একটি লেখা, অত:পর বিতর্ক এবং আমার মতামত

0

অনুপম সৈকত শান্ত:

উইমেন চ্যাপ্টারে সুপ্রীতি ধরের সাম্প্রতিক আলোচিত- সমালোচিত লেখাটি পড়লাম। একইসাথে তীব্র সমালোচনার জবাবে তার পরবর্তী লেখাটিও পড়লাম। প্রথম লেখাটির আসল শিরোনাম ছিল: “গৃহকর্মিরা যখন গৃহকর্ত্রি হতে চায়”, সমালোচনার মুখে নতুন শিরোনাম: “গৃহকর্মি নির্যাতন: মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ”। দ্বিতীয় লেখাটির শিরোনাম: “গৃহকর্মি এবং সমালোচনার মুখে আমি”।

লেখা দুটো পড়ে এবং বাদ-প্রতিবাদের আরো কয়েকটি লেখা পড়ে মাথায় কিছু চিন্তা আসলো …

এক: প্রথম লেখাটির ব্যাপারে সাধারণভাবে অনেক বিষয়েই সমালোচনা উত্থাপন করা যায়, কিন্তু লেখাটি আমার কাছে বেশ কিছু কারণে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে এবং সৎ ও সাহসী একটি প্রচেষ্টার জন্যে লেখককে আমি সাধুবাদই দিতে চাই।

দুই: দ্বিতীয় লেখাটির ঘটনাগুলোর বিবরণ এবং এই সময়কালের অধিকাংশ লেখাগুলোর বিবরণ- আমার কাছে বিরক্তিকর, অসৎ কিংবা আত্মপ্রচারমূলক বলে মনে হয়েছে। এইসব লেখাগুলোর পরিমাণ এতো বেশি যে মনে হয় যে, আমাদের দেশে গৃহকর্মীদের প্রতি গৃহকর্তা/ গৃহকর্ত্রীদের দৃষ্টিভঙ্গি কতো উন্নত, কতো ভালো!

তিন: দ্বিতীয় লেখাটি এবং ফেসবুক বিপ্লবীদের এইসব আত্মপ্রচারমূলক লেখাগুলোর সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে- এইসব লেখাগুলোর কোনটিই সমস্যার গভীরে প্রবেশ করতে সক্ষম নয় এবং জং ধরা টিনের উপরে আলকাতরার প্রলেপের মতো করে বা টিউমারে মলম দেয়ার মতো সমাধান নির্দেশ করে। এই লেখাগুলো পড়লে মনে হবে- গৃহকর্মীদের আদর যত্ন করে রাখলেই, ভালো ব্যবহার করাই, উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিলেই, একই টেবিলে বসে খাওয়ালেই, শিশু গৃহকর্মিকে পড়াশুনার ব্যবস্থা নিলেই, দাবা খেললেই … ইত্যাদি (এরকম আর যত যত গল্প প্রকাশিত হয়েছে)- সমস্যার সমাধান! যেনবা, এইসব টুকরো টুকরো গল্পগুলোর সবকিছু সবার জন্যে প্রয়োগ করা খুবই সহজসাধ্য, যেনবা এমন মহানুভব আচরণ করা বা না করাটা ব্যক্তির ইচ্ছে- অনিচ্ছের উপর নির্ভর করে! বলাই বাহুল্য- এইসব আত্মপ্রচারমূলক গল্পগুলো সব টুকরো টুকরো … অর্থাৎ একজন যে শিশু গৃহকর্মীর সাথে দাবা খেলেছে- সে কিন্তু পড়ানোর কথা বলেনি, যে পড়ানোর কথা বলেছে- সে শিশুর খেলাধুলার প্রয়োজনের কথা বলেনি, যে এক টেবিলে খাবারের কথা বলেছে- যে নিজের বাচ্চার সাথে সাথে শিশু গৃহকর্মীকেও দুধ খাওয়ানোর কথা বলেছে- যে নিজের বাচ্চার মত করেই তাকে আদরযত্নে মানুষ করার কথা বলেছে … ইত্যাদি – সে বলেনি “শিশুকেই কাজের লোক হিসেবে নিয়োগ দেই নাই” … একই কথা অ-শিশু গৃহকর্মি দেখভালের গল্পগুলোর ক্ষেত্রেও সত্য। এসব গল্পে কেবল এতটুকুই প্রমাণ হয় যে- সম্প্রতি যে শিশু গৃহকর্মি নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে- সেগুলোর নির্যাতক থেকে এনারা সকলেই খুব উন্নত প্রজাতির গৃহকর্তা কিংবা গৃহকর্ত্রি।

চার: সেই জায়গা থেকেই সুপ্রীতি ধরের প্রথম লেখাটির মত সৎ এবং ডিরেক্ট একটি লেখার খুব প্রয়োজন ছিল বলে মনে হয়। সুপ্রীতি ধরের লেখাটির সূত্রে অনেকের অভিজ্ঞতারও সৎ এবং সোজাসাপ্টা বিবরণ চোখে এসেছে। আমার দৃষ্টিতে এখন পর্যন্ত এসমস্ত লেখার অধিকাংশ লেখকই নারী, সম্ভবত প্রায় সবাই কর্মজীবী নারী। এবং মজার বিষয় হচ্ছে- এই সমস্ত “মিন”, “ছোটলোকি”, “নোংরা মানসিকতার” লেখাগুলোর তীব্র প্রতিবাদকারী লেখককূল অধিকাংশই হচ্ছে- পুরুষ! ধারণা করি- এনাদের অনেকেই সম্ভবত ঘরের কাজ- রান্নাবান্না, কাপড় চোপড় পরিস্কার করা, ঘরদোর পরিস্কার করা, সন্তান দেখভাল করা- ইত্যকার কাজগুলোর দায়িত্ব দাসী-কাম-বউ (অবৈতনিক) এর ঘাড়ে দিয়ে পায়ের উপর পা তুলে দিয়ে দাসী-কাম-বউকে এবং ফেসবুকের নারী সকলকে গৃহকর্মীর প্রতি মহৎপ্রাণ হওয়ার পরামর্শ – উপদেশ দিয়ে থাকেন।

পাঁচ: অন্যদের মতো আমার অভিজ্ঞতাও একটু করে বলে রাখি। আমার মা একজন ব্যাংকার ছিলেন, কম্পিউটার পূর্ব যুগের সরকারি ব্যাংকের ব্যাংকার। মানে প্রতিদিনকার হিসাব- হাতে হাতে গুনে- বড়জোর ক্যালকুলেটরে বিশাল বিশাল যোগ – গুন করে করে মিলাতে হতো, না মিললে- সেগুলো আবার হিসাব করে ভুল বের করতে হতো- সেই যুগের ব্যাংকার, মাঝেমধ্যে সন্ধে পার করে রাত হয়ে যেত ফিরতে। ফলে- ঘরের কাজ, আমাদের দুই ভাইয়ের দেখভাল- এসব কিছুর জন্যে ‘কাজের মেয়ের’ উপর নির্ভরশীল হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। যে এলাকায় থাকতাম- তখনও সেখানে ঠিকা বুয়ার প্রচলন হয়নি, বা হলেও তেমন এভেইলেবল ছিল না; ফলে নানা বাড়ী/ দাদাবাড়ি থেকে নিয়ে আসা শিশু গৃহকর্মি ছাড়া কোন উপায়ও ছিল না। সকালবেলায় আমাদের দুই ভাইয়ের স্কুল, বাবামায়ের অফিস- সবকিছুর যোগাড়যন্ত্র করা- এমনকি দুপুরের খাবারটাও রেডি করা- এসব কিছু ঠিকঠাক করার দায়িত্ব মূলত মায়ের। কাকডাকা ভোরে উঠে হেল্পিং হ্যাণ্ডের উপর নির্ভর করেই সব সামলাতে হতো- ফলে শিশু গৃহকর্মীটির খুব ভোরে না উঠে উপায় ছিল না, তাকে সকাল সকাল স্কুলে পাঠানোর মত বিলাসিতারও কোন উপায় ছিল না।

গৃহকর্মিদের কাজে ফাঁকি দেয়া, জিনিসপত্র নষ্ট করা, কথা না শোনা, এমনকি টুকটাক চুরি করা- মিথ্যা বলার মত অপরাধের কারণে শাসন না করলে যেহেতু তাদের সামলানো অনেক কঠিন হবে- শাসনও চলতো, টুকটাক মারপিটও চলতো, বাপ-মা- শিক্ষক সবার মার নিয়মিত আমরা দুইভাই হজম করেছি, ফলে- শিশু গৃহকর্মিও তো করবেই!

মায়ের সংসারের বাইরে নিজের সংসারের অভিজ্ঞতাও যদি বলি- আমাদের দুজনের কাজের ধরণে কিছুটা ফ্লেক্সিবিলিটি থাকার কারণে এবং রেফ্রিজারেটর- গ্যাসের চুলাসহ আরো কিছু সুযোগ সুবিধা থাকায়- শিশু গৃহকর্মির সাথে কিছুটা ভালো ব্যবহার করার চেষ্টা করা আর স্কুলে পাঠিয়ে মিথ্যে মানসিক তৃপ্তি পাওয়া ছাড়া আর কিছু সম্ভব ছিল না। দুই বাচ্চাকে বাসায় রেখে- দুইজনই বাইরে যাবো কোথায়? কিভাবে? ফলে বাম রাজনীতি করেও বাসায় শিশু গৃহকর্মি রাখার মতো মোরাল ক্রাইসিস নিয়েই বাস করতে হয়েছিলো- দেশত্যাগের আগ পর্যন্ত। নেদারল্যান্ডে এসেই এ থেকে মুক্তি পেয়েছি। জানি, দেশে ফিরলে আবার এই মোরাল ক্রাইসিসের মধ্যেই বাস করতে হবে। আমার বাবা-মা দেশে একেবারেই একা একা থাকে। তাদের দেখভালের জন্যে ‘খুব ভালো একজন গৃহকর্মি’র খোঁজ করি … বৃদ্ধ বয়সে একজন সার্বক্ষণিক কাউকে না পাওয়া গেলে- কে দেখবে, কিভাবে কি হবে- সেই চিন্তায় অস্থির থাকি।

ছয়: এবারে সুপ্রীতি ধরের প্রথম লেখাটি কেন খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে- সে ব্যাপারে বলি। সেই লেখাটির এবং সে লেখার সূত্র ধরে আরো অনেক কর্মজীবী নারীর টুকরো টুকরো অভিজ্ঞতা, গৃহকর্মিদের নিয়ে অভাব অভিযোগ, রাগ ক্ষোভ- কষ্ট ইত্যাদি দেখে- আমি আমাদের দেশের একটা বাস্তবচিত্র দেখতে পাই। আমার ধারণা- এনারা কেউ ভয়ংকর নির্দয় টাইপের কোন মানুষ নন যে- আয়শা লতিফের কাজটিকে সমর্থন করছেন বা সাবিনা সহ অন্যসব ভয়াবহ নির্যাতনের খবরে খুব আনন্দিত হয়েছেন!

তাদের লেখাগুলো পড়ে আমার একবারো মনে হয়নি যে, তারা এমন নির্যাতনকে সমর্থন করতে গিয়ে মুদ্রার অপরপিঠ দেখাচ্ছেন! যে নারী তার নিজের বাচ্চার কানে রক্ত দেখে, গৃহকর্মির প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, যে নারী তার শৈশবে গৃহকর্মির খুব অস্বাভাবিক আচরণের কথা এখনো ভুলতে পারছেন না, কিংবা যে নারী তার পতিদেবতাকে রাতের অন্ধকারে গৃহকর্মির সাথে আবিস্কার করেছেন- তাদের রাগক্ষোভের বাস্তবতা ও তীব্রতাকে অস্বীকারও করতে পারছি না! বাইরে থেকে খুব সহজে বলে দেয়া যায়- ১০ হাজার টাকা বেতন দাও, পতিদেবতার সাথে শুইলে পতিদেবতার প্রতি রাগ-ক্ষোভ ঝাড়ো, তোমার বাচ্চার যেমন দেখভালের দরকার আছে- ঐ বাচ্চারো তো আদর-যত্নের দরকার আছে … ইত্যাদি ইত্যাদি; কিন্তু বাস্তবতায় কতখানি সম্ভব? অনেক সময় আর সব ক্ষেত্রে অপমানিত-অবহেলিত-নিগৃহীত হয়ে একজন নারী তার জগৎ সংসারে একমাত্র অধস্তন জন- সেই গৃহকর্মির উপরেও রাগ-ক্ষোভ ঝাড়তে বাধ্য হয়!

সাত: অবশ্যই সুপ্রীতি ধরের প্রথম লেখাটির আগের ও বর্তমান শিরোনাম সমর্থন করি না! গৃহকর্মিদের পক্ষে গৃহকর্ত্রি হওয়া সম্ভব না, কল্পনাও করাও সম্ভব নয়; কিংবা গৃহকর্মিদের উপরে যে আচরণ- নির্যাতন চলে আর সেটার বিপরীতে গৃহকর্মিদের কেন্দ্র করে যে সমস্যাগুলোতে গৃহকর্ত্রিরা ভুগেন- সেগুলো মোটেও মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ নয়! শ্রেণিগত অবস্থান থেকে দেখলেই বুঝা যাবে, সুপ্রীতি ধরের লেখাটিতে গৃহকর্মিদের নানা অপরাধের বিবরণের মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠা মনোভাব খুবই অসঙ্গত।

একই সাথে এই বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছেঃ গৃহকর্ত্রিদের লেখায় যখন এমন আশংকা চলে আসে যে- গৃহকর্মিরা গৃহকর্ত্রি হতে চায়, কিংবা গৃহকর্মিদের সাথে গৃহকর্ত্রিদের আচরণের উল্টো পিঠে আছে গৃহকর্ত্রিদের সাথে গৃহকর্মিদের আচরণ- তখন এটাও বুঝতে হবে- গৃহকর্ত্রিরা শ্রেণি অবস্থানে যেখানেই অবস্থান করুক না কেন- মানসিকভাবে তারা নিজেদের গৃহকর্মিদের থেকে খুব উচ্চ শ্রেণিতে ভাবতে পারেন না বলেই গৃহকর্মিদেরও প্রতিদ্বন্দ্বি ভাবেন! এর কি বাস্তব ভিত্তি আমাদের সমাজে নেই?

আট: আমি মনে করি না যে- সুপ্রীতি ধর এই লেখায় দাবি করেছেন গৃহকর্মিদের নির্যাতন করা একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক কর্ম ও এটি চলমান থাকা দরকার; এবং যারা এমন চরম নির্যাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়- তাদের প্রতি সহমর্মিতা সমর্থন জ্ঞাপন করতে হবে। বরং, তার উপসংহারে বলা কথার জন্যেই এই রকম গল্পগুলোর দরকার ছিল। আমি সম্পূর্ণভাবে একমত যে, সিস্টেমকে ভেঙ্গে গড়তে হবে। ঘরের সমস্ত কাজের ভার নারীর উপরে- এমন দৃষ্টিভঙ্গি বিদায় করা, সন্তান দেখভালের জন্যে পর্যাপ্ত ডে-কেয়ার সেন্টার, বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের দেখভালের জন্যে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত নার্সিং এর ব্যবস্থা- ওল্ড হোমের ব্যবস্থা, ঘর-গৃহস্থালির কাজের জন্যে আধুনিক যন্ত্রপাতির সহজলভ্যতা, রেডিমেড খাবার দাবারের পর্যাপ্ত আয়োজন, বাচ্চাকাল থেকেই নিজের কাজ নিজে করার মত অভ্যস্থতা গড়ে তোলা থেকে শুরু করে সমস্ত আয়োজন দরকার!

নয়: নেদারল্যান্ডে গৃহকর্মি ছাড়াই চলছি। কীভাবে পারছি? 

* বাচ্চারা নিজেরাই স্কুলে যাতায়াত করে সাইকেলে। নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত থাকতে হয় না।
* স্পোর্টস সেন্টার, সুইমিং পুল- দুটাই কাছেপিঠে- সাইকেলে করে যাওয়া আসা করতে পারে। কেবল, মিউজিক সেন্ট্রাম কিছুটা দূরে- সাইকেলে একা পাঠাই না- সাথে করে যেতে হয়। প্রতি বিকেলে খেলাধুলা বা মিউজিক বা সুইমিং- নিয়ে ব্যস্ত থাকে।
* রেফ্রিজারেটর- ওভেন- কুকিং সিস্টেম, ক্লিনার- ওয়াশিং মেশিন সবকিছু মিলে ঘরের কাজটা সহজসাধ্য। তার উপরে- এখানকার খাবারে অভ্যেসটাও রান্নার ঝামেলা এক তৃতীয়াংশ কমিয়ে দেয়। এরা কেবল ডিনারের সময় গরম খাবার খায়, ব্রেকফাস্ট আর লাঞ্চে – ঠান্ডা খায়। কেনা ব্রেড- বাটার- চিকেন স্লাইস- চকলেট রেফ্রিজারেটর থেকে বের করে খেয়ে নিলেই হলো। বাংলাদেশে তো মাঝেমধ্যে তিনবেলা ভাত খেতাম- এখানে অভ্যাস পাল্টিয়ে একবেলা ভাত খাওয়ার চেষ্টা করছি – তরকারিও অনেক সময়ে রান্না করে- দুই/তিনদিন ধরে খাওয়া হয়! মাঝেমধ্যে রান্নাবান্না করতে ভালো না লাগলে- রেফ্রিজারেটরে থাকা পিজা কিংবা অন্যান্য রেডিমেড খাবার কেবল ওভেনে ঢুকিয়ে গরম করে নিলেই হয়। 

* মাঝে মধ্যে আমাদের দুজনেরই বাইরে থাকতে হলে- স্কুল টাইমের বাইরের সময়টুকু স্কুলের পাশের ডে কেয়ার সেন্টারে বাচ্চারা থাকে। এবং মজার বিষয় হচ্ছে- বাচ্চারা স্কুল যেমন পছন্দ করে, ডে কেয়ার সেন্টারও পছন্দ করে।
* বাচ্চাদের নিজেদের কাজ নিজেরা করার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করা হয়।

দশ/ আমি ঘরের কাজে টুকটাক হেল্প করার চেষ্টা করি (নৈতিকভাবে মনে করি- হেল্পার হিসেবে আমার অবস্থান হওয়া উচিৎ না- কাজগুলো একদম সমান দুজনের, কিন্তু যেকারণেই হোক পারিনা। এসব নিয়েও মোরাল ক্রাইসিসটা নেদারল্যান্ডে এসে কিছুটা কমেছে বৈকি)- সেই অভিজ্ঞতা থেকেই জানি- ঘর-গৃহস্থালির কাজগুলো খুবই মনোটোনাস, বিরক্তিকর, একজনের পক্ষে দিনের পর দিন এসব করা প্রচণ্ড অমানবিক। গৃহকর্মি বলেন আর গৃহকর্ত্রি বলেন- উভয়ের জন্যেই অমানবিক।

ফলে, এর জন্যে সবচেয়ে বড় সমাধান বলে আমি মনে করি- এইসব কাজের পেছনে ব্যয়কৃত সময় একেবারেই কমিয়ে আনা। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে হোক- কেনা খাবার/ রেডিমেড খাবার (সেটার জন্যে অবশ্য স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থা করা অনেক কঠিন) এর আয়োজন বাড়িয়ে হোক, ঘরে ঘরে ওয়াশিং মেশিন, ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, রেফ্রিজারেটর, ওভেন- এসবকে সহজলভ্য করার আয়োজন করে হোক- শ্রমঘন্টা কমাতে হবে। এবং এই শ্রমঘন্টা পরিবারের প্রতিটা সদস্যকে শেয়ার করাতে হবে। বাচ্চাকাল থেকেই শিশুদের (আমাদের দেশে ছেলে শিশুদের বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে) ঘরের কাজ- নিজের কাজ- এসবে প্রশিক্ষিত করা ছাড়া আসলে উপায় নেই …।

এগারো/ নেদারল্যান্ডের স্কুলগুলোতে দপ্তরী, দারোয়ান, আয়া, ঝাড়ুদার, মালি- এসব বলে কিছু নেই। আছে কেবল শিক্ষক আর ছাত্র। আর আছে ডিরেক্টর (প্রধান শিক্ষক)। ক্লাস রুম পালাক্রমে বাচ্চারা পরিস্কার করে- শিক্ষকরাও তাতে হাত লাগান। কিছুদিন পর পর অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে মেইল পাই- ভলান্টিয়ার হিসেবে বাচ্চাদের নিয়ে গার্ডেনিং করা থেকে শুরু করে- স্কুলের নানা কাজে অভিভাবকদের হেল্প চাওয়া হয়- এবং ফ্রি থাকা অভিভাবকেরা খুশি মনে কাজ করে দেয় … আর বাসাবাড়িতে তো গৃহকর্মীও নাই … এর মধ্য দিয়ে শিশুরা স্বাবলম্বী হওয়ার যেমন সুযোগ পায়- তার চাইতেও অনেক গুরত্বপূর্ণ একটা লাভ তাদের হয়।

তাদের মনোজগতে “কাজের লোক”, “গৃহকর্মী”, “ছোট/ বাজে কাজের মানুষ”- এসব কোন কিছুর অস্তিত্বই থাকে না বলে- দুনিয়ার কোন কাজকেই তারা অমর্যাদাকর, নিম্নশ্রেণির মনে করে না! এখানে এমন পরিবারও আছে- যেখানে একভাই উচ্চশিক্ষিত হয়ে- পিএইচডি করে- প্রফেসর হয়েছেন, আরেকভাই মাধ্যমিক স্কুল শেষ করে (মিডলবারে স্কুল) শেষ করে- কর্মজীবী শিক্ষা (ট্রেনিং) নিয়ে গরুর ফার্মে কাজ নিয়েছে … কিন্তু কেউ কারো কাজকে ছোটো মনে করছে না …।

লেখাটি ৭৫৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.