আরও কি দেখা যাবে আলোক রশ্মি!!!

0

শারমিন জান্নাত ভুট্টো:

ঘরের বাইরে পুরুষ এবং সমাজ আর ঘরে নারীকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্যাতিত হতে হচ্ছে সেই কোনো না কোনো নারীরই কাছে। কেউ হয়তো নির্যাতিত হচ্ছে পারিবারিক কলহের জের ধরে, আর কাউকে নির্যাতন করা হচ্ছে তার গৃহকর্মী পরিচয়ের কারণে। এরই মাঝে সবারই জানা হয়েছে যে নওরীন জাহান নদী নামে এক গৃহকর্ত্রীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত, যে কিনা বছর চারেক আগে তার গৃহকর্মী ছোট্ট আদুরিকে নির্মম নির্যাতন করে ফেলে রেখে গিয়েছিলো রাস্তার ডাস্টবিনে।

মায়ের মন বহন করা একজন নারী কীভাবে একটি শিশুর ওপর এতোটা ঘৃণ্য,পাশবিক আর অমানবিক নির্যাতন চালায়, তা কোনভাবেই মাথায় আসে না। যদি কারও সেবা আপনার পছন্দ না হয়, কিংবা কোনভাবে বনিবনা না হয়, তাহলে সে কর্মীকে কেনোই বা গৃহবন্দি করে রেখে জোরপূর্বক কাজ করানো হবে? আর তার উপর চালানো হবে নির্যাতন? সম্ভবত গৃহকর্মী যারা কাজ করেন, তারা নিতান্তই পেটের দায়ে গ্রাম থেকে শহরে আসেন, যারা কিনা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে কোনভাবেই সচেতন নন। আর এ সুযোগকে কাজে লাগিয়েই কূলহারা নদীরা নির্যাতনের ধারা অব্যাহত রাখে।

তবে নদীর নির্যাতনের ধারা সাগরে মিলিত হওয়ার আগে অর্থাৎ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর পূর্বেই তা সবার নজরে আসলো।চার বছর ধরে অপেক্ষা করে অবশেষে আদুরির পরিবার পেলো আদালতের রায়। আশার বাণী হচ্ছে যে, আদালতের রায়টি ছিলো আদুরির পক্ষে এবং যুগান্তকারী।

তবে আমরা কিন্তু এখনও ভুলে যাইনি আলোচিত আরও দুটি ঘটনার কথা। যেখানে জাতীয় দলের ক্রিকেটার শাহাদাত হোসেনের স্ত্রী নিত্য শাহাদাত এবং এক কর্নেলের স্ত্রী আয়শা লতিফ গৃহকর্মী নির্যাতনে অন্যতম শীর্ষস্থান দখল করে আছে। যদিও আইনের মার-প্যাঁচ থেকে ঠিকই বের হয়ে এসেছে নিত্য শাহাদাত, আর কর্নেলের স্ত্রী এখনও বহাল তবিয়তে আছেন কোথাও না কোথাও। আর সেই সাথে প্রতিদিন গোগ্রাসে গিলছেন কোনো না কোনো গৃহকর্মীর ভেজে দেয়া ডিমের কুসুম।যে নির্যাতনকারীরা গরিব মানুষগুলোর দারিদ্রতার ফায়দা তুলে কোনো না কোনো গৃহকর্মীর জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া দরকার তড়িৎ উপায়ে।

ভাবতে অবাক লাগে বাঙালিরা সুদূর আমেরিকায় গিয়েও গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতন চালানোর উদাহরণ তৈরি করেছেন বাংলাদেশি কূটনৈতিক শাহেদুল ইসলাম। এ কূটনীতিকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ হলো, তিনি তার বাসায় যে গৃহকর্মীকে নিয়োগ দিয়েছেন, তাকে ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বিনা বেতনে জোরপূর্বক কাজ করিয়েছেন।

অবাক করার মতো বিষয় হচ্ছে, চার বছরে একটি কানাকড়ি খরচ করার আগ্রহ না দেখালেও শাহেদুল সাহেব কিন্তু ঠিকই তার জামিনের জন্য ২৫ হাজার ডলার খরচ করেছেন আমেরিকার কুইন্স সুপ্রিম আদালতে। অথচ এ সমপরিমাণ অর্থ যদি গৃহকর্মীকে দেয়া হতো তাহলে একজন কূটনৈতিক হিসেবে নিজের পাশাপাশি দেশের সম্মানটুকুও বহাল তবিয়তে রাখা যেতো।

বিগত কয়েক বছরের গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, বড় বড় শহর আর বিভিন্ন পেশা যেমন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার,খেলোয়াড়, শিল্পী, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের বাসায় গৃহকর্মীরা উদ্বেগজনক হারে নির্যাতিত হয়েছে। আর কোনো ঘটনারই উল্লেখযোগ্য কোনো বিচার না হওয়ায় অন্যরা অনায়াসেই ভেবে নিচ্ছে এ ধরনের অপরাধ করলে সহজেই পার পাওয়া যাবে। আর এ কারণেই একের পর এক ঘটনা ঘটেই চলছে। অর্থ, ক্ষমতা আর শক্তির যাচ্ছেতাই ব্যবহার হচ্ছে অপরাধীদের অপরাধ ঢাকতে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী গত দশ বছরে দেশে গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ১০৭০টি, আর এসব ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ৫৬৫ জনের। নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা কিংবা মৃত্যু এসবের কোন না কোনটি যেনো অপ্রত্যক্ষভাবে লেখা হয়ে গেছে গৃহকর্মীদের ভাগ্যে। বছর দুয়েক আগে গৃহকর্মী সুরক্ষা নীতিমালা মন্ত্রিসভায় অনুমোদন করা হয়েছিলো, যেখানে বলা হয়েছে কোনো গৃহকর্মী যৌন হয়রানি, যৌন নির্যাতন, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করলে সরকারি খরচে সেই মামলা পরিচালিত  হওয়ার পাশাপাশি বিচারের দায়িত্বও সরকারের।

এখন কথা হচ্ছে এসব নীতিমালা যাতে গোলটেবিলেই আটকে না থেকে আলোক রশ্মি দেখতে পারে, তাই থাকবে এ মুহূর্তের কামনা।

এক একটি যুগান্তকারি রায় হয়তো ঘটনার বীভৎসতাকে ভুলিয়ে দিতে পারবে না, তবে আর কেউ যাতে নির্যাতকের ভূমিকায় না থাকতে পারে তার জন্য একটি কঠোর সংকেত হিসেবে কাজ করবে। সবশেষে গৃহকর্মী নির্যাতনকারীদের সামনে একটিবারের জন্য হলেও জেলবন্দি আর গৃহবন্দি অবস্থার পার্থক্য তুলে ধরা দরকার।বুমেরাং এর দেখা মিলুক ওদের জীবনেও………

লেখাটি ৪৫৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.