জীবন মানেই গতিশীলতা, পরিবর্তনকে আলিঙ্গন করা

0

শিল্পী জলি:

এই বাটন টিপাটিপির যুগেও মাঝে মাঝেই দেশের লোকজন একটি ইস্যু নিয়ে কথা বলেন যে ছেলেপেলে টেকনোলজি নির্ভর হয়ে যাচ্ছে -দিনরাত ফেসবুকে পড়ে থাকে, সামাজিকতা ভুলে যাচ্ছে, এবং পারিবারিক জীবন ব্যহত হচ্ছে–ইন্টারনেট ব্যবহারের উপর কন্ট্রোল রাখতে হবে, নানা বিধি-নিষেধ আরোপ করতে হবে, নইলে ছেলেপেলের ভবিষ্যত অন্ধকার। মাঝে মাঝে সংসদেও এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়।

সেখানে মতামত দেয়া হয় ফেসবুকের কারণে পরকীয়ায় জড়িয়ে যাচ্ছেন ঘরের মহিলারা আর অনেকেরই ধুমধাম ঘর ভেঙে যাচ্ছে– রাষ্ট্রীয়ভাবে লাগাম লাগিয়ে ফেসবুক কন্ট্রোল করা দরকার, নইলে জাতির জীবন ঝরঝরে। 
তাহলে ফেসবুক উদ্ভাবনের আগে সমাজে কী কেউ পরকীয়ায় জড়ায়নি? 
আর ফেসবুক কী শুধু বাংলাদেশের সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ? 
যদিও দেশে অনেকেরই জানার কথা, পড়ার সময় পড়া, খেলার সময় খেলা প্রবাদটি।

একটা সময় ছিল দেশে যখন ছেলেপেলের জীবন ছিল শুধু মুখস্ত বিদ্যার উপর নির্ভরশীল– বুঝে বা না বুঝে রাতদিন চব্বিশ ঘন্টার আঠার/উনিশ ঘন্টা পড়ে ভালো রেজাল্ট করা যেত সেই যুগে, প্রতিষ্ঠিতও হওয়া যেত। এমন কী মাথায় না ঢুকলেও কেউ কেউ গণিতও মুখস্ত করে উৎরে যেতে পারতো তখন– মানুষের সৃষ্টিশীলতা, জ্ঞানের ব্যবহারিক প্রয়োগ, কাজের দক্ষতা, দ্রুতগতিতে কর্ম সম্পাদন, …এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতা ততটা প্রাধান্য পেতো না। বরং যারা দিনরাত পড়ে মুখস্ত ধরে রেখে ভালো রেজাল্ট করতে পারতো তারাই মেধাবি, এবং ভালো ছাত্র হিসেবে সমাজে গ্রহণযোগ্য হতো। আজকাল এই টেকনোলজির যুগে মানুষের আর সেই দিন নেই যে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে পড়ে সব বিষয়ে ভালো করে ভালো ছাত্রী/ ছাত্রের খেতাব অর্জন করবে এবং এই বিদ্যার উপর নির্ভর করে দীর্ঘ সময় বিশ্ব দরবারে চলাচল করতে সক্ষম হবে ।

এখন সারা বিশ্বেই খুব দ্রুততার সাথে জীবনের ধারা বদলে যাচ্ছে। সব সেক্টরের সাথেই টেকনোলজি, দ্রুতগতির চিন্তাভাবনা, ঝুঁকি গ্রহণ করার ক্ষমতা, ল্যাটারাল থিঙ্কিং, এবং সৃষ্টিশীলতা জুড়ে দেয়া হচ্ছে। ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আগের মতো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ধীরগতিতে চলে উন্নত বিশ্বে এখন আর চাকরিতে টিকে থাকার উপায় নেই। কেননা অনেক দেশেই এখন সময়ের সেকেন্ডের হিসেবে কাজ বেঁধে দেয়া হয় আর কম্পিউটার রেকর্ড রাখে কে কত নিখুঁতভাবে কত দ্রুততার সাথে কাজটি সম্পাদন করলো, এবং কার সৃষ্টিশীলতা কত বেশী।

বাংলাদেশে এখনও সেই হাওয়া না লাগলেও সেদিন আর বেশী দূরে নেই। তথাপি, বিদেশে এলেও সবাইকে খাপ খাওয়াতে হয় এসবের সাথে।অতএব এসব দ্রুত আয়ত্বে আনা ছাড়া দেশেও বেশীদিন পিছিয়ে থাকার আর উপায় নেই।

উন্নত বিশ্বে আজকাল অফিসেও মানুষ যাচাই করতে গেইম খেলতে দেয়া হয়। নারী-পুরুষ, জোয়ান-বুড়া সবাই-ই খেলেন বাধ্যতামূলকভাবে। মেডিকেল ফিল্ডও বাদ নেই। অনেকটা ভিডিও গেইমের মতই। সম্প্রতি, আতিক অফিস থেকে এসে বলে আমাকে একটি গেইম খেলতে হবে। ফান গেইম। তাদের অফিসের কেরানি থেকে শুরু করে সব বয়সী কয়েক হাজার নারীপুরুষকে খেলাটি খেলতে হয়েছে। ভাবখানা ছিল, জাষ্ট ফর ফান অথচ ফলাফল বলে দেবে কে কেমন টাইপের এবং কার কেমন কাজের দক্ষতা রয়েছে। উৎসাহী হয়ে খেলতে গেলাম—খেলতে গিয়ে আমার হালুয়া টাইট। এত কঠিণ যে মনে হলো আমার কোন ক্ষমতাই নেই– শূন্যও জুটবে না ভাগ্যে। বিষয়গুলো ছিল পরিস্হিতি বুঝে নানা কৌশলে দ্রুততার সাথে যুদ্ধ পরিচালনা করা এবং কিছু প্যাজেলের সমাধাণ। অনেকটা বাহুবালি ২ এর মতো। শত্রু নানা দিক থেকে নানাভাবে আসছে। রকমারি জটিলতায় ভরা গেইমগুলো , একেকটির নম্বরও ভিন্ন মানের–কোনটায় বেশী কোনটায় কম, সেটাও নিজে বুঝে অনুমান করতে হবে। সময় বেঁধে দেয়া। একেকটি গেইম হবে মাত্র চার মিনিট করে, আর চার মিনিটেই যাচাই করে ফেলবে মানুষটির আগাগোড়া– কোথায় দুর্বল, কোথায় সবল, জীবনে উন্নতির সম্ভাবনা কতটুকু এবং কত দ্রুততার সাথে, লিডারশিপের ক্ষমতা কেমন, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা আছে কী-না , উদ্ভাবনী ক্ষমতা কতটুকু ইত্যাদি সব বিষয়। উপরন্তু, রেজাল্ট চলে যাবে বসের কাছে। মাত্র ত্রিশ মিনিটের খেলা দিয়েই একটি মানুষের বর্তমান এবং ভবিষ্যত যাচাই হয়ে যাবে। অতপর চাকরি নিয়ে বাঁধবে টানাটানি। অথচ খেলার নিয়ম কানুন এবং নির্দেশনা বুঝতে বুঝতেই প্রায় পুরো সময় শেষ হয়ে যায়।

যারা জীবনে আগে এ জাতীয় গেইম নিয়ে টোকাটুকি করেনি তাদের অবস্হা এক কথায় ভয়াবহ– কেউ বলে দেবে না কিভাবে শুরু করতে হবে, কোন খেলাটি কিভাবে খেলতে হবে। মূল খেলার চেয়ে বিষয়টি বুঝতে পারাই বেশী কঠিণ। আর বোঝার পর নানা পদ্ধতি ব্যবহার করে অতি অল্প সময়ে উন্নত টেকনিক ব্যবহারের মাধ্যমে ভাল নম্বর আনতে পারা হলো উদ্দেশ্য। কিন্তু একবারের বেশী দু’বার চেষ্টা করার সুযোগ নেই।

আজকাল আমেরিকাতে প্রায় প্রতিটি কোম্পানিতেই এ জাতীয় বিষয়াদি জুড়ে দেয়া হয় ইমপ্লয়িদের যাচাইবাছাই করে মান নির্ণয় করতে। যেসব কোম্পানি এখনও এসব চালু করেনি তারাও হয়ত বেশী সময় আর নেবে না চালু করতে। সেখানে বাংলাদেশে ম্যানুয়াল পদ্ধতি নিয়ে বসে থাকলে এবং গতানুগতিক ধারায় যে শিক্ষা দেয়া হয় সেটার পরিবর্তন না করলে হুট করে এসে সবের সাথে তাল রাখতে পারবে না, জনগণ হিমশিম খাবে।

সারা বিশ্বে বলতে গেলে সবকিছুই এখন কম্পিউটারাইজড– একজন মানুষ ডাক্তার হোক, ইঞ্জিনিয়ার হোক, বিক্রেটা হোক, মেকানিক হোক, ড্রাইভার হোক বা দার্শনিক হোক যাই হোক না কেন সবারই প্রায় ৫০/৬০ শব্দ পার মিনিট হিসেবে টাইপসহ দ্রুততার সাথে এবং নিরাপদে টেকনোলজির ব্যবহার করতে জানা এবং যথাযথভাবে কাজের সাথে লিঙ্ক করতে পারা জরুরি, নইলে সেকেন্ডেই চাকরি নট হয়ে যায়। অধিকন্তু,সব কোম্পানিতেই ডিমান্ড থাকে চাকরিতে লোকজন নিজেকে যেনো আরও উন্নত এবং দক্ষ করার চেষ্টা জারী রাখে।

এমনকি বুড়ো হলেও নিস্তার নেই। সেখানে কোন দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে বাঁধা এবং আইনকানুন করে যদি এভাবে টেকনোলজি ব্যবহারে অনীহা সৃষ্টি করা হয় তাহলে জাতির মধ্যে সরাসরি ভয় ঢুকিয়েই দেয়া হয়। তখন জাতি ক্রমশ পিছিয়ে যেতে থাকে এবং ভবিষ্যতে আর বিশ্বের সাথে তাল রাখতে পারে না। বাংলাদেশ ক্ষণে ক্ষণে জাতির সামান্য ফেসবুক ব্যবহারে বিধিনিষেধ জারী এবং আটকাআটকি নিয়ে পড়ে থাকে। পূর্ণ বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রেও এমন ছোটখাটো বিষয় নিয়ে পড়ে থাকলে দেশের চলে কী করে ? 
দেশ টেকনোলজিতে এতো পিছিয়ে থাকলে ভবিষ্যতে হ্যাকারদের ঠেকাবে কী করে?

বিশ্বের সাথে তাল রাখতে দেশের পুরোনা ধারার মুখস্ত নির্ভর পড়ালেখার পদ্ধতি, এবং চিন্তাচেতনার ধারা বদলানো দরকার। ছোটবেলা থেকেই টেকনোলজির ব্যবহার, ক্রিটিক্যাল থিঙ্কিং, সৃষ্টিশীলতার অনুশীলন, ঝুঁকি গ্রহণ, এবং দ্রুতগতিতে চিন্তার অনুশীলনসহ নিজ হাতে নানাধরনের কর্ম সম্পাদনে অভ্যস্ত হতে হবে জাতিকে। বয়স অনুযায়ী টেকনোলজির সাথে পরিচিত হতে হবে, এবং যুগ ও সময়ের সাথে তাল রেখে দৌঁড়াতে হবে যেন বিশ্বের সাথে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে না পড়ে জাতি কেননা জীবন মানেই গতিশীলতা, ছুটোছুটি, ধাক্কা, এবং পরিবর্তনকে আলিঙ্গন করা।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2
    Shares

লেখাটি ৮৬৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.