কে সুন্দর? আপনি নিশ্চয়ই সুন্দর 

0

নাসরীন মুস্তাফা:

গৃহকর্মি বলতে ভালো লাগে না। গৃহকর্মে সহায়তাকারী বলতে চাই, কেননা গৃহটা যেহেতু আমার ও আমাদের, গৃহকর্মটাও আমার ও আমাদের হওয়া উচিত। যেহেতু আমার গৃহকর্ম আমি ও আমরা করে পয়সা নেই না, তাই মাসিক বেতন-খাওয়া-পরা-জামাকাপড়ের বিনিময়ে যিনি আমাকে সহায়তা করছেন, তিনি প্রকৃতপক্ষে আমার ও আমাদের গৃহকর্মে সহায়তাকারী পদে নিযুক্ত। নীতিগতভাবে শিশুদেরকে এই চাকরিতে নিয়োগ দিতে আমি রাজি নই।

প্রচুর সময়সাপেক্ষ-কষ্টসাধ্য-নোংরা ঘাঁটার মতো পচা কাজে শিশুকে নিয়োগ দিয়ে আমি আমার শিশুকে চোখে-আঙ্গুল দিয়ে শেখাতে রাজি নই সমাজ শ্রেণী বৈষম্যকে কীভাবে লালন করছে, এবং এই অন্যায় কাজে আমার শিশুকে পারদর্শী করতে আমি ঘৃণা বোধ করি।

এরপরও শিশুরা গৃহকর্মে সহায়তাকারী পদে অগ্রাধিকার পায়। কেননা শিশু বয়সে গড়েপিটে নেওয়ার সুবিধাটা নিতে চান গৃহকর্ত্রীরা। স্বাভাবিকভাবেই নিজের চেয়ে দুর্বল, কম বয়সের শিশুকে শিক্ষা প্রদানে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করার তৃপ্তি আছে। শিক্ষা দিতে গিয়ে চড়-চাপড় মারলেও বলা যায়, শিক্ষকের ভূমিকায় থাকা গৃহকর্ত্রী একটু আধটু অমন করতেই পারেন। নিজের বাচ্চাকেও তো আমরা একটু আধটু চড়-টর মেরে মানুষ করতে চাই, তাই না?

মুশকিল হচ্ছে, নিজের বাচ্চার সারা শরীরে গরম খুন্তির ছ্যাঁকা বা ছুরির খোঁচা দিতে মায়া লাগে, এই শিশুদের বেলায় লাগে না। আমার প্রশ্নটা হচ্ছে, কেন লাগে না মায়া ওদের জন্য? কেন ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা গৃহকর্ত্রী ডিম ভাজতে গিয়ে পুড়িয়ে ফেলার অপরাধে গৃহকর্মে সহায়তাকারী শিশুর চোখ দু’টো ফুলিয়ে রাজহাঁসের ডিম বানিয়ে দেন? কেন নিজের সন্তানকে আদর করতে করতে গৃহকর্মে সহায়তাকারী শিশুটিকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করেন ক্রিকেটার শাহাদত?

এ কি শুধুই শ্রেণি বৈষম্য? দুই তরফেই কিন্তু বৈষম্য বোধটা আছে। আমাকে সমাজ শিখিয়েছে, ছোটলোকদের আদর দিলেই কিন্তু লাই পেয়ে মাথায় উঠবে। ঐ শিশুকে সমাজ শিখিয়েছে, বড়লোকদের বিশ্বাস নেই। ক্ষতটা আরও গভীরে।

আমার সন্তানের সমবয়সী গৃহকর্মে সহায়তাকারী শিশুটি দেখছে, তার জন্য সব সময় সস্তাদরের জামা কিনছি, তাকে সোফায় বসতে দিচ্ছি না, তার স্কুলে যাওয়া হয় না, শিশুসুলভ ছোটখাট ভুলও ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা হয় না, আমার বাচ্চা টিভিতে কার্টুন দেখতে পারলেও তাকে বাধ্য করি আমার সাথে বসে জিটিভি দেখতে, তখন ওর কি ভেতরটা ক্ষোভে ফেটে পড়ে না?

দুর্বল সব সময় তার চেয়ে দুর্বলের উপর বল প্রয়োগ করে নিজের দুর্বলতাকে মিথ্যে বানিয়ে মিথ্যে সবল সাজতে চায়। আর তাই, গৃহকর্ত্রীর অনুপস্থিতে চান্স পেলেই এই দুর্বলটি গৃহকর্ত্রীর সন্তানের গালে চড়-চাপড় বসিয়ে শিক্ষা দিতে তৎপর হয়। এরকম এক শিশু গৃহকর্ম সহায়তাকারীকে চিনতাম, যে কিনা সুযোগ পেলেই তার চেয়ে কম বয়সী গৃহকর্ত্রীর সন্তানের নাকে-মুখে খামচি দিয়ে রক্তাক্ত করে ফেলতো। কোনো বাসায় বেশি দিন টিকতে পারতো না। রটে গেল, ওর ঘাড়ে জ্বিন-ভূত আছে, তারাই ওকে দিয়ে এসব করায়, কেননা মেয়েটাকে বহু বার দেখা গেছে ছাদের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করতে, আর মিটিমিটি হাসতে। আমার কেন যেন মনে হয়, ও বিড়বিড় করে বলতো, ক্যামুন সুন্দর গর্ত কইরা দিলাম কপালে! অহন দেহি, এই রক্তভরা গর্তে জনসন কিরিম ক্যামনে লাগায় মা বেটিটা!

ওর মিটিমিটি হাসিটা কী আত্মতৃপ্তির ছিল না? গৃহকর্মে সহায়তাকারী শিশুকে পিটিয়ে ক্লান্ত গৃহকর্ত্রীও তৃপ্তিতে ভোগেন। ভাবেন, ভাল শিক্ষা দিতে পেরেছি। আমার মতো ক্ষমতাশালী সুবিধাপ্রাপ্ত হ্যানো ত্যানোর সাথে ত্যাদড়ামি! আমি আর কোথাও কেদ্দারি ফলাতে পারি আর না পারি, আমি যে চান্স পেলে পারি, তা তো বুঝিয়ে দিলাম! আমাকে গৃহকর্তা যতই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে নিজস্ব বিলকিসদের সাথে আনন্দ খুঁজুক, আমাকে সমাজ মানুষ না বলে মেয়েমানুষ বলে যতই ঠেলে সরাক, এই একটা জায়গায় কিন্তু আমি হাড়ে-চামড়ায়-মাংসে বুঝিয়ে দিলাম, আমারও জোর কম না।

অদৃশ্যে হাততালি বা নিজের পিঠ নিজে চাপড় মারা চলে। ভাবীদের আড্ডায় বুয়াদের বদনামের ঝড় চলে, যখন ভাইয়েরা লিওনেল মেসি না নেইমার সেরা সে বিতর্ক জমান, এ আমার নিজের চোখে দেখা ও কানে শোনার অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া।

শ্রেণি বৈষম্য, দুর্বলের অবদমিত ক্ষোভ প্রকাশের উপায়, ইত্যাদি কারণ এই শিশুদের নির্যাতিত হওয়ার পেছনে, তাই তো? নির্যাতনকারী সুন্দরী গৃহকর্ত্রী আর নির্যাতনের শিকার কালোকুলো শিশু গৃহকর্মে সহায়তাকারীর ছবি পাশাপাশি পোস্ট হচ্ছে।

আমি ভাবছি, ঐ দু’টি কারণের সাথে সমাজের শিখিয়ে দেওয়া সৌন্দর্যবোধ এই নির্যাতনের পেছনের কারণ হিসেবে কাজ করে না তো? বাহ্যিক সৌন্দর্য নির্যাতনের কারণ কি না, আমি আসলে তাও ভাবতে চাই। নিজের শিশুদের মাঝে একটি ফর্সা আরেকটি কালো হলে আমরা সবাই কি দু’টি শিশুকেই একই পাল্লায় রাখতে পারি? নিজের শিশুদের বেলায় পারি না, গরীব বাচ্চার বেলায় পারবো কীভাবে? তাও যদি সেই গরীব বাচ্চাটি আমার দয়ার ভিখারি হয়!

এই বর্ণবাদ-বাষ্প ছড়িয়ে আছে বিশ্বময়। পৃথিবীর মানুষ কাল চামড়ার শিশুকে শিশু মনে করে না, মনে করে ফর্সা শিশুদের তুলনায় এই শিশুরা কম নিষ্পাপ, মনে করে ফর্সা শিশুদের তুলনায় এই শিশুদের সুরক্ষার প্রয়োজন নেই অন্যদের সমান।

জর্জ টাউন য়্যুনিভার্সিটি’র ল’ সেন্টার কেন যেন এই বিষয়টি নিয়ে ভাবছিল। দারিদ্র আর অসমতাকে চিহ্নিত করতে গিয়ে বড়রা কালো চামড়ার মেয়েশিশুকে (৫ থেকে ১৪ বছর বয়সী) যে কম নিষ্পাপ ভাবে, তা বুঝতে পারে। সাদা চামড়ার ঐ বয়সী মেয়ের গায়ে ফুলের টোকা দিতেও তারা যতটা ভাবেন, কাল চামড়ার মেয়েশিশুর বেলায় যৌন নির্যাতন করে ফেলেও ততটা ভাবেন না। বিস্তারিত জানতে চাইলে গুগলে ‘ÔGirlhood Interrupted: The Erasure of Black Girls’ Childhood’ লিখে সার্চ দিন।

২০১৪ সালে করা ঐ গবেষণা কর্মটিতে এটাও জানা গেছে, ১০ বছরের চেয়ে কম বয়সের কালো গায়ের রঙের ছেলেশিশুকে তার বয়সের সমান মনে না করে বড় মনে করা হয়, ওদের দোষত্রুটি তাই ওর বয়সের আরেকটা ফর্সা ছেলেশিশুর সাথে তুলনা না করে বড়দের সাথে তুলনা করা হয়। মনে করা হয়, ও কি ছোট যে ও এই কাজ করলো? ও কি ছোট যে এই কাজ করলো বলে ওকে ক্ষমা করতে হবে? আর তাই কালো ছেলেশিশুর উপর নির্যাতনও করা হয় ঐ বয়সী ফর্সা ছেলেশিশুর তুলনায় বেশি। এই সমস্যাকে বলা হয় অ্যাডাল্টিফিকেশন, যা কালো চামড়ার ছেলেশিশু বা মেয়েশিশুর উপর অমানবিক নির্যাতনে তাড়িত করতে ওদের চেহারায় অ্যাডাল্ট ইমেজ বসিয়ে ওদের নিষ্পাপত্বকে হরণ করে।

আমেরিকার ৩২৫জন অ্যাডাল্টকে প্রশ্ন করা হয়েছিল। বিভিন্ন ধর্ম-জাতিগোষ্ঠীর-শিক্ষাগত যোগ্যতার এই বয়স্কদের কাছ থেকে ধারণা নেওয়া হয়, একুশ শতকে শিশুদের বেড়ে ওঠার সঠিক উপায় কী হতে পারে! শিশুদের বয়স বিভাজন ছিল এরকম- শূন্য থেকে পাঁচ, পাঁচ থেকে নয়, ১০ থেকে ১৪ এবং ১৫ থেকে ১৯ বছর। পাঁচ বছরের কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েশিশু নাকি অ্যাডাল্ট টপিকস, যেমন ধরুন যৌনতা, তা সম্বন্ধে শ্বেতাঙ্গ ঐ বয়সী মেয়েশিশুর চেয়ে ভালো জানে, এমন ধারণা পর্যন্ত উঠে এসেছে এই জরিপে।

আমেরিকার স্কুলগুলোতেও কৃষ্ণাঙ্গ শিশুরা বেশি শাস্তি পায়। আদালতে পর্যন্ত এইসব শিশুদের পক্ষে রায় এসেছে, এমন সংখ্যা তুলনামূলকভাবে খুব কম। আবার যৌন নির্যাতনের শিকার বেশি হচ্ছে এই শিশুরাই, অনেকে বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছানোর বহু আগেই।

স্টেরিওটাইপ বিশ্বাস থেকে মানুষ কালো চামড়ার উপর চাবুকের ঘা মারতে বেশি আগ্রহী, ইতিহাসও তেমনই বলে। দাসপ্রথায় সাদা চামড়ার মানুষও দাস হয়েছিল, তবে কালোদের তুলনায় অনেক কম। আবার দাসের মালিক হয়েছে কেবলি সাদারা, সেই ভূমিকায় কালোরা আছেন কি?

আপনি সম্ভবতঃ এই দলে নেই। আর তাই ফর্সা টুকটুকে বাচ্চা দেখে তার গাল টিপে দিতে যতটা আগ্রহী, ঠিক সমানভাবে কালো গায়ের রঙওয়ালা একই বয়সী বাচ্চার গালেও আপনার হাতের আঙ্গুলগুলো খেলা করে।

কালো বাচ্চাটি যদি আপনার গৃহকর্মে সহায়তাকারী হয়, তাহলেও আপনার আদর মোলায়েম হয়, কিছুতেই কালো চামড়ার উপর নীলচে দাগ ফুটিয়ে তোলে না, তাই না?

ঠিক তাই। কেননা আপনি তো ঐ দলভুক্ত নন। আপনি সুন্দর। সত্যিই আপনি সুন্দর।

লেখাটি ১,৪৬১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.