“তৃতীয় পক্ষ, প্লিজ একটু ভাবুন”

0
দিনা ফেরদৌস:
যখন কোন স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে সেপারেশন চলে, তখন বুঝতে হবে তাদের সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। জোর করে সংসার টিকিয়ে রাখা আর ডিভোর্সের প্রস্তুতির মাঝামাঝি সম্পর্ক হচ্ছে সেপারেশনে যাওয়া। যেকোনো স্বামী-স্ত্রীর জন্যে এটি একটি কঠিন মুহূর্ত।
আর যদি তাদের সন্তান থেকে থাকে, তবে এই সিদ্ধান্তটি আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তখন এটা শুধু মা-বাবার সেপারেশনই হয় না, সন্তানের সাথে তার মা অথবা বাবার সেপারেশনও বটে। আর সেই সন্তান যদি অবুঝ হয়, তবে তার মনে এর বিশাল একটি প্রভাব পড়বেই। বুঝদার বাচ্চা সব দেখেশুনে  নিজেকে এক সময় যেকোনো ভাবে বুঝিয়ে ফেলবেই।
বেশিরভাগ নারীই এই বিষয়টি নিয়ে ভাবেন বলেই সহজে ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না, অনেক বাজে পরিস্থিতিতেও। ফলে কেউ কেউ ডিভোর্সের সিদ্ধান্তের পূর্বে কিছুকাল নিজেরা আলাদা থাকার চেষ্টা করেন। এর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির অবসান হলে আবার সংসার শুরু করেন। আর তা না হলে ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নেন। অনেকে ডিভোর্সের পরেও আবার একসাথে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। মিয়া-বিবি রাজি হলে কাজির’তো বেশি কিছু করার নেই। 
আলাদা পার্সোনালিটির দু’জন মানুষের মধ্যে মতপার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক। ঝগড়া-ঝাঁটি প্রায় সব সংসারেই হয়। তবে তার মাত্রার উপর নির্ভর করছে সম্পর্ক কোন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছাবে। বুদ্ধিমানেরা নিজেদের জন্য সময় নেন। নিজেদের আলাদা রেখে বোঝার চেষ্টা করেন এবং অপরজনকেও তার অবস্থান বুঝতে সহায়তা করেন। এতে করে একজনের প্রতি আরেক জনের টান বা ভালবাসা অনুভবের একটা সুযোগ হয়। ঠিক সেই সময়েই ঘটে অনাকাংখিত ঘটনা। টানাপোড়েন সম্পর্কের মধ্যে থাকে এক ধরনের রাগ, তিক্ততা, ঘৃণা, একে অপরের দোষ খুঁজে বের করার প্রবণতা। দু’ পক্ষই মানসিকভাবে দুর্বল থাকেন। আশে-পাশে থাকা কাছের লোকজনের প্রশ্রয় চান, সহায়তা কামনা করেন। ফলে কাছের লোকজনের সাথে ব্যক্তি জীবনের কথাবার্তা, দোষ-ত্রুটি বলে নিজেকে হালকা করার চেষ্টা করেন।
আর অনাকাংখিত ঘটনার শুরু ওখান থেকেই। যিনি দুঃখ শুনলেন, তিনি এক মুখের কথা শুনেই আবেগে আপ্লুত হয়ে, ঢোল পিটাতে শুরু করলেন, অপর জনের দোষ-ত্রুটি সবাইকে। এক মুখ থেকে দশ মুখ জানাজানি হলো। যিনি দুর্বল মুহূর্তে কথাগুলো শেয়ার করেছিলেন কাছের মানুষটির কাছে, তিনি হয়তো বিষয়গুলো এক সময় আর ভাবতে চাইছেন না। কিন্তু দেখা গেল আশেপাশের অনেকে বিষয়টি জানাজানির ফলে, তাকে প্রশ্ন করে, এক বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিচ্ছেন যখন তখন।
এইসব পরিস্থিতির ফলে দেখা যায় আলাদা থাকা সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠছে। বিশেষ করে মুসলিম বিয়ে ধর্মীয় কোন আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং বিবাহ সম্পর্কে আবদ্ধ হতে যাওয়া দু’জন নর-নারীর চুক্তি। কিন্তু আমাদের সমাজের বেশিরভাগ মানুষের কথা শুনলে মনে হয়, এটা কোন সামাজিক বা পারিবারিক চুক্তি, বিয়েই যেন একটা বড় ধর্ম। বিয়ে করলে সারা জীবন এখানেই আটকা পরে থাকতে হবে, তা না হলে পরিবার বা সমাজের দারুণ ক্ষতি হয়ে যাবে। একটি সংসার ভাঙ্গলে সেই সংসারের স্বামী-স্ত্রীর যে ক্ষতি হয়, বিশেষ করে তাদের কোন সন্তান থাকলে সেই সন্তানের যে ক্ষতি হয়, এর একশ ভাগের এক ভাগও সমাজ- সংসারের আর কারও হয় না। ভুক্তভোগীরাই তা ভালো জানেন। 
এখানে পরিবার বা সমাজের লোকজনের যদি কিছু করার থাকে, তাহলে তা হচ্ছে; নিরপেক্ষভাবে দু’জনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তাদের মুল সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধান বের করা। হয় আবার মিলিয়ে দেয়া, নয় ডিভোর্স নিতে সহায়তা করা। কারো মধ্যে অন্যায় কিছু দেখলে, তার সমাধান করে দেয়া , নয় আইনের আশ্রয় নেয়া। কিন্তু দেখা যায় একদল কিছুই না করে বিষয়টি চারপাশে ছড়িয়ে দিয়ে, উল্টা-পাল্টা মন্তব্য আমদানিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন।
সেপারেশন ফলে যেখানে নিজেরা নিজেদের ভুলের অবসান করতে পারতো সহজে, সেখানে তৃতীয় পক্ষের এই বারাবারির ফলে,জোড়া লাগতে যাওয়া সম্পর্কতেও সামাজিক প্রেস্টিজ এসে যুক্ত হওয়ায়, সম্পর্কটি উল্টো  ভাঙ্গনের দিকেই আগায়। যা তৃতীয় পক্ষরা করেন নিজেদের খেয়াল খুশিতেই, সেই আসল দুই ব্যাক্তির কথা মাথায় না রেখেই। কঠিন সময়ে যাদের কাছে মানুষ প্রশ্রয় চায়, তাদের নিরপেক্ষ বন্ধু ভেবেই যায়। আর কিছু মানুষ সেই সময়ের সুযোগ নেন অতি উৎসাহে। অথচ স্বামী বা স্ত্রী কেউই এই ব্যাক্তির শত্রু না। শুধু কুটনামি করার জন্যই এইসব করা। আর সুযোগ ব্যবহার করে মজা পান আরেক শ্রেণির লোক।
কিছুদিন হলো ভেঙ্গে যাওয়া কিছু সংসার জোড়া লাগার খবর জেনে ভালোই লাগল। আর বার বার মনে পড়লো সেই তৃতীয় পক্ষদের কথা। একটু সুযোগ পেয়ে যারা বিষিয়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন একজনের প্রতি আরেকজনের মন। চারপাশে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তাদের আলাদা হওয়ার কাহিনী। 
তাই তৃতীয় পক্ষদের বলবো, কিছু করতে না পারলে চুপ থাকুন প্লিজ। ওই দুর্বল মুহূর্তে মানুষটিকে আর খুঁচিয়েন না। সংসারটা আপনারও না, আমারও না, এই সমাজ বা দু’পক্ষের কারও পরিবারেরও না। সংসারটা শুধুই স্বামী-স্ত্রী আর তাদের সন্তানের। দয়া করে অন্যের সংসারের সেপারেশন বা ডিভোর্স নিয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।
লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৯,৩৮০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.