিশে আছে, প্রতি পক্ষান্তরের জোৎস্নায় যাঁর সাথে আমার দেখা হয়, বর্ষার প্রথম জলে, কদমে যাঁর বলে যাওয়া কথাগুলো মিলে থাকে অবিমিশ্র- তাঁর চেয়ে আপন আর কে!

শুধু একটি জিনিস তিনি পারেননি। আমি হিমু হতে চেয়েছিলাম। তিনি তা হতে দিলেন না। পুরোপুরি হিমু হতে পারলে আজ তাঁর ঠিকানা বদলের বছরখানেক পরেও এভাবে আমাকে তিনি কাঁদাতে পারতেন না।
প্রিয় হুমায়ূন আহমেদ, মেঘের ওপর যে বাড়িতে আছেন, ভাল আছেন তো?

লেখক পরিচিত: সাংবাদিক।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মায়া নামক জিনিসের ঊর্ধ্বে থাকতে চেয়েছি, পারি নাই।। আপনি অর্ধেক হিমু করে রেখে গেলেন।।

অনেক ভাল লিখেছেন জিনাত আপু।। পড়া শেষ করে দেখি চোখের কোনে জল।।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.