আর অবাক লাগে না আমার

তাবাস্‌সুম নীহাল:

ফেসবুক নিউজফিডে গত কয়দিন ধরে বারবার এই খবর সংক্রান্ত লেখাই আসছে- সৎ মেয়েকে বাবার ধর্ষণ। মানুষ এই নিয়ে অনেক লেখালেখি করছে, অনেকে অনেক কথা বলছে, ঐ বাবা লোকটার শাস্তি দাবি করছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার কাছে ঘটনাটা মোটেও অবাক করা কিছু মনে হচ্ছে না। অনেক রাগ করার চেষ্টা করলাম, তাও পারলাম না। কতো জায়গায় তো আপন বাবাই ধর্ষণ করে- এমন খবরও পড়েছি। এ তো তবু সৎ বাবা!

আমার ছোটবেলায় একলোকের দ্বারা চরম রকমের যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলাম। মায়ের আপন ভাই। তার মানে আপন মামা-ই তো হলো, তাই না? সৎ মামা তো না নিশ্চয়ই। সেই লোক আমাকে যখন যেখানে একা পেতো, সেখানেই কখনো জামার গলার ভিতর দিয়ে হাত ঢুকিয়ে দিতো বুকে। আবার কখনো জামার নিচে, প্যান্টের ভেতর। কী প্রচণ্ড কষ্ট হতো, বলার মতো না!

যখন থেকে তার এই কর্ম শুরু, তখন আমার বয়স আট বা এর কাছাকাছি। তখন তো কাউকেই কিছু বলিনি। কিভাবে বলবো, কী বলবো, সেটাও বুঝতে পারিনি। সেই লোক বর্তমানে স্ত্রী সন্তানসহ দেশের বাইরে থাকে। বছর দেড়েক আগে দেশে এসেছিলো, ভাইবোনদের কাছে। সেই লোক দূরে থাকে, দূরেই থাকুক। দেশে আসবে, আবার তার সাথে দেখা-সাক্ষাৎ, হাসি-তামাশা করা লাগবে, এইসব ভেবে তখন নিজের ভেতর খুব মানসিক যন্ত্রণা হচ্ছিলো।

অন্য দুই খালাতো বোনকে জানালাম ছোটবেলার সেই ভয়ানক স্মৃতি। আশ্চর্যজনক ঘটনা হলো- সেই লোক ওদের দুইজনের সাথেও একই কাজ করেছে, দিনের পর দিন! এবং এতোদিন আমরা সবাই সবকিছু লুকিয়ে বসে আছি, কাউকে কিছু বলিনি! সেইসময় আমি আর হজম করতে না পেরে, এতোবছর পর এসে পুরো ঘটনাটা গল্পের মতো করে লিখে আমার মাকে দিলাম।

মা পড়ে প্রথমেই প্রশ্ন করলো- “তুমি কি এই লেখাটা কোথাও দিয়ে দিয়েছো? ফেসবুকে বা এমন কোনো পাবলিক প্লেসে?” বললাম- “না, দেইনি।”

মা খুবই উদ্বিগ্ন- “দিও না। দিলে তো সবাই বুঝে যাবে কার কথা বলছো!” এরপর বলে- “এখন এতোদিন পরে বলছো কেন? আগে বলোনি কেন?”

আমি বললাম- “বলার মতো ভাষা পাইনি, কিভাবে কাউকে এই কথা বলা যায়, বুঝতে পারিনি, তাই!”

মা- “তুমি জানো না, সবসময় মেয়েদেরই দোষ হয়? এখানেও তোমারই হবে। ওর কিছুই হবে না। আর তাছাড়া তোমার কাছে কি কোনো প্রমাণ আছে? নাই! তাহলে এতোদিন পরে তোমার এই কথা কে বিশ্বাস করবে?”

আমি হা করে তাকিয়ে থাকলাম। যেই মাকে ভরসা করে এই যন্ত্রণার কথা এতো বছর পরে শেয়ার করলাম, সে বলছে এই কথা! আমি বললাম- “ঐ লোক বাসায় এলে তার সাথে নরমাল আচরণ করা আমার পক্ষে সম্ভব না।” এই শুনে মা বললো- “এমন করলে অন্য মানুষজন জিজ্ঞেস করবে যে, কেন তুমি এরকম করছো? আমার বাকি ভাইবোনরাও তো জানতে চাইবে! তখন আমি কী বলবো?”

আর কিছু না বলে আমি উঠে চলে আসি। আমার জন্মদাত্রী মা যে কষ্টটা বুঝতেই পারবে না, সেটা তো একেবারেই মাথায় আসেনি! দেশে আসার পর সেই লোক যেদিন বাসায় আসে, সেদিন আগে থেকেই আমি বাসার বাইরে চলে যাই। সারাদিন বাইরেই থাকি।

বাসায় ফিরে শুনি- আমার জেদ, একগুঁয়েমির কারণে মা তার অতি গুণধর ভাইকে সপরিবারে দাওয়াত করে খাওয়াতে পারেনি, এই ব্যথায় কাতর! আরো বলেছে- আমি কেন এখন এগুলো বলতে গেলাম মাকে? সেই মামা এসে ভালোয় ভালোয় ঘুরে চলে যেতো, তারপর না হয় বলতাম! এইসব শুনে তারপর আমার প্রতিক্রিয়া কী হওয়া উচিৎ, আর মাথায় আসে না। তাই এই টপিকে আর কথাও বলি না। তাদের ভাইবোনের মধ্যে সম্পর্ক নরমালই আছে। ফোন করে, কথা বলে, ছবি পাঠায়। সব একদম আগের মতোই।

সম্প্রতি অন্য বিষয়ক কথার মধ্যে আমি এই কথা টেনে এনে বলি-

“এক রাতে আমি যে তোমাকে আমার ছোটবেলার এতো ভয়াবহ একটা কষ্টের কথা বললাম, তারপরও ঐ লোকের সাথে তুমি এখনো কিভাবে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রেখেছো?” প্রশ্নের উত্তর পেলাম- “আমি জানি রক্তের সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না। তাই আমি ওর সাথে সম্পর্ক নষ্ট করবো না। ওর যা পাপ, তার শাস্তি ও আল্লাহর কাছ থেকেই পাবে।”

বরং উল্টে আমার মা-ই প্রশ্ন করলো আরও- “তাহলে যেদিন আমরা ওর বিয়ের জন্য সিলেটে চলে যাচ্ছি, তখন তুমি কাঁদছিলে কেন? তুমি যদি ওকে এতোই অপছন্দ করো, ঘেন্না করো, ঐসব ঘটনা কোনোদিন ভুলতে পারবেই না, তাহলে সেদিন অমন করে কাঁদছিলে কেন?”

বোঝার সুবিধার্থে বলি- সেই লোকের বিয়ে উপলক্ষে তার ভাইবোন সবাই মিলে বাস ভাড়া করে ঢাকা থেকে সিলেট যাওয়া হয়েছিলো, কারণ বউয়ের বাড়ি সিলেট। সবাই চলে যাচ্ছে, আর আমাকে থেকে যেতে হচ্ছে, কারণ আমার তখন স্কুলের টেস্ট পরীক্ষা! আমার বাপ-মা-ভাইবোন সব চলে যাচ্ছে। আমি তখন ক্লাস টেনে পড়া একটা বাচ্চা। আমি কেন কাঁদছিলাম সেদিন, সেটা বুঝলো না? এখন জিজ্ঞেস করে- তখন তাহলে আমি কাঁদছিলাম কেন?

‘সৎ বাবা কর্তৃক মেয়ের ধর্ষণ’ পড়ে তাই আমার অবাক লাগে না। সেই “বাবা” লোককে নিয়ে কিছু তো বলার নাই-ই। যারা মা মহিলাটার কথা বলছেন- কেন তিনি এতোবছর ধরে নিজের মেয়ের সাথে হতে থাকা এমন জঘণ্য একটা কাণ্ড চেপে রেখেছেন, কেন দিনের পর দিন সহ্য করেছেন, তার ব্যাপারেও আমার অবাক লাগে না।

তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনিও হয়তো “রক্তের সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না” ধরনের কোনো বাণী শুনিয়ে দিতে পারেন। হয়তো বলে বসতে পারেন- “স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেশত, তাই আমি কিছু বলিনি!” এমন কথা শুনলেও অবাক হবো না। যাদের কাছে নিজের সন্তানের ব্যথা বা যন্ত্রণা লাঘবের চেয়েও সমাজ রক্ষা, সামাজিকতা টিকিয়ে রাখা বেশি জরুরি, তারা তো সবসময় মুখ বুঁজে থাকবেনই। আর পরবর্তী প্রজন্মকেও একই শিক্ষা দিয়ে যাবেন। কাজেই আর অবাক লাগে না।

শেয়ার করুন:
  • 1.6K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.6K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.