শরীরসর্বস্ব সম্মানবোধ থেকে বেরুতে হবে নারীকে

জিনাত হাসিবা স্বর্ণা:

এদেশের নারীদের মধ্যে শরীরসর্বস্ব সম্মানবোধ আছে এক রকমের। নারীর সম্মান সম্পর্কে পুরুষেরও মানসিকতা এমনই। এটা এ সমাজের অংশ হয়ে গড়ে ওঠার সমস্যা, যাকে আমরা ‘সোশ্যালাইজেশন’ বলি।

যে মেয়েটি একবার ধর্ষণের শিকার হয়েছে বলে পতিতালয়ে আশ্রয় খুঁজে নেয়, কিংবা মনে করে এটা ছাড়া তার আর কোনো স্থান নেই- তার সমস্যা যেমন এই শরীরসর্বস্ব সম্মানবোধে, যে মেয়েটি পরিবারের কোনো সদস্য দ্বারা যৌন নির্যাতন বা হয়রানিতে দিনে দিনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে- তার মননও এই বোধকেই নির্দেশ করে।

যে বাবা/ভাই/মা/বোন/দাদা/দাদী যে কোন স্বজন মেয়েটির উপর যৌন হয়রানি বা নির্যাতনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অনুমোদন দেয়, তাদেরও মূল সমস্যা এই বোধে। এই বোধকে পূঁজি করেই চেপে যাওয়ার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। সাথে আছে পরনির্ভরতা, আত্মবিশ্বাসের অভাব, কোনো কাজে দক্ষ হয় ওঠার মানসিকতার অভাব, এবং জীবনটাকে শুধু বিয়ে-সন্তান উৎপাদন-সন্তান প্রতিপালন ও ‘সংসারজীবনে’ বেঁধে এই শরীরসর্বস্ব সম্মানের সাথে পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার চর্চা।

আমি কোনো যৌন নির্যাতন চেপে যাওয়ার ঘটনাতেই অবাক হইনা। কতো রকমের কারণকে অবলম্বন করে এসব ঘটছে তা দেখছি বহুদিন ধরে। মেয়েটি এক মাস কিংবা আট বছর চেপে গেছে ধর্ষিত হবার খবর, এটা অনাকাঙখিত হলেও এটাই হচ্ছে। সারাজীবন চেপে যায় মানুষ, অন্যের কাছে দূরের কথা, নিজের কাছেও চেপে যায়।

আমি নড়ে চড়ে বসি যখন মেয়েটা বলে দেয়। নিজের কাছে বলে দেয়। সবার কাছে বলে দেয়। মুহূর্তে বলে দেয়, মিনিটে বা ঘন্টায় বা দিনে বা মাসে বা বছরে- এক, দুই, তিন…৮,…১৫….২০ যতো বছর পরেই হোক। একবার দুইবার হয়রানি, তারপর নির্যাতন, তারপর মেনে নেওয়া, তারপর অভ্যস্ততা, এমনকি কোনো এক পর্যায়ে ভালো লাগাও যদি হয়- মেয়েটা যখনই বলে দেয় অন্যায় হয়েছে, অন্যায় হয়েছিলো, কিংবা শুধু বলে দেয় ‘এরকম টা হয়েছিলো’, তখনই আমি নড়ে চড়ে বসি। শুনতে চাই। বলতে দিতে চাই। ও বলুক, অন্যরা জানুক, ভবিষ্যতের মানুষগুলি নতুন করে গড়ে উঠুক।

সারাজীবন চেপে যাওয়া ঘটনা অহরহ। যে, যখন, যে পর্যায়ে বলতে চায় তাকে বলতে দেওয়া হোক।

১৪ জুলাই ২০১৭

শেয়ার করুন:
  • 664
  •  
  •  
  •  
  •  
    664
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.