মানুষের দেশ চাই, ধর্ষকের অভয়ারণ্য নয়

0

ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী:

মেয়েটির বয়স এখন বিশ বছর। গত আট বছর ধরে মায়ের দ্বিতীয় স্বামীর ( সৎ শব্দটি জুড়ে দিয়েও তাকে আর যাই হোক বাবা বলতে পারছি না) দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়ে আসছিলো মেয়েটি। সহ্যের সীমা পার হবার কথা বহু আগেই। ইতিমধ্যে সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়লে তার গর্ভপাতও ঘটানো হয়েছে। অর্থাৎ মেয়েটিকে নির্যাতন করা শুরু হয় যখন তার বয়স বারো বছর!

মাত্র বারো থেকে বিশ – উড়ে বেড়ানোর দিন, ঘুরে বেড়ানোর দিন, লেখাপড়া করে তরতর করে সামনে এগিয়ে যাবার দিন। অথচ এই সময়ের মধ্যেই সে বয়ে বেড়াতে শুরু করেছে বিভীষিকাময় জীবন।

২০০৫ সালে মায়ের বিয়ের বছর খানেক পর থেকে মায়ের দ্বিতীয় সংসারে থাকতে শুরু করে মেয়েটি। এর তিন বছর পর তার ওপর নেমে আসে সেই বীভৎস দুপুর। মেয়েটির মায়ের অফিসে থাকার সুযোগটা কোনোমতেই হাতছাড়া করেনি বিকৃত রুচির সেই পুরুষটি। এতেই ক্ষান্ত হয়নি সে, ছবি তুলে, ভিডিও করে ব্ল্যাকমেইল করার যাবতীয় বন্দোবস্ত পাকাপোক্ত করে রেখেছে যাতে দিনের পর দিন চালিয়ে যাওয়া যায় এ বর্বরতা।
আট বছর সহ্য করার পর মেয়েটি সাহস অর্জন করেছে আইনের সাহায্য প্রার্থনা করতে। মেয়েটির ঘনিষ্ঠ আত্মীয় সুত্রে জানা গেছে যে, মেয়ের মা স্বামীর এ জঘন্যতম অপরাধের কথা জানতো এমনকি স্বামীর অপকর্মে সেও সহযোগিতা করে এসেছে ! ঠিক এই জায়গাতে এসেই আসলে থমকে গেছি। 
এমন ঘটনা অনেককে বাকরুদ্ধ করে দিলেও আমি বলবো, মেয়েটির থানায় গিয়ে রিপোর্ট করাটা হয়তো নতুন, কিন্তু ঘটনা কী নতুন? আমাদের চারপাশেই তো এসব ঘটছে। আগেও ঘটেছে। কিন্তু আমরা পারিবারিকভাবে শক্ত পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছি। রক্ষণশীল মনোভাব দিয়ে আমরা ঘরের মধ্যে ধর্ষক পুষছি আর মান্ধাতা আমলের “লোকে কী বলবে”-র মতো ধ্যানধারণায় পড়ে থেকে  ভিকটিম মেয়ের মুখ ঠেসে ধরছি। কারণ, মেয়ের ” নিরাপত্তার ” চেয়ে ” পারিবারিক সম্মান ” আমাদের কাছে বড়। 
তা নাহলে প্রায় প্রত্যেকটি মেয়েশিশুকেই কেন পরিবারের সদস্য, পারিবারিক বন্ধু বা আত্মীয়স্বজন দ্বারা abused হতে হয় ? এবং তারপরও কেন নিজের ” সম্মানহানির ” ভয়ে নীরবতা অবলম্বন করতে হবে? কোথা থেকে, কার কাছ থেকে এই গর্হিত অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়া আর ভিকটিমকে অপরাধবোধের মিথ্যে বলয়ে আবদ্ধ করার কুশিক্ষা পাচ্ছি আমরা ? 
পরিবার – যা কিনা একটি মানুষের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় !  মা – জননী – জন্মদাত্রী, যে মানুষটি পৃথিবীর সব মানুষের চেয়ে আপন – সেই পরিবারে যখন সন্তানের জীবন অরক্ষিত, অনিরাপদ হয়ে পড়ে, একজন মা যখন তার গর্ভজাত সন্তানকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়  – 
তখন কোথায় গেলে নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে আমাদের সন্তানদের ?
স্বাভাবিকভাবেই সেই মায়ের ভূমিকা আজ ভীষণরকম প্রশ্নবিদ্ধ। মেয়ে কেন আরো আগে পুলিশকে জানায়নি – সে প্রশ্ন আমি করবোনা তার বয়স এবং মানসিক অবস্থা বিবেচনায়। কিন্তু মায়ের ভূমিকা আমাকে ভাবাচ্ছে।  হোক এটা তার দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ বা চব্বিশতম স্বামী – তা আমাদের ধর্তব্য না, বরং জানা জরুরি,  কী এমন আর্থিক – মানসিক নির্ভরতা বা আশ্রয় হারানোর ভয় বা নিরাপত্তাহীনতার আশংকায় একজন মা তার মেয়েকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি?  এমন কী হতে পারে যে, সে নিজেও ঘটনার শিকার? ব্ল্যাকমেইলের শিকার? বিকৃতির শিকার? সংসার বাঁচাতে সে আসলে ঠিক কতোটাই মরিয়া, অসহায়, নিরুপায়, বেপরোয়া বা মেরুদণ্ডহীন ছিল যে নিজের মেয়ে ধর্ষণের শিকার হলেও তার কিছুই করার ছিল না?  নাকি বর্তমান স্বামী – সংসারের মোহে অতিমাত্রায় স্বার্থান্ধ হয়ে আগের সংসারের সন্তানের প্রতি তার চরম অবহেলাই এই রোমহর্ষক ঘটনার জন্য দায়ী ? শুধু অবহেলা বলেও তো মানা যায়না ! যদি সে সত্যিই তার বর্তমান  স্বামীর কাম- লালসা চরিতার্থ করতে নিজের গর্ভজাত কন্যাকে বাধ্য করে থাকে – তা নিছক অবহেলা বলে এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। কোনোভাবেই একজন মা এই দায় থেকে মুক্ত হতে পারেনা। বারো বছর বয়স থেকে মেয়েকে ধর্ষণ করা হচ্ছে। তার শারিরীক – মানসিক পরিবর্তন – টানাপোড়ন পৃথিবীর কেউ না বুঝলেও মায়ের চোখ এড়ানো সম্ভব নয়। একইভাবে এতো বছরে স্বামীর যৌনজীবনের অস্বাভাবিকতাও পার্টনার হিসেবে তার অজানা থাকার কথা না। এ অপরাধের দায়ে তাহলে তাকেও বিচারের আওতায় আনতে হবে। 
আমি একজন মা। আমি জানি আমার সন্তানের নিরাপত্তার প্রশ্নে যেকোনো পরিস্থিতিতে আমি মানুষ থেকে কতটা হিংস্র বাঘিনী হতে প্রস্তুত।
যে কোনো মা-ই সন্তানকে নিরাপদ রাখতে তার সর্বোচ্চ ক্ষমতা ব্যবহারে পিছপা হবেনা। তাই বছরের পর বছর ধরে নিজের সন্তানের ধর্ষণযজ্ঞে এই মায়ের ” টলারেন্স ” আমাকে কিছুতেই স্থির থাকতে দিচ্ছেনা। 
এই মানুষরূপী ইবলিশগুলো তো কোনো ভিনগ্রহের এলিয়েন না, আর পাঁচটা মানুষের মতোই মিশে আছে কোটি মানুষের ভিড়ে ! 
ধর্ষক আরমান হোসেন সুমন এক বিকৃতমনস্ক মানুষরূপী শয়তান। ভয়ংকর ব্যাপার হলো, বিকৃত এক যৌন জীবনযাপনে অভ্যস্ত এই আরমান হোসেন সুমন একটি প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে ( নিউজ24 ) শব্দ প্রকৌশলী হিসেবে বহালতবিয়তে কাজ করে আসছে। সামাজিক পরিচিতি আছে তার। 
আত্মীয়,  সহকর্মী, বন্ধু কারো কাছেই কী তার চারিত্রিক বিকৃতি, অস্বাভাবিকতা ধরা পড়েনি কখনো ? প্রশ্ন তো জাগেই ! ধর্ষক আরমান হোসেন সুমনকে তার প্রাপ্য শাস্তি কড়ায়গণ্ডায় বুঝিয়ে দেয়ার দাবি জানাই।
তারপরও আমি চিন্তিত মেয়েটির ট্রমা কাটিয়ে ওঠা নিয়ে। তাকে সাহস দেয়া দরকার। 
সমাজ এবং রাষ্ট্রের কাছে নিরাপত্তা চাওয়ার আগে আমরা আমাদের পারিবারিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করি । পরিবারের সম্মান ধর্ষককে বাঁচানোর মধ্যে দিয়ে রক্ষা করা যায়না। আর মেয়েদের সম্মান ধর্ষণকে গোপন করার মধ্যে নিহিত না। এখনো না বুঝলে আর কবে সম্বিৎ ফিরবে আমাদের ? 
আমরা আমাদের শিশুদের বাঁচতে দেখতে চাই , বিকৃত যৌনাচারী, পেডোফিলিকদের নয়।
মানুষের দেশ চাই, ধর্ষকের অভয়ারণ্য নয়
লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ১,৭৪৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.