আদুরি নির্যাতন: গৃহকর্ত্রী নদীর যাবজ্জীবন

0

উইমেন চ্যাপ্টার:

চার বছর আগে এক বীভৎস নির্যাতনের কথা শুনে আঁতকে উঠেছিলাম আমরা। ঘটনাটি ঘটেছিল মিরপুরের পল্লবীতে। নির্মম নির্যাতনের পর শিশু গৃহকর্মী আদুরিকে মুমূর্ষু অবস্থায় ময়লার স্তূপে ফেলে রাখার সেই ঘটনায় গৃহকর্ত্রী নওরীন জাহান নদীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।

ঢাকার ৩ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক জয়শ্রী সমাদ্দার আজ মঙ্গলবার এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। আসামি নদীকে যাবজ্জীবন কারাদাণ্ডের পাশাপাশি এক লাখ টাকা জরিমানার আদেশ দিয়েছেন বিচারক। ওই অর্থ আদায়ের পর তা নির্যাতিত কিশোরী আদুরিকে দিতে হবে। আর জরিমানা দিতে ব্যর্থ হলে আরও এক বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে নদীকে।

নদীর মা ইশরাত জাহানও এ মামলার আসামি ছিলেন। অপরাধে সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দিয়েছেন বিচারক।

সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি শিশু গৃহকর্মি নির্যাতনের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের এমন রায় অবশ্যই আশাব্যঞ্জক। ধারণা করা হচ্ছে, এই রায়ের মধ্য দিয়ে গৃহকর্মি নির্যাতনের ঘটনা কমে আসবে। ফেসবুকে রুনা নাছরীন নামের একজন তার প্রতিক্রিয়ায় লিখেছেন-

“গৃহকর্মি আদুরি তার প্রতি অন্যায়ের বিচার পেয়েছে। গৃহকর্ত্রী নওরিন জাহান নদীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। ঘটনাটা ঘটেছে ২০১৩ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর। একমাসের মধ্যে উপ-পরিদর্শক কুইন আক্তার আদালতে চার্জশিট দিয়েছিলেন। চার বছরের মধ্যে রায় দিয়েছেন বিচারক জয়শ্রী সমাদ্দার। কিছুটা দেরিতে হলেও রায়টা একদম মোক্ষম সময়ে হয়েছে। যা কিছুটা হলেও স্বস্তিদায়ক,অনেকটা আনন্দের এবং অনেকটা আশার। অনেকে হয়তো একটু নড়ে চড়ে বসবে। সময়ক্ষেপণ না করে এই রকম সবক্ষেত্রে আইনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির রাখতে হবে। কেউ যেন আইনের অপব্যবহার না করতে পারে। যা অন্যায় তা সবার জন্যই অন্যায়। আর একটা কথা, এই বিচারকার্যে যারা জড়িত ছিলেন তারা সবাই মেয়ে, তা ভেবেই ভালো লাগছে। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিও ছিলেন মহিলা, মাহমুদা আক্তার”।

লেখক ও প্রামাণ্য চিত্র নির্মাতা শারমীন শামস্ লিখেছেন, “নওরীন জাহান নদী নামের মহিলাটির যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়েছে আদুরি নামের গৃহকর্মী মেয়েটিকে নির্যাতনের দায়ে। এটাই ন্যায়বিচার। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি যত বেশি হবে, গৃহকর্মী এনে তাকে নির্যাতন করে হলেও তাকে দিয়ে কাজ করানোর দুঃসাহস আর কেউ দেখাবে না। 
শিশু গৃহকর্মীর বিষয়ে আইন যেন তার সোজা পথে চলে সেই বিষয়টিও সামনে আসা প্রয়োজন। ষোলো বছরের নিচে কোন শিশুকে কোন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ দেয়া বেআইনী। এটা সবার মাথায় ঢুকতে হবে।”

একটু ফিরে দেখা যাক- 

২০১৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকার একটি ডাস্টবিন থেকে ১১ বছর বয়সী আদুরিকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। তদন্তে বেরিয়ে আসে, তার গৃহকর্ত্রী পল্লবীর ১২ নম্বর সেকশনের ২৯/১, সুলতানা প্যালেসের দ্বিতীয় তলার বাসিন্দা নদী আগের দিন ধারালো চাকু দিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশ কেটে, ইস্ত্রি দিয়ে ছ্যাঁকা দিয়ে মারাত্মক জখম করে মেয়েটিকে সেখানে ফেলে রাখেন।

বিডিনিউজটুয়েন্টিফোরডটকম এর এক ভিডিও চিত্রে আদুরি জানায়, চার বছর আগের সেই নির্যাতনের স্মৃতি এখনও তাড়া করে আদুরীকে। খেতে পারে না, জিভ জ্বলে। সারা শরীরে আগুনে ছ্যাঁকাগুলোতে ব্যথা হয়। চুলকায়। পটুয়াখালী সদর উপজেলার কৌরাখালী গ্রামের প্রয়াত খালেক মৃধার মেয়ে আদুরি এখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে।  

জানা গেছে, মামলার রায় জানতে মঙ্গলবার মা শাফিয়া বেগমের সঙ্গে আদালতে এসেছিল আদুরি। সঙ্গে ছিলেন মামলার বাদী আদুরির মামা নজরুল চৌধুরী, খালা শাহিনুর বেগমসহ আরও কয়েকজন।

রায়ের পর নজরুল সাংবাদিকদের বলেন, “ওরা প্রচুর বিরক্ত করেছে। আপসের জন্য চাপ দিয়েছে। আপস করি নাই; কঠিন যুদ্ধ করেছি। আপনারা সাহায্য করেছেন। আপনাদের সাহায্য না পেলে এই মামলা রায়ের পর্যায়ে আনতে পারতাম না।”

আদুরির পরিবারকে এ মামলায় আইনি সহায়তা দেওয়া মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সালমা আলী রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। যদি আদুরির পরিবার চায়, তাহলে তার সারা জীবনের কর্মসংস্থান আমরা করে দেব।”

কয়েক বছর আগে স্বামী মারা গেলে নয় ছেলে-মেয়েকে নিয়ে বিপদে পড়েন আদুরির মা শাফিয়া। তখন এলাকার চুন্নু মীর ঢাকায় তার শ্যালক সাইফুল ইসলাম মাসুদের বাসায় মাসিক ৫০০ টাকা বেতনে আদুরিকে কাজ দেওয়ার প্রস্তাব করলে তিনি রাজি হয়ে যান।

লেখাটি ১,৯৮২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.