আট বছর ধরে মেয়েকে ধর্ষণ করেছে সৎ বাবা!!!

0

আকতার বানু আলপনা:

ধর্ষণের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই এলো সাবিনাদের নির্যাতনের বিভৎসতা। আজ আবার পেলাম তার চেয়েও বর্বর ঘটনার প্রমাণ। ফেসবুকেই। বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে না। কিন্তু “সামটাইমস ট্রুথ ইজ স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফ্রিকশন!” কিছু সত্যি ঘটনা স্তব্ধ করে দেয় আমাদের।
 
খবর অনুযায়ী, আরমান হোসেন ওরফে সুমন (৩৮) নামে এক ব্যক্তি দীর্ঘ আট বছর ধরে তার স্ত্রীর আগের পক্ষের মেয়েকে ধর্ষণ করেছে!  সুমন বেসরকারি টিভি চ্যানেল নিউজ ২৪-এর শব্দ প্রকৌশলী (সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার)। মেয়েটিকে ভিডিও প্রকাশের হুমকি দেয়ার পর সে পুলিশের শরণাপন্ন হয়। পুলিশ সুমনকে গ্রেপ্তার করেছে।
পুরো ঘটনাটার বিস্তারিত শুনে আমি স্তব্ধ। মেয়েটির মা নাকি জানতো বিষয়টা, কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে সে তা চেপে যায়।  
আমাদের বিবেক আদৌ আছে কিনা আমার সন্দেহ হয়। যারা নারীবাদীদের গালি দিতে পছন্দ করেন, কিছু কিছু ঘটনা তাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় – আমাদের দেশের মেয়েরা কত রকম ভাবে, কত বিকৃতভাবে দিনের পর দিন নির্যাতিত হয়। কত কষ্ট সহ্য করে সব জেনেশুনে মেয়েরা অমানুষ স্বামীদের ঘর করে।
 
আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। আমরা আদৌ মানুষ কিনা! কী শাস্তি দিলে এই জানোয়ারের অপরাধের সঠিক বিচার হবে? এজন্যই প্রতিটা মেয়ের নারীবাদী হওয়া দরকার। কেন আমাদের মেয়েরা সাহস করে প্রতিবাদ করে না? কিসের এতো ভয় তাদের? ঘর ভেঙ্গে যাবে? আশ্রয়হীন হবে? সামাজিক মর্যাদা কমে যাবে? আর্থিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে? তাই চুপ করে থাকো? দিনে দিনে অপরাধীরা যে তোমার আত্মা খেয়ে ফেলে, তাতে কি কিছুমাত্র কম ক্ষতি হয়? তাতে তোমার কি অবশিষ্ট থাকে?
 
আমাদের পুরুষতান্ত্রিক পারিবারিক ব্যবস্থায় একটি মেয়ে ছোটবেলা থেকে দেখে, সংসারে ভাই, বাবা বা অন্য পুরুষরা ক্ষমতাবান। তারা মেয়েদের শাসন করে, করতে পারে। মেয়েটি বৌ থাকা অবস্থায় স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকেরা তাকে নির্যাতন করে, করতে পারে। মেয়েরা ধীরে ধীরে শেখে, মেনে নেয় যে মেয়েরা নির্যাতিত হবারই যোগ্য। নিজে নির্যাতিত হতে হতে তারা ধরেই নেয়, দুর্বল মেয়েদের উপর নির্যাতন হওয়াটাই স্বাভাবিক। এ কারণে তারা নির্যাতিত হলেও সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তার ভয়ে বেশীরভাগ পরিবার নির্যাতনের কথা গোপন করে বা নির্যাতনের প্রতিকার করে না।
 
যেমন এই ঘটনাটিতে মা সবকিছু জেনেও মেয়েটিকে রক্ষা করার জন্য কিছুই করতে পারেনি। স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা, স্বামীকে তালাক দেয়া বা মেয়েটাকে নিরাপদ কোথাও পাঠাতে পারেনি। কেন?
 
১। কারণ মেয়েকে নিয়ে একা বেঁচে থাকা কষ্টকর। আমাদের এ উপমহাদেশে পারিবারিক, সামাজিক, আর্থিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক, ইত্যাদি সবক্ষেত্রে নারীর প্রতি নানারকম বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়। এমনিতেই আমাদের দেশের মেয়েরা প্রতিনিয়ত নানা অমানবিক ও দৈহিক-মানসিক নির্যাতনমূলক আচরণের শিকার। তার উপর মাথার উপরে বাবা, স্বামী বা ছেলে, মানে কোন পুরুষের ছায়া না থাকলে মেয়েরা আরো বেশী আক্রমণযোগ্য হয়ে যায়। তাই যত সমস্যাই হোক, যত অত্যাচারই করুক, তবু মেয়েরা স্বামীকে তালাক দেয়না এবং স্বামীর অপরাধ গোপন করে ডিভোর্সের কারণে সামাজিকভাবে হেয় হবার ভয়ে।
 
২। কারণ লোক জানাজানি হলে লোকে মেয়েটাকেই দোষারোপ করবে, মেয়েটাকেই সবাই খারাপ ভাববে, খারাপ বলবে। তাই মেয়েরা নির্যাতিত, ধর্ষিত বা যৌন নির্যাতনের শিকার হলে আমরা গোপন করি। কারণ মেয়েটিকেই সবাই অস্পৃশ্য মনে করবে, তার ভাল বিয়ে হবেনা, তার পরিবারের বদনাম হবে। একটি মেয়ের সম্ভ্রম চলে যাওয়া মানে সমাজে সে অপাংতেয়। পচে যাওয়া খাবারের মত, যা কেউ খেতে চায়না। মেয়েরা সমাজের চোখে একবার ভ্রষ্টা খেতাব পেলে তার বেঁচে থাকা দায় হয়ে যায়। অথচ পুরুষ যত দোষই করুক, তার মান যায়না, তাকে কেউ খারাপ বলেনা। দিব্বি আবার বিয়ে করতে পারে, তার সামাজিক মর্যাদা এতটুকু কমেনা। পুরুষরা অন্যায় করলেও তাদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ হয়না। অভিযোগ করলেও তাদের শাস্তি হয়না। টাকার জোরে ছাড়া পেয়ে যায়। এই কারণগুলো নারীকে মানসিকভাবে ছোট ও দূর্বল ভাবতে শেখায়। সুষ্ঠু রাজনৈতিক, সামাজিক পরিবেশ ও সত্যিকারের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারা এসব অপরাধের ব্যাপক বিস্তৃতির মূল কারণ। এগুলো প্রতিষ্ঠা করবে কে?
যেকোন অপরাধের প্রতিবাদ ও প্রতিকার হওয়া জরুরি কেন? কোন ছোট বা বড় যেকোন অপরাধ সংঘটিত হবার পর বেশীরভাগ ক্ষেত্রে আমরা বিষয়টি দ্রুত ও সহজ উপায়ে নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করি। সামাজিকভাবে হেয় হবার সম্ভাবনা থাকলে আমরা অপরাধটি গোপন করার চেষ্টা করি। কখনও কখনও আর্থিক সঙ্গতি না থাকা, পুলিশের হয়রানির ভয়, বিচারিক দীর্ঘসূত্রিতা, অপরাধী শক্তিশালী হলে তার নির্যাতনের ভয়, প্রিয়জনদের সমর্থন না পাওয়া,…. ইত্যাদি কারণে আমরা অপরাধের প্রতিবাদ বা প্রতিকার করিনা, করতে পারিনা। এতে অপরাধী যেমন প্রশ্রয় পেয়ে আরো অপরাধ করে, তেমনি নির্যাতিত ব্যাক্তি ন্যায় বিচার না পেয়ে বার বার নির্যাতিত হয়।
 
তাই আসুন জানি, মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কোন অপরাধের প্রতিবাদ ও প্রতিকার হওয়া কেন জরুরি।
 
* অন্যায়ের প্রতিকার না পেলে মানুষের মনে যে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ক্ষতের সৃষ্টি হয়, তা সারাজীবন তাকে কষ্ট দেয় যার যণ্ত্রণা শুধু সেইই জানে।
 
* অন্যায়ের প্রতিকার না পেলে বা প্রতিবাদ করতে না পারলে তা মানুষের মনের উপরে চাপ ফেলে, মানুষ নিজেকে অসহায়, নিগৃহীত ও অপমানিত বোধ করে, ঐ কষ্টকর বা অসম্মানজনক অবস্থার কথা ভুলতে পারেনা। ফলে স্বাভাবিক ও আনন্দময় জীবন ব্যাহত হয়।
 
* ভিকটিম নিকটজনদেরকে তার প্রতি হওয়া অন্যায়ের প্রতিকার করতে না পারার অপরাধে কখনো ক্ষমা করতে পারেনা। কোনদিন শ্রদ্ধা করবেনা, অক্ষম, অপদার্থ ভাববে।
 
* আক্রান্ত ব্যক্তির মানসিক শক্তি, ক্ষমতা বা সৃজনশীলতা, কাজ করার স্পৃহা, জীবনে কিছু করার বা হওয়ার স্বপ্ন, স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার আনন্দ.. এগুলো চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়। কেউ কেউ অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করে। কেউ না মরে বেঁচে থাকে।
 
* অপরাধীকে বুক উঁচিয়ে নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াতে দেখে ভিকটিমের কষ্ট আরো বাড়ে।
 
* অপরাধী শাস্তি পায়না বলে আরো অপরাধ করার স্পর্ধা ও সুযোগ পেয়ে যায় এবং বীরদর্পে অপরাধ করে। ফলে অন্য মানুষের মনেও ভয় সৃষ্টি হয়। ফলে তারাও অপরাধের প্রতিবাদ করেনা। এভাবে অপরাধীদের মনোবল বাড়ে, শাস্তির ভয় কমে যায়, আইনকে তোয়াক্কা করেনা।
 
* শাস্তি না পাওয়া অপরাধীদের দেখে অন্যরাও অপরাধ করতে উৎসাহিত বোধ করে। আরো মানুষ অপরাধ করে।
 
* ভিকটিম ন্যায়বিচার না পাওয়ার কারণে আত্মগ্লানিতে ভোগে, নিজেকেই অসহায় ও অপরাধী ভাবে, আত্মহত্যা করে, কাউকে বিশ্বাস করতে পারেনা, মানুষের প্রতি, আইনের প্রতি আস্থা হারায়, অনেকে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়।
 
* ভিকটিমের মনের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী কষ্ট, ভয়, লজ্জা, আতংক, ঘৃণা,… ইত্যাদি সৃষ্টি হয় যা তাকে প্রতিনিয়ত মানসিক যণ্ত্রণা দেয় যা থেকে বের হবার কোন উপায় সে খুঁজে পায়না।
 
* মানুষ স্বভাবগতভাবে ন্যায়পরায়ণ। তাই তার প্রতি ঘটে যাওয়া অপরাধ দগদগে ঘায়ের মত চিরস্থায়ীভাবে থেকে যায় যা কোনদিনও শুকায় না, ভিকটিম কখনোই তা ভুলতে পারে না, মেনে নিতে পারে না। অবচেতন মনেও প্রতিনিয়ত এই কষ্টের অভিজ্ঞতা অবদমিত অবস্থায় থেকে মনের উপর চাপ প্রয়োগ করে।
 
* অপরাধী শাস্তি পেলে ভিকটিম সান্তনা পায়, কষ্ট চলে যায়, নতুন করে বাঁচার উদ্যম সৃষ্টি হয়, মানুষকে বিশ্বাস করতে পারে, মানসিক ভারসাম্য ফিরে আসে। যেকোন মানুষের ন্যায়বিচার পাবার অধিকার তার বৈধ ও ন্যায়সঙ্গত অধিকার। তাই আমাদের উচিত, সাহস করে প্রতিকূলতা আছে জেনেও ছোট বা বড় যেকোন অপরাধের প্রতিবাদ ও প্রতিকার করা। কেননা ছোট ছোট অপরাধ মেনে নিতে নিতেই একসময় বড় অপরাধ সংঘটিত হয়। তাই আসুন, অন্তত প্রতিবাদ করি।

লেখাটি ৪,০৩০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.