গৃহকর্মি নির্যাতন ও আমাদের রাষ্ট্র-কাঠামো

0

অনুপম সেন:

কয়েকদিন ধরেই নিউজফিডে সাবিনা নামে এক গৃহকর্মিকে নির্যাতনের খবরটি নিয়ে নানা ধরনের লেখা সামনে আসছে। সবাই প্রতিবাদ করছে এই ঘটনার। প্রত্যেকেরই এই বিষয় নিয়ে ব্যক্তিগত আলাপ/ভাবনা আছে। এইসব আলাপের কিছু দিক আছে। সবাই ছোট বাচ্চাটির এহেন পরিণতিতে কষ্ট পাচ্ছেন। আমিও পাচ্ছি। তবে এই নিয়ে আমি কয়েকটা বিষয় আলাপ করতে চাই।

এই যে আমরা ঘরে “নিজেদের কাজ” অর্থের বিনিময়ে অন্যকে দিয়ে করিয়ে নেই এবং ঐ ব্যক্তির (অধিকাংশ ক্ষেত্রে মহিলা/বাচ্চা) শরীর ও মনোজগত অধিকার করে নিই/নিয়েছি বলে মনে করে থাকি, তার পরিপ্রেক্ষিতে একথা কি সত্য নয় যে, এই চর্চা ক্যাপিটালিস্ট সমাজ-ব্যবস্থায় প্রকারান্তরে দাস-প্রথারই অনুরূপ। অপরদিকে, কোন নিয়মতান্ত্রিক পুঁজিবাদী চাকরি-পদ্ধতির বাইরে এই নারীদের যখন কোন পরিবার/ঘর অধিকৃত করে নিচ্ছে, তখন আমরা কি এদের আর কোন বিশেষ শ্রেণি-ক্যাটাগরিতে ফেলতে পারি আর? কোনো একটি পরিবার/ঘর এখানে ঐ নারী গৃহকর্মির (পুরুষও হতে পারে ক্ষেত্রবিশেষে) কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছে, কোন রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে ঐ সংস্থান হচ্ছে না।

রাষ্ট্র/বিদ্যমান পুঁজিবাদী কাঠামোতে তাদের অন্তর্ভুক্তি একেবারেই নেই। রাষ্ট্রে তাদের ব্যক্তিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক অবস্থানের অনুপস্থিতি, এই গৃহকর্মি গোষ্ঠীর যে আপাত প্রান্তিকতা তাকেও অস্বীকার করে। এই মুছে যাওয়া/রাষ্ট্রের লিপিবদ্ধ চাকরি এবং পদবীর তালিকায় তাদের অনুপস্থিতি, এক প্রকার নীরব কনসেন্ট তো সেই সকল পরিবারকে দিচ্ছে যারা অহর্নিশ গৃহকর্মি নির্যাতনের মধ্য দিয়ে প্রভুসুলভ (রাষ্ট্রের কর্তৃত্বকে প্রতিস্থাপন করেই) কর্তৃত্ব উপস্থাপন করছে (হতে পারে আন/কনসাশলি)। সেই ক্ষেত্রে এই দায় কেবল এককভাবে ঐ পরিবার বা নির্যাতনকারী নিবে কেন? রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা কই যাবে?     

যেহেতু আমাদের মুখে স্বীকার করে নিতে/মেনে নিতে আপত্তি আছে/থাকতে পারে যে এই শ্রমদাতা ও গ্রহীতা অনেকটাই কিন্তু প্রভু/ভৃত্য অথবা অধিকারী/অধিকৃত সম্পর্ক তৈরি করছে/করে থাকে, তাই আমরা (বিশেষত মধ্যবিত্ত সমাজ) কি “গৃহকর্মি” নামকরণের ভেতর দিয়েই আড়াল করে ফেলতে চাইছি যে কী ধরনের অর্থনৈতিক এবং মন-দৈহিক শোষণের ঘেরাটোপে তাদের সামাজিক অবস্থান (?) নিশ্চিত হচ্ছে!

আয়েশা লতিফা যেহেতু সাবিনাকে মেরেছেন এভাবে, তার মানে আমাদের বুঝতে হবে, তিনি এই কাজ একদিন করছেন না/ করেননি। তিনি সবসময় করতেন/করছেন। বিষয়টা আমাদের গোচরে আসে যখন আমরা পত্র-পত্রিকায় এই নির্যাতনের ছবি দেখি।

এখন কথা হলো, এই অধিকার যে উনি পেয়ে বসেছেন, অর্থাৎ একজন গৃহকর্মিকে উনি শাস্তি দিতে পারেন (শারীরিকভাবে), সেটা শুধুমাত্র ঐ নির্যাতিত ব্যক্তির অর্থনৈতিক ভরন-পোষণের অধিকারী হিসেবেই উনি পাননি; বরং এই চর্চা উনি সমাজ থেকে গ্রহণ করেছেন অব/চেতনে।

ঐ যে দাস-প্রথার কথা বললাম, তারই কোনো সামাজিক আচরণ উনি এই বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থাতে রাষ্ট্র কাঠামোর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নিজের ঘরেই অনুশীলন করছেন। নির্ধারিত কাঠামোর বাইরে এই গৃহকর্মি-পেশাজীবী শ্রেণির অবস্থান বিধায়, তার ব্যক্তিক এবং শারীরিক অস্তিত্বের মালিকানা নিতে পারে/পারছে অন্য কোন ব্যক্তি/পরিবার। অপরাধ কে ঘটাচ্ছে তার চেয়েও হয়তো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হতে পারে অপরাধ কেন ঘটছে/কেন এই সম্ভাব্য অপরাধ ভবিষ্যতেও ঘটবে/ঘটতে পারে।

এই ঘটনাকে গৃহকর্মি-গৃহকর্ত্রীর সংঘাত হিসেবে দেখানোর একটা প্রয়াস হয়তো আছে। যেভাবে সংবাদ-মাধ্যমগুলো হয়তো দেখাচ্ছে। এভাবে দেখার মধ্যে একটা পুরুষতান্ত্রিক চোখও আছে। এই সংঘাতের একটা রাজনীতি আছে। আমরা যখন বুঝতে পারি কারো অবস্থান আপাত প্রান্তিকতা পেরিয়ে প্রান্তিকতর, তখন তাকে অধিকার করে নেওয়া সহজ হয়ে উঠে। তার উপরে আধিপত্য বিস্তার করার প্রয়াস থাকতেই পারে কেননা এটা তো খুব পরিষ্কার হয়েই যায় আমাদের কাছে যে ঐ অধিকৃত (পড়ুন নির্যাতিত) ব্যক্তির আওয়াজ কারোই কানে পৌঁছাবে না। সবখানেই তার অনুপস্থিতি নিশ্চিত করেছে রাষ্ট্র/সমাজ কাঠামো।                

তবে কোন/সব গৃহকর্মী যদি গৃহকর্ত্রী হয়ে উঠতে চায় এতে দোষের কিছু নেই। আমরাও তো পশ্চিমাদের মতো হতে চায়। সবাই তো তাই করি এই উত্তর-উপনৈবেশিক সমাজে। আধিপত্য/ক্ষমতা যে সম্পর্কে বিদ্যমান সেখানে আধিপত্যহীন চাইবেই ঐ আধিপত্য অর্জন করতে। আমরাওতো এখনও ঐ পশ্চিমাদের পোশাক/জ্ঞান/ভাষা অনুকরন করে যাচ্ছি। তাই এই গৃহকর্মির গৃহকর্ত্রী হতে চাওয়া একটা ভালো ব্যাপার, কেননা এই “হতে চাওয়াটাই” ঐ পরিবার/গৃহকর্ত্রীর কৃত্রিম ক্ষমতা এবং এটির প্রতীকী বহি:প্রকাশকেই (যেটা নির্যাতন করার ভেতর দিয়ে বেরিয়ে আসছে) ব্যঙ্গ করে।

লেখাটি ৭৬১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.