নির্যাতনের প্রতিবাদ না করাই যখন নিয়ম হয়ে উঠে

0

আকতার বানু আলপনা:

দীর্ঘ আট বছর ধরে তার সৎ মেয়েকে ধর্ষণ করেছে বাবা!!! তরুণীর মা বিষয়টি জানলেও মেয়ের ওপর এ বর্বর, অমানবিক নির্যাতন বন্ধ করতে পারেনি। কেন পারেনি – সে প্রশ্নের উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি। হয়তো পরে জানা যাবে, অথবা কোনদিনও যাবে না। তবে কারণটি সবার জানা দরকার।

স্বাভাবিকভাবে কোনো মায়ের এটা মেনে নেবার কথা নয়। কেন নিয়েছে সেটা ঐ মা ভালো বলতে পারবে। তবে এরকম অপরাধ অবিশ্বাস্য হলেও ঘটছে প্রতিনিয়ত। আমরা দু’একটা ঘটনা সামনে এলে অবাক হই। আর অসংখ্য ঘটনা সম্পর্কে কোন প্রতিক্রিয়া দেখাই না। কারণ সেসব আমরা জানতে পারি না।

আমাদের দেশে যেকোনো অপরাধ ঘটার পর তার প্রতিবাদ না করে আমরা বিষয়টি গোপন করার চেষ্টা করি, এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করি বা অন্যায় হজম করে বিকল্প পথ খুঁজি। যেমন – স্বামী বা শ্বশুরবাড়ীর লোকেদের নির্যাতনের ঘটনার প্রতিবাদ না করে তাদের অন্যায় আবদার (যেমন-যৌতুক) মেনে নেই, মানুষরূপী জানোয়ারকে পিটিয়ে তক্তা না বানিয়ে আমরা ধর্ষণের ঘটনা গোপন করি, বখাটেদের নির্যাতনের প্রতিকার করতে না পেরে মেয়ের স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেই, শিক্ষকের মারের কারণে শিশুর পিঠে কালসিটে দাগ পড়লেও তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করি না, বাসে, ট্রেনে, ভীড়ে কেউ মেয়েদের গায়ে হাত দিলে আমরা মেয়েরা প্রতিবাদ না করে আরো আতংকিত হই এই ভেবে যে, কেউ দেখে ফেলেনি তো???

আমাদের দেশে অপরাধের লাগামহীন বৃদ্ধির একটি প্রধান কারণ হলো – প্রতিবাদ ও সম্মিলিত প্রতিরোধ না করা। আমাদের দেশের সামাজিক ও পারিবারিক ব্যবস্থায় শিশুরা ছোটবেলা থেকে মেয়েদেরকে দুর্বল ও ছেলেদেরকে শক্তিশালী, ক্ষমতাবান, প্রভু ভাবতে শেখায়। একারণে ছেলেরা নির্দ্বিধায় অপরাধ করে। মেয়েরা এবং সমাজ তাদের অপরাধ মেনে নেয়। পরিবার, সমাজ মনে করে, “সেতো ছেলে! তাই এমন করতেই পারে।”

আসুন জানার চেষ্টা করি, কেন আমরা প্রতিবাদ করি না, কেন জেনেশুনে নানা অন্যায় মেনে নেই???

১. নিরাপত্তাহীনতার কারণে।

২. সামাজিকভাবে হেয় হবার ভয়ে।

৩. সত্যিকারের আইনের শাসনের কঠোর প্রয়োগের অভাব আছে বলে।

৪. বিপদের সময় আশেপাশের মানুষের সাহায্য না পাওয়ার কারণে।
,
৫. বিচারিক দীর্ঘসূত্রিতা, পুলিশী ও অপরাধীর হুমকি-ধামকি, নির্যাতন ও হয়রানির কারণে।

৬. অপরাধীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার মতো অর্থ ও মানুষের সাহায্যের অভাবে।

৫. প্রকৃত শিক্ষার বা সচেতনতার অভাবে। আত্মসম্মানবোধ ও আত্মসচেতনতার অভাবে।

৬. মেয়েদের প্রতি হীন মানসিকতা ও তাদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের অভাবের কারণে আমরা মেয়েদের প্রতি অন্যায়ের প্রতিবাদ করিনা।

৭. অপরাধীকে শাস্তি দিতে না পারলে দেশ, সমাজ তথা আক্রান্ত ব্যাক্তি কি কি ক্ষতির সম্মুখীন হয়, সে বিষয়ে আমাদের জ্ঞানের অভাবের কারণে।

৮। আমরা জেনে শুনে আপনজনের অপরাধ গোপন করি, ছেলেমেয়েদেরকে তাদের প্রতি হওয়া অন্যায় গোপন করতে বাধ্য করি। তাতে অপরাধীরা আরও অপরাধ করার দুঃসাহস পায়। পুরুষরা অন্যায় করলেও তাদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ হয় না। অভিযোগ করলেও তাদের শাস্তি হয় না। টাকার জোরে ছাড়া পেয়ে যায়। এই কারণগুলো নারীকে মানসিকভাবে ছোট ও দুর্বল ভাবতে শেখায়। তাই তারা সব জেনেশুনে চুপ করে থাকে।

আমাদের এ উপমহাদেশে পারিবারিক, সামাজিক, আর্থিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক, ইত্যাদি সবক্ষেত্রে নারীর প্রতি নানারকম বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়। এমনিতেই আমাদের দেশের মেয়েরা প্রতিনিয়ত নানা অমানবিক ও দৈহিক-মানসিক নির্যাতনমূলক আচরণের শিকার। তার উপর মাথার উপরে বাবা, স্বামী বা ছেলে, মানে কোনো পুরুষের ছায়া না থাকলে মেয়েরা আরো বেশী আক্রমণযোগ্য হয়ে যায়। তাই যতো সমস্যাই হোক, যতো অত্যাচারই করুক, তবু বাবা-মা চায়না মেয়ে স্বামীকে তালাক দিক। তাই মেয়ের উপর যতো নির্যাতনই হোক, মেয়েরা এবং তার পরিবার সেটা গোপন করে ডিভোর্সের কারণে সামাজিকভাবে হেয় হবার ভয়ে।

সব ধর্মে বহুবিবাহ জায়েজ। কোন কারণ না দেখিয়েও স্ত্রীকে ডিভোর্স দেয়া যায়, না দিয়েও একাধিক বিয়ে করা যায়। তাই বহু স্বামী বউ ছেড়ে গিয়ে আবার বিয়ে করে, করতে পারে। তাতে স্বামীর কোন শাস্তি হয়না। যেকোন বয়সী পুরুষ খুব সহজে দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারে। কিন্তু মেয়েরা পারেনা, বিশেষ করে সন্তান থাকলে তো আরও পারে না। তাই স্বামীদের নানা অপরাধ হজম করে হলেও মেয়েরা তাদের সাথে সংসার করে।

তাছাড়া বাবা বা ভাইরা বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তা মেয়ে ও তার সন্তানদের আর্থিক দায় নিতে চায়না। এমনিতেই আমাদের দেশের মেয়েদের ভাল বিয়ে হওয়া সহজ নয়। তার উপর মেয়ে অসুন্দর, বেকার, ডিভোর্সি বা ধর্ষিতা হলে তো আরোই সমস্যা।

তাই মেয়েরা নির্যাতিত, ধর্ষিত বা যৌন নির্যাতনের শিকার হলে আমরা গোপন করি। কারণ মেয়েটিকেই সবাই অস্পৃশ্য মনে করবে, তার ভাল বিয়ে হবেনা, তার পরিবারের বদনাম হবে। অথচ যারা অন্যায় করল, তাদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ হয়না। এগুলো নারীকে মানসিকভাবে ছোট ও দূর্বল ভাবতে শেখায়। একটি মেয়ের সম্ভ্রম চলে যাওয়া মানে সমাজে সে অপাংতেয়। পচে যাওয়া খাবারের মত, যা কেউ খেতে চায়না।

অন্যায়ের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নেই।অর্থাৎ মেয়েদের প্রতি অন্যায় করে পার পাওয়া যায়। পুরুষ দোষ করলেও সমাজ মেয়েদেরকেই দায়ী করে। যেমন ডিভোর্স হয়েছে শুনেই বলা হয় নিশ্চয় মেয়ের দোষ, রেপ হয়েছে শুনেই বলা হয়, নিশ্চয় খোলামেলা পোষাক পরেছিল, স্বামী মেরেছে শুনেই বলে মারতেই পারে, সে তো স্বামী, দোষ না করলে এমনি মারে? ফলে মেয়েরাও মেনে নেয় যে তার প্রতি নির্যাতন হওয়াটাই স্বাভাবিক। সেটাই ন্যায্য।

পুরুষ রেপ করলে, পতিতালয়ে গেলে, পরকীয়া করলে, প্রেমিকার সাথে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণা করলেও তার বদনাম হয়না, তাকে কেউ খারাপ বলেনা। দিব্বি আবার বিয়ে করতে পারে, তার মান এতটুকু কমেনা। কিন্তু মেয়েরা সমাজের চোখে একবার ভ্রষ্টা খেতাব পেলে তার বেঁচে থাকা দায় হয়ে যায়।

শিশুরা বা মেয়েরা যৌন হয়রানির শিকার হলেও আমরা নিজেদের সম্মান, পারিবারিক মর্যাদা ক্ষুন্ন হবার ভয়ে গোপন করি। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে মানুষ সামাজিকভাবে হেয় হবার ভয়ে ক্ষমতা থাকা সত্বেও অপরাধীককে শাস্তি দেয়না, দেবার চেষ্টা করেনা, গোপন করে। অনেক উচ্চবিত্ত, শিক্ষিত পরিবারের মানুষও অপরাধীরর বিরুদ্ধে মামলা করেনা লোক জানাজানির ভয়, বিচারের নানা হয়রানী সহ্য না করার মানসিকতা বা মেয়েটির ভবিষ্যতের চিন্তা (লোকে নানা কথা বলবে, ভাল বিয়ে হবেনা..) করে। এতে অপরাধী যেমন প্রশ্রয় পেয়ে আরো অপরাধ করে, তেমনি নির্যাতিত ব্যাক্তি ন্যায় বিচার না পেয়ে বার বার নির্যাতিত হয়। এই মেয়েটির বেলায়ও তাই হয়েছে।

ভারতের কিছু সিরিয়াল আছে। যেমন, ক্রাইম পেট্রল, সাবধান ইন্ডিয়া। আমি মাঝে মাঝে দেখি। এখানে অপরাধের নানা দিক তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে পারিবারিক যৌন অপরাধ ও খুনের। একটি পর্বে দেখলাম, এক দরিদ্র মা ও তার মেয়েকে হবু জামাই তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক করতে বাধ্য করে। নাহলে সে মেয়েকে বিয়ে করবেনা। মা বাধ্য হয়ে মেয়ের বিয়ের আশায় সব মেনে নেয়। কিন্তু যখন জামাই তার স্কুলপড়ুয়া ছোট মেয়ের দিকে নজর দেয়, তখন মা হবু জামাই কে কৌশলে গোপন স্থানে নিয়ে গিয়ে খুন করে। কত বিচিত্র ঘটনা যে ঘটছে, যা আমরা কল্পনাও করি না!

আমি একটি মেয়েকে দেখেছিলাম। বয়স তেরো। রোজ রাতে সে তার শিশুকন্যাকে গলা টিপে মেরে ফেলতে চায়। কারণ শিশুটির পিতা মেয়েটির আপন বাবা। মা মারা যাবার কিছুদিন পরেই রোজ রাতে তার বাবা তাকে রেপ করত। দাদী, চাচা, চাচী কেউ তার কথা বিশ্বাস করেনি। একসময় মেয়েটা গর্ভবতী হলে ঘটনা জানাজানি হয়। সবাই মেয়েটাকেই দোষ দেয় যে তার কোন প্রেমিক ও সে একাজ করেছে। কেউ বিশ্বাস করেনি যে কাজটা তার বাবা করেছে। এই অপমানে মেয়েটি ট্রেনের নীচে আত্মহত্যা করতে যায়। সেখান থেকে কিছু মানুষ মেয়েটিকে উদ্ধার করে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারী শিশু সদনে দেয়। সেখানেই মেয়েটি একটি কন্যা শিশুর জন্ম দেয়। মেয়েটি বার বার বাচ্চাটি নষ্ট করিয়ে দিতে বলেছে। কোন কারণে সেটি সম্ভব হয়নি। জন্মাবার পর বাচ্চাটাকে সে নিতে চায়নি। সদনের লোকজন বলেছে, শিশুটির বয়স দু’বছর হলে শিশুটিকে কোনো অনাথ আশ্রমে দিয়ে দেয়া হবে। মেয়েটি রোজ ঐ শিশুটিকে দেখে আর বাবার সেই বিভৎস চেহারা মনে করে কাঁদে। মেয়েটি যে পাগল হয়ে যায়নি, এটা দেখেই আমি অবাক হয়েছিলাম সবচেয়ে বেশী। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমরা ‘মানুষ’ তো????

ঢাকার এ ঘটনার মূল কারণ হতে পারে মেয়েদের আর্থিক-সামাজিক নির্ভরশীলতা ও মেয়েদের একা থাকার সমস্যা। মেয়েরা একা নিরাপদ নয়। আর কথা না শুনলে স্বামী কর্তৃক নির্যাতনের ভয়, ভাল হয়ে যাবে, আর করবে না, এমন মিথ্যে আশা, ইত্যাদি অনেক কারণই থাকতে পারে। মা হয়তো চেষ্টা করছিল মেয়েটার একটা বিয়ে হয়ে গেলেই সব মিটে যাবে…। হয়তো মা-মেয়ের আত্মসম্মানবোধ ও আত্মবিশ্বাসের অভাব প্রতিবাদ না করার জন্য দায়ী ছিল,….।

তবে কারণ যাই থাকুক, মা-মেয়ের মুখ খোলা দরকার। প্রকৃত কারণটা সবার জানা দরকার। বোঝা দরকার আমাদের পারিবারিক নিরাপত্তা বলয়েও নিজের মায়ের কাছে তার সন্তান অনিরাপদ হবার পেছনে কি কি কারণ আছে?

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

লেখাটি ৯৯৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.