পুরুষ আর আমার যন্ত্রণারা

0

হাবিবা রিমা:

আমি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি দিন দিন। রাস্তায় বের হলে যেকোনো পুরুষকে কেমন অসহ্য লাগে। বাসে পাশের সিটের তরুণ থেকে শুরু করে আশি বছরের বৃদ্ধ সবাইকে সারাক্ষণ সজাগ দৃষ্টি দিয়ে পাহারা দিয়ে রাখি। কোলের ব্যাগটিকে সবসময় বুকের সাথে দুহাত দিয়ে এমনভাবে চেপে রাখি যাতে পাশের পুরুষটি বারবার পকেট থেকে টাকা, রুমাল বা মোবাইল বের করার ছলে না বোঝার ভান করে আমার শরীর ছুঁয়ে না যায়। আমার হাতে স্পর্শ লাগলেও তার শরীর বা হাত যেন আমার লজ্জাকাতর স্থানগুলোতে না লাগে।

দিনশেষে যখন আমি বাড়ি ফিরি দেখি আমার হাত দুটো ব্যথা হয়ে গেছে ভাঁজ করে রাখতে রাখতে। 
আমার কেমন জানি সব পুরুষকে সন্দেহ হয়। তাদের ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত স্পর্শ সবকিছুতেই কেমন গা গুলিয়ে আসে। দিনদিন মারমুখী হয়ে যাচ্ছে আমার ভাবনারা। বাইরে বেরোলে সারাক্ষণ কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ে থাকে। কত অসভ্য দৃষ্টি, ইঙ্গিত আর স্পর্শ থেকে নিজেকে বাঁচাতে বাঁচাতে আমি ক্লান্ত।

কী করবো? একটু অসাবধান হলেই যদি কালো হাতের ছোবল খাই তাহলে আরও অসুস্থ হয়ে যাবো নষ্ট সমাজের চিন্তায় চিন্তায়। সারাদিন টিভিতে, ফেসবুকে ধর্ষণসহ নারী নির্যাতনের এতো এতো খবর চোখে পড়ে যে সত্যি আমি আর নিতে পারছি না এসব।
বাইরে বের হলে আমার ব্রেইন ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সারাটা পথ আমি পরিকল্পনা করি কী করবো যদি খারাপ কোনো পুরুষের লোলুপতার শিকার হই, কীভাবে মারবো, কীভাবে প্রতিবাদ করবো?

কথার গর্ভে কত কথা যে প্রসবের আগেই মরে যায়, কত কথা যে বলি নিজের সাথে অবিরাম, কত কথার জন্ম দিতে চেয়েও পারি না, সে আমি কাকে বলবো?

এসবের পরিণতি হিসাবে যখন বাসায় ফিরি, তখন দেখি আমার মাথাটা বড্ড ব্যথা করছে।

সৎ বাবা, নিজের বাবা দ্বারা একজন মেয়ের ধর্ষণের খবর যখন পড়ি, তখন আমি ঘুমাতে পারি না ভয়ে। ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়লেও হঠাৎ ভয়ে জেগে উঠি কোনো দুঃস্বপ্ন দেখে। অজান্তেই নিজের শরীরের কাপড় ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে নেই।

হায়রে নারী জীবন! যাকে আমি আমার আদর্শ বলে মানি সেই মানুষটি, আমার পরম শ্রদ্ধেয় বাবাকে আজকাল অন্ধের মতো বিশ্বাস করতে পারি না আমি। খুব খারাপ শোনা গেল কথাটা!

আমি জানি আমার বাবা নির্লোভ, তবু কোনো কারণে, কোনো বয়সে সে অন্য কোনো নারীর শরীরে হামলা করবে না এমন কথা বলার দৃঢ়তা আমি সত্যি হারিয়ে ফেলেছি সমাজের কলুষিত পুরুষগুলোকে দেখে দেখে, যারাও তো কারও না কারও বাবা! একটা মেয়ের জন্য এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে?

এই যে এখন আমার চোখ দিয়ে জল পড়ছে কেন জানেন? বাবার হাতে ধর্ষণের শিকার সেইসব মেয়ের কথা মনে পড়ছে, তাদের ছোট্ট-নরম আদুরে হাতের কথা মনে পড়ছে, যে হাত তার বাবার আঙ্গুলে ভরসার ঠাঁই খুঁজে নিয়েছিল একসময়, যাদের কচি কচি হাতও নিশ্চয়ই একসময় আমার মতো তাদের বাবার চুলে পরম মমতার পরশ বুলিয়েছে!

আমার কষ্ট হয়, খুব কষ্ট হয়। আমি সত্যি অসুস্থ্য হয়ে পড়ছি ভীষণভাবে দিন দিন। আমি কী করবো? 
আমি নিজের চোখে দেখেছি পাঁচ বছর বয়সে ধর্ষণের শিকার শীলাকে (সত্যি নামটা গোপন রাখলাম)। ওকে আমি এই হাতে কোলে নিয়েছি। আমি পাগল হয়ে যাই, কারণ আমার কানে প্রায়ই ওর ভীত আর কান্না জড়ানো গলা ভেসে ওঠে, “আপু, ওই লোকটা আমারে মারছে, আমার গায়ে প্রস্রাব করে দিছে”।

কতটা অবুঝ মেয়ে দেখেন, যে কিনা তার শরীরে ঢেলে দেওয়া জানোয়ারের পাপরসকে প্রস্রাব মনে করেছিল! 
মেয়েটার ওই একটা কথা কত বছর ধরে আমার কানে বাজছে যে আমি সত্যি আর নিতে পারছি না এসব, সত্যি পারছি না।

আমি মুক্তি চাই, আলোয় আলোয়, ধূলায় ধূলায়, কিন্তু এই আকাশে মুক্তি খুঁজবো কী করে? চারপাশের নারী শরীরলোভী, মাংসলোভী জানোয়ারগুলো আমাদের মুক্তির আনন্দকে করে দিতে চায় বিষাদময়। তবু আমি মুক্তি চাই, সত্যি চাই মুক্ত হতে। অসুস্থ জীবন থেকে আমায় কেউ কি নিয়ে যাবে আলোর পথে???

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.