সেই মায়ের কাছে কিছু প্রশ্ন

0

রিমঝিম আহমেদ:

এমন নয় যে এ ধরনের ঘটনা প্রথম শুনছি, দীর্ঘ বছরের শিশুদের সাথে কাজের অভিজ্ঞতা থেকে জেনেছি নানারকম লোমহর্ষক ঘটনা। একসময় অতি সংবেদনশীলতাও ভোঁতা হয়ে আসে ধীরে ধীরে, আমাদের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। নানারকম ঘটনার টাল সামলাতে সামলাতে পুরুষ চরিত্রের নানামুখী রূপ দেখতে দেখতে আমাদের কোন ঘটনাই আর ছুঁতে পারে না।

এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে আমিও চেতনে- অবচেতনে আমার মেয়েটির কথা ভাবি- যাকে ছেড়ে দূরে থাকতে হয় জীবন-জীবিকার কারণে। বাবা অন্তঃপ্রাণ মেয়ে, আমি জানি আমি ছাড়াও সে নিরাপদ। বাবা নামের একটা নিরাপত্তা বেষ্টনী তার চারপাশে। কিন্তু এসব ঘটনা আমাকেও সন্দেহের দৃষ্টিটা একবার আমার মেয়ের বাবার প্রতি তাক করতে হয়। হয়তো ভয়, চারপাশের বিরূপতা আমাকে অসুস্থ করে তুলছে। একজন স্নেহশীল ও দায়িত্ববান বাবাকে সন্দেহ করে অসম্মান করছি তার পিতৃত্বকে। শুধু কি আমিই- অন্য মায়েরাও কি নয়?  

একজন সৎ বাবার (মেয়েটার কাছে মানসিকভাবে হয়তো সে বাবা-ই) দ্বারা আট  বছর ধরে  নির্যাতিত হয়ে আসছে যে কিশোরীটি তার জন্য সান্ত্বনার ভাষা কেমন হওয়া উচিত জানি না। যে দাগ তাকে সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হবে তার ভাগ আমরা কেউ নিতে পারব না এটুকু অন্তত জানি। এধরণের ঘটনা থেকে আমরা শিক্ষা কতটুকু নিই, কতটুকু কাজে লাগাই আর কতদিন পর ভুলে যায় নাকি ভুলিয়ে দেয় আমাদের মস্তিস্ক? মিডিয়া তোলপাড় হয়, মানুষ হাহুতাশ করে, কিন্তু মেয়েটি যে ট্রমার মধ্য দিয়ে সারাজীবন পার করবে, তার মানসিক পীড়নের ধারেকাছেও আমরা যেতে পারব না,  ছুঁতে পারব না  তার নিরব আর্তনাদ। কাকে বিশ্বাস করবে সে? পুরুষ কে কি তার বন্ধু, সহায়ক মনে হবে কখনো? শুধু তার ভাবনার জায়গাটা নিজের মতো করে ভাবছি।

আমাদের সমাজে শিশুদের উপর যেসব যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটে তা কোন বাইরের বা অপরিচিত লোক দ্বারা ঘটে না। বাংলাদেশে শতকরা নব্বইভাগ শিশুই পারিবারিক গণ্ডীতে ধর্ষণ  থেকে শুরু করে স্পর্শজনিত নিপীড়নসহ কোন না কোন যৌন নির্যাতনের শিকার। তার কিছুটা  আমরা জানি মিডিয়ার কল্যাণে। কিছুতা সমাজে প্রকাশিত হয় এবং অধিকাংশই  প্রকাশিত হয় না।

প্রকাশিত না হওয়ার পেছনে কারণগুলোও আমাদের অজানা নয়। যে শিশু-কিশোরীটি নির্যাতিত হয় তার সামাজিক অবস্থান, পরিবার তথা শিশুটির প্রতি বিদ্রূপ, হেয়প্রতিপন্ন করা, অবহেলা ,অসম্মান, বিয়ে না হওয়ার আশঙ্কাসহ পরবর্তীতে তার কি পরিমান সামাজিক অসহযোগিতে কাটাতে হয় তার খবর আমরা কেউই রাখি না। সেটা শুধু ভোগ করে সে শিশু-কিশোরী এবং তার পরিবার। সমাজে ধর্ষকের অবস্থান নিপীড়িতের চেয়েও ভালো।   অথচ উল্টো হওয়ার কথা ছিল। তা না হয়ে ধিক্কার দেয় যে ভিকটি্ম তাকেই। লড়াইয়ের মুখে ঠেলে দেয় তাকেই। অথচ লড়াই আর শাস্তি তার জন্যই হওয়ার কথা ছিল যে অপরাধী।

সবার জন্যই যদি বলি- পরিবার থেকে শুরু করে আপনার কন্যাশিশুটি কোথাও নিরাপদ নয়। আপনি সামাজিক জীব, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশি, অফিসের কলিগ কাউকে বর্জন করে থাকা যাবে না। আপনার বাড়িতে যদি কন্যা সন্তান থাকে তাকেও আপনি অন্য গ্রহে পাঠিতে দিতে পারবেন না। সকলের আসা-যাওয়া থাকবেই। আপনি যতদিন কোন অনাকাঙ্খিত ঘটনার সম্মুখীন না হচ্ছেন, ততদিন কে নিপীড়ক তা চিহ্নিত করতেও পারছেন না। কিন্তু তাদের দ্বারা আপনার  সন্তান যে নির্যাতিত হচ্ছে না তা কি হলফ করে বলতে পারেন? নির্যাতন বুঝতে হলে আপনার আগে নির্যাতন সম্পর্কে জানতে হবে, ধারণা থাকতে হবে। আদর আর নির্যাতনের ফারাক বুঝতে হবে। আমাদের অধিকাংশ পিতামাতা বিশেষত নির্যাতন সম্পর্কে জানে না বা উদাসীন। যে কেউ  আদরের ছলে যৌনস্পর্শ করে যাচ্ছে ,বেড়াতে নিয়ে যাবার নাম করে আপনার কন্যা সন্তানকে যে  নির্যাতন না করে নিরাপদে রেখে যাচ্ছে তা কিন্তু নয়। আপনার মাথায় হয়তো ব্যাপারটা আসেনি, আপনি বিশ্বাস করছেন হয়তো সে ভাই, বোন, প্রতিবেশি, কলিগ বা অন্যান্য আত্মীয়। কিন্তু সে  যে আপনার বিশ্বাসের মর্যাদা সবসময় রাখছে তা জোর দিয়ে বলা যায় না। তার জন্য আপনার কন্যাটির প্রতি মনোযোগ দিন। তার মনের কাছাকাছি পৌঁছান। নয়তো ঘটে যেতে পারে এরকম  ভয়ানক সর্বনাশ যা আপনাকে সারাজীবন ধরে ভোগাবে, আপনার উদাসীনতার দায় আর কেউ নেবে না।  দেখুন আপনার কিশোরী মেয়েটি প্রতিদিন নিজের ভেতর গুঁটিয়ে যাচ্ছে কিনা, লুকিয়ে  লুকিয়ে ঘরের ভেতর কাঁদছে কি না। দেখুন সে কতটা পাল্টে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। তার মানসিক- শারীরিক বদল খেয়াল করছেন?

যে ঘটনাটির কথা আমরা আজ জানলাম , তা কোন অশিক্ষিত অসচেতন পরিবারে ঘটেনি। ঘটেছে একজন শিক্ষিত মিডিয়াকর্মী দ্বারা। এমন নয় যে, গত আট বছরে মা একটুও জানে না, বা বুঝতে পারেনি। তাহলে একই কাজের ধারাবাহিকতা মা গত আট বছর ধরে হতে দিল কেন?  কোথায় সমস্যা ছিল? বিয়ে টিকিয়ে রাখা? পরিবার হারাবার ভয়? এক সন্তানকে বাঁচাতে আরেক সন্তানকে পিতৃহীন করার ভয়? লোকলজ্জা? আর্থিক সমস্যা? অনুধাবন করা প্রয়োজন।

একবার ভাবুন তো-যে স্বামী আপনার সন্তানের সন্তানের জন্য হুমকি সে স্বামী কি এতই জরুরি ছিল? সম্মানের কথাই যদি বলি- আপনাকে কি সে সম্মান করেছে? যদি সম্মানই করত, তাহলে আপনারই গর্ভজাত সন্তানের উপর এই পাশবিকতা কেন? সম্মান করে না বলেই সে আপনার সন্তানের দিকে থাবা বাড়িয়েছে। তার কাছে কিসের নিরাপত্তা আপনার? 
যতদূর জেনেছি সে মা-ও কর্মজীবী। তাহলে তখনই কেন বেরিয়ে আসলেন না সে লোকের খপ্পর থেকে? একজন ধর্ষকের কাছে দিনের পর দিন কেন মেয়েকে নির্যাতিত হতে দিলেন এবং আপনিও তার সাথে থাকলেন? 

আর মুখোশ পরে বাবা সেজে বছরের পর বছর ধরে ধর্ষণ করে আসা পুরুষটি,  তাকে মানুষ ভাবতে আমার লজ্জা হয়, এসব লোকের শাস্তির পাশাপাশি চিকিৎসা দরকার বেশি। তারা মূলত অসুস্থ, এই অসুস্থার বীজ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে দিচ্ছে তারা। তার কেমন শাস্তি হওয়া উচিৎ? সে দায়িত্ব নেবে রাষ্ট্রের আইনব্যবস্থা। সমাজ তাকে গ্রহণ করবে না বর্জন করবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের উপর ছেড়ে দিলাম।

আমার আপত্তি এবং জিজ্ঞাসা কেবল এক জায়গায়- মা টি কেন দিনে্র পর দিন তার কিশোরী মেয়েটিকে একজন বিকারগ্রস্ত মুখোশ পরা হায়েনার নাগালে রেখে দিল! কোথায় তার অসহায়ত্ব? একজন স্বাবলম্বী মানুষ শুধু সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য নিজের এবং সন্তানের এতটা ক্ষতি কেন করল? একজন নারী হিসেবে আরেকজন নারী, একজন মা হিসেবে আরেকজন মায়ের কাছে আমার এটাই জিজ্ঞাসা।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 642
  •  
  •  
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    644
    Shares

লেখাটি ৩,৫০৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.