“সুন্দরী শিক্ষিতা কনে আর ‘সারপ্রাইজড’ মামা!!!”

এনামুল হক:

মামা দেশে এসেই ঘোষণা দিলেন সুন্দরী শিক্ষিতা ছাড়া বিয়ে করবেন না। দীর্ঘদিন আমেরিকায় থেকে যথেষ্ট টাকা পয়সা ইনকাম করেছেন, সময়ও সুযোগের অভাবে নিজে লেখা পড়ে করতে পারেননি তাই বিয়ে করবেন একজন শিক্ষিত মেয়েকে, কম পক্ষে অনার্স পাশ। কথায় কথায় ডায়লগ ঝাড়লেন, “গিভ মি এন এড্যুকেটেট মাদার, আই উইল গিভ ইউ এন এড্যুকেটেট নেশন”। মামার কথা মতো আমরাও ঝাঁপিয়ে পড়লাম সুন্দরী শিক্ষিতা মেয়ের খুঁজে।

আমাদের ফরিদ মামা দীর্ঘ ১৬ বৎসর আমেরিকায় ছিলেন। তিনবার ইন্টারমিডিয়েট ফেল করে তাকে পেয়ে বসলো আমেরিকার নেশায়। এবং তার সৌভাগ্যই বলতে হবে কিভাবে জানি আমেরিকার দুর্লভ ভিজিট ভিসা তিনি পেয়ে গেলেন। দীর্ঘ ১৬বৎসর আমেরিকায় আটকে ছিলেন গ্রীন কার্ড আর ডলারের বেড়াজালে। গ্রীন কার্ড বাগিয়ে যথেষ্ট পরিমাণ ডলার ব্যাংকে জমানোর পর দেশে এসেছেন বিয়ে করতে। তিনি কনে কী খুঁজবেন, কনের তো লাইন পড়ে যাবার কথা!

কনে দেখার প্রসেস শুরু হলো। আমি ঘটকের কাছ থেকে ছবি আর বায়োডাটা নিয়ে মামার কাছে যাই আর মামা একটা একটা করে নাকোচ করে দেন। ৩৪তম ছবি দেখিয়ে আমি যখন চরম বিরক্তিতে ঘটকালী সহযোগিতায় ইস্তফা দেবো ভাবছি তখনই মামার একটি মেয়েকে মনে ধরলো। 
আমাদের পাশের ফ্লাটের মেয়ে, অনার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়ে। ছবি দেখার পাশাপাশি মামার হোম-ওয়ার্ক দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম। 

মেয়ের বাড়িতে খবর পাঠানো হলো। আমাদের তর সইছে না, মা’কে নিয়ে আমি আর মামা তিন দিনের মাথায়ই মেয়ে দেখতে গেলাম। ঐ দিনই মামা মেয়েটিকে আমেরিকা থেকে আনা হীরের আংটি পরিয়ে দিলেন। দু-পক্ষের সম্মতিতে পরের সপ্তাহেই বিয়ের দিনক্ষণ ধার্য হবার কথা হলো।

পরদিন সকালে আমার দরোজায় মামার ডাক। এতো সকালে মামা ডাকছেন ব্যাপার সিরিয়াস কিছু নিশ্চয়ই, কারণ আমেরিকা ফেরত মামা দুপুর দুইটার আগে তো ঘুম থেকে উঠার কথা নয়।
দরোজা খুলে মামাকে ভিতরে নিয়ে এলাম। 
মামা কি হয়েছে?
মেয়েটা পালিয়েছে…
কোন মেয়ে!!
ঐ যে পাশের ফ্লাটের মেয়ে যাকে গত রাতে দেখে এলাম।
আমি হতভম্ব হয়ে ফানের দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আস্তে করে জিজ্ঞাস করলাম, হীরের আংটিটা??
মামা উদাস হয়ে জবাব দিলেন, নিয়ে পালিয়েছে রে…! তার ক্লাসমেট একটি ছেলের সাথে।

যাই হোক এক সপ্তাহের মাথায় আংটির শোক কাটিয়ে আমরা নতুন উদ্যমে কনে দেখতে লেগে গেলাম।
৪০তম কনে ইংরেজিতে মাস্টার্স করছে। মামাকে নিয়ে মেয়ে দেখতে গেলাম একটি চায়নিজ রেস্টুরেন্টে।
কনের খালা আর খালাতো ভাই কনেকে সাথে নিয়ে এলেন। যথেষ্ট সুন্দরী মেয়ে। বাসায় এসে মামা ঘোষণা দিলেন মেয়ে তার পছন্দ হয়েছে। এই মেয়েকেই তিনি বিয়ে করবেন। আমি রিস্ক-এ গেলাম না। কিছু খুঁজ খবর নিতে চাইলাম। প্রথমেই মেয়ের নাম দিয়ে ফেইসবুকে সার্চ দিলাম এবং একটু খোঁজার পরই মেয়ের আইডি পেয়ে গেলাম। মামাকে নিয়ে উৎসাহের সহিত প্রো-ফাইল দেখতে লাগলাম। ৫মিনিটের মাথায় আবিষ্কার করলাম সেখানে লিখা Engaged with Fahim Khan, আর এই ফাহিম খান তো দেখি মেয়েরই খালাতো ভাই!!!
বলি, মামা এইটারে বাদ দাও, পেছগি আছে…
মামা মাথা চুলকে বলে, তাইতো দেখছি, বিরাট পেছগি!!!
মামা, তাইলে এইটা বাদ…
মামা বলেন, অবশ্যই বাদ।

৪৫তম মেয়ে দেখতে গেলাম কুমার পাড়া। মেয়ে অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ে। খুবই সুশ্রী কনে। মামা, ফুফু আর আমি কনে দেখে পছন্দ করলাম। কথা প্রায় পাকা করলেন মা, বাবা। সিদ্ধান্ত হলো রমজানের পরেই বিয়ে। অনেক কষ্টের পর পছন্দ মতো কনে পেয়ে ফরিদ মামা খুবই খুশি। ঘরে বসে রূপ চর্চা করেন হবু বধূর সাথে ফোনে কথা বলেন আর দিন গুনতে থাকেন। রমজানের জন্য আউটডোরে দেখা করতে পারেন না । আমি সান্ত্বনা দিয়ে বলি, আর তো মাত্র কয়টা দিন।
এর মধ্যেই মামার নামে একটি চিঠি এলো। চিঠি খুলে মামা তো থ!!! দেখা গেলো এই পত্র মারফত এসেছে মামার হবু বধূর সাথে একটি গুণ্ডা মার্কা ছেলের অন্তরঙ্গ কিছু ছবি। সাথে একটি ক্ষুদ্র চিঠি, যার একটি লাইন ছিলো এই রকম- “আর এক পা আগাইছস তো পা’ডা কাইট্টা এমন দিকে ঢুকামু… পরে যে দিকে খাইতে হইবো সে দিক দিয়াই হাগতে হইবো”
মামার আর মতামতের প্রয়োজন নেই আমার মা এমন কান্না কাটি জুড়ে দিলেন যেনো মামার ঐ অবস্থা তিনি দিব্য চোখে দেখতে পারছেন!!!
গুণ্ডা মার্কা ছেলের কথা মত আমরা মেয়ের বাসায় জানিয়ে দিলাম, “আমাদের ক্ষমা করবেন, আমাদের একটু সমস্যা পড়ে গেছে”

শেষ পর্যন্ত মামা তার শর্ত থেকে শিক্ষিত সুন্দরী বাদ দিয়ে যোগ করলেন মেট্রিক পাশ/ফেল মোটামোটি সুন্দরী গ্রামের একটি সহজ সরল মেয়ে চাই।
সেই সূত্রে আমি আর মামা পর দিনই পাড়ি জমালাম গ্রামের বাড়ি। বাড়িতে চাচা, চাচি আছেন… তারাই আমাদের নিয়ে মহা উৎসাহে কনের সন্ধানে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। প্রতিদিন তিন-চারটি করে কনে দেখতে লাগলাম আমরা। মামার কিছু মেয়েকে প্রাথমিকভাবে মনেও ধরলো। সেমিফাইনালে আমরা চারটি মেয়েকে নিয়ে এলাম, ফাইনালের জন্য শহরে মায়ের কাছে ফোন দেয়া হলো।

ঐদিকে মা শোনালেন আরেক কাহিনী। তারা মামার জন্য বিয়ে ঠিক করে রেখেছেন। আর কনে খোঁজার দরকার নেই। আমরা যেনো আজ বিকেলেই শহরে ফিরি। রাতে মামার বিয়ে। মেয়ে খুবই সুন্দরী, উচ্চ শিক্ষিতা এবং উচ্চ বংশীয়।
আমি কিছুটা অবাক হলেও মামা যেনো খুশিই হলেন। অবশ্য পুরো ব্যাপারটিতে মামা এতোটাই বিরক্ত বিয়েটা হয়ে গেলেই যেন তিনি বাঁচেন। বিকেলের বাসেই আমরা রওনা হলাম শহরে। 

বাসায় ফিরে দেখি ঘরোয়া পরিবেশে বিয়ের সাজ সেজেছে আমাদের বাড়ি। নিকট আত্মীয় সবাই উপস্থিত। খাওয়া দাওয়ার বিরাট আয়োজন। কনে বিশাল ঘোমটা দিয়ে বসার ঘরের এক কোনে একদল মেয়ে নিয়ে বসে আছে। 
মামা মা’কে অনুরোধ করলেন একটি বারের জন্য হলেও মেয়ের চেহারা দেখতে চান।

মা ধমক দিয়ে বলেন, অনেক দেখেছিস, দেখে দেখে এতোদিন সময় নষ্ট করলি, এবার আমরা যা দেখেছি তাই তোকে বিয়ে করতে হবে। কেনো আমাদের পছন্দের উপর কি তোদের ভরসা নেই!!??
মামা মাথা নিচু করে বলে, না তা না। তোমাদের পছন্দই আমার পছন্দ। 
মা হাসতে হাসতে বলে, এমন মেয়ে পছন্দ করেছি… তোকে সারপ্রাইজ করবো, অবাক হয়ে শুধু দেখতেই থাকবি, দেখতেই থাকবি…!

মায়ের কথায় রহস্যের গন্ধ পাই। বিয়ে আনুষ্ঠানিকতা শেষে মামাকে বাসর ঘরে ঢুকিয়ে ক্লান্ত শরীরে নিজের রুমে এসে দেখি ৮-১০বছরের একটি অপরূপা সুন্দরী বিদেশিনী আমার বিছানায় বসে আছে আর আমার মা নিজের হাতে তাকে মুখে তুলে ভাত খাওয়াচ্ছেন। মেয়েটাও খুবই আগ্রহ ভাত চিবুচ্ছে!
আমাকে দেখে বসে, “টুমি ট্যারেক ভায়া??”
আমি ট্যারেক ভায়া বিষম খেয়ে পুরো ঘটনা হজম করি…

আমার মামা সিটিজেনশিপের জন্য এক আমেরিকান মেয়েকে বিয়ে করেন দীর্ঘ ১০বৎসর পূর্বে, দেশের কাউকেই না জানিয়ে। 
আমেরিকায় আট বছরের একটি মেয়ে আর বউ রেখে দেশে বেড়ানোর কথা বলে বিয়ে করতে কনে খুঁজে বেড়াচ্ছেন!!! এদিকে তার খুঁজে আমেরিকান মামী বাসায় এসে উপস্থিত। ইন্টারনেটের যুগে এ আর এমন কঠিন কি… !
মা পুরো ঘটনা ব্যাখ্যা করে যাচ্ছেন আর আমি আনমনা হয়ে মামার অবস্থা কল্পনা করছি… 

বাসর ঘরে মামাকে ঢুকিয়ে দিয়ে এসেছি, ঘোমটা খুলে মামীকে দেখে মামা সারপ্রাইজ তো হবেনই এমনকি জ্ঞানও হারাতে পারেন। ঘোমটা খুলে মামীকে দেখতেই থাকবেন আর দেখতেই থাকবেন……… হা হা হা।

শেয়ার করুন:
  • 1.3K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.3K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.