কন্যার পিতাকে খোলা চিঠি…

0

নাহিদ খান:

আমার প্রিয়তম কন্যার পিতা,

বেশ অনেকদিন হলো আমি পত্রিকা পড়ি না, খুব মনোযোগ দিয়ে তোমার পত্রিকা পড়া দেখি। ক’দিন হলো ফেসবুকিংও করি না, লুকিয়ে লুকিয়ে মাঝে মাঝে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিমগ্ন তোমাকে দেখি। আমি অপেক্ষা করি তোমার কপালে ভাঁজ দেখবো, তোমাকে উদ্বিগ্ন, রাগান্বিত, দুঃখিত দেখবো…  

নাহ, তুমি বেশ নিরুদ্বিগ্ন, স্বাভাবিক। চিকনগুনিয়া, রামপাল, ভূমিধস, নির্বাচন, ফরহাদ মজহার ইত্যাদি নিয়ে দু’একটা মন্তব্য করতে শুনেছি। আমি ভীষণভাবে যে কথাগুলো তোমার মুখ থেকে শোনার জন্য অপেক্ষা করে আছি, তা তুমি বলছো না……   

এই যে পত্রিকায় প্রতিদিন শিশু ধর্ষণের খবর, ফেসবুকে আরমান নামের একটা লোকের ছবি ঘুরছে, তুমি এ নিয়ে একটা মন্তব্যও করোনি। আমি এই দুঃসহ ভার একা বইতে পারছিলাম না তাই সেদিন তোমাকে বললাম ‘কী হচ্ছে এসব, মেয়েদের নিয়ে আমার খুব ভয় হয়’।

তুমি খুব স্বাভাবিক গলায় বললে- ‘এরকম সবসময় হয়ে এসেছে, সব দেশে সব জায়গায় হচ্ছে, মেয়েদের শেখাতে হবে প্রতিবাদ করতে, প্রতিরোধ করতে… (আরও কী কী সব যেনো, আমার যেহেতু শুনতে অসহ্য লাগছিল তাই বাকিটুকু আর শুনিনি ইচ্ছে করে…)’।       

ওহে পিতা, তুমি নিজে কি মনে করো যে পিতা হয়েও কন্যাকে ধর্ষণ করা স্বাভাবিক ব্যাপার? সবসময়, সবদেশে এমন বিকৃত লোকজন আছে, তাই মা’র দায়িত্ব মেয়েকে তার জনকের কাছ থেকে সামলে রাখা? তোমার কন্যা তোমার কাছে থাকলে কন্যার জননী হয়ে আমি যদি তার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হই, সেটা তোমার জন্য ভয়ংকর লজ্জার বিষয় নয়? তোমার মরে যেতে ইচ্ছে করবে না ঘৃণায়? আমাদের কন্যাকে যদি আমার বলতে হয় ‘মা গো, বাবার কাছেও তুমি নিরাপদ না’, আমার কন্ঠ এ কথাগুলো বলতে পারবে না, আমার ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাবে, আমি মৃত্যুসম কষ্ট পাবো।  

শোনো আমার আত্নজার জনক, কন্যা যেদিন জানতে পারে পিতাও একজন পুরুষ, অন্যসব কামুক, ধর্ষক, নির্যাতক, প্রতারক, পুরুষের মতোই একজন পুরুষ, তার পৃথিবী তছনছ হয়ে যায়। কন্যা পৃথিবীর সমস্ত পুরুষকে ক্ষমা করে দিতে পারলেও পিতাকে ক্ষমা করতে পারেনা … (পুত্রের পিতারা সেদিক থেকে ভাগ্যবান! তাদের পুত্ররা নিজেও একদিন পুরুষ হয়ে ওঠে, পিতার পাপের পুনরাবৃত্তি করে কেউ কেউ, পিতাকে মানুষ হিসেবে বুঝতে পারে, ক্ষমা করে দিতে পারে)।      

আমার প্রিয়তম কন্যার পিতা, আমি চাই তুমি আমাদের মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে শুরু করো, বলতে শুরু করো, প্রতিরোধ তৈরি করো…। সন্তান ধারণ করার সামর্থ্য তোমার শরীরের ছিল না, সেটা আমি করেছি। কিন্তু সন্তান লালনপালন, তার নিরাপত্তা, তার সুষ্ঠু বিকাশ নিশ্চিত করা আমার একলার দায়িত্ব না।

আমাদের কন্যারা যখন বড় হয়ে যাবে, আমি তাদের ধর্ষিত হবার সম্ভাবনা নিয়ে চিন্তিত হবো না। আমি তাদের শেখাবো, জরায়ু শরীরের আর সব অঙ্গের মতোই আরেকটা অংগ, এর সাথে মান-সম্মান জড়িয়ে নেই। গুণ্ডা-মাস্তান হাত-পা ভেঙ্গে দিলে যেমন মানসিকভাবে বিকল হবার কিছু নেই, তেমনি ঈশ্বর না করুক কেউ ধর্ষণের শিকার হলেও এটাকে শুধুই শারীরিক আঘাত হিসেবে নিতে শেখাবো।  কিন্তু যতোদিন ওরা অপ্রাপ্তবয়স্ক, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে তোমাকে-আমাকে মিলে।

তোমার প্রতি সন্দেহ নিয়ে দিনযাপনের গ্লানি থেকে আমাকে মুক্তি দাও। শুধু তুমি না, দয়া করে সব পিতাকে নিয়ে কন্ঠ তোলো, জোরে, প্রচণ্ড জোরে… সব পিতারা ধর্ষক পিতাদের শাস্তি নিশ্চিত করার দাবী তুলুন। নিজেদের আত্মজাকে নিশ্চিত করুন…  

একটাই জীবন, মাথা উঁচু করে বাঁচুন!

লেখাটি ৩,২৪৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.