সমীহ, লিঙ্গ-রাজনীতি ও সাম্প্রতিক কুতর্ক

0

সুচিত্রা সরকার:

সুযোগ পেলেইমেন চ্যাপ্টারকে ধোয়া হবে পুরুষতন্ত্রেরসার্ফ এক্সেলে’, এটা আশংকা করেছিলাম গত ফেব্রুয়ারি মাসেই একটা ছোট্ট ঘটনায় একটু বলি!

চৌদ্দ বছর একটা সংগঠনে কাজ করেছি সেটা অতীত তবে মানুষগুলোর সঙ্গে চলতেফিরতে, হাটেবাজারে, শাহবাগের অন্দোলনেদেখা হয়েই যায়!

সেই সংগঠনের এক সহযোদ্ধার সঙ্গে বইমেলায় দেখা একথা সেকথার পর সহযোদ্ধা জানতে চাইলেন,ইমেন চ্যাপ্টারে লেখা পাঠানো যায় কীভাবে! তিনি একটা লেখা লিখবেন! বিষয়বস্তু– উইমেন চ্যাপ্টার শহরের মধ্যবিত্ত নারীদের নিয়ে প্রচুর লিখছে! কিন্তু প্রান্তিক বা গ্রামাঞ্চলের নারীদের নিয়ে উইমেন চ্যাপ্টারের কোনো মাথাব্যাথা নেই!

একটু অবাক হলাম ছেলেটা খুব কোনো আন্দোলন কখনো করেনি মধুর টেবিল, হল, ছবির হাট আর দু একটা মিছিল! সেই ছেলেটা উইমেন চ্যাপ্টার কী করলোনা করলোসেই নিয়ে ভাবতে বসেছে

বললাম, সে তুমি পাঠাতেই পারো! সম্পাদকের ই-মেইল এড্রেস আছে, পাঠিয়ে দিও সে বললো, ‘তুমি একটু বলে দিও

একটু বিরক্ত হলাম! বললাম, সে দেখা যাবে কিন্তু বলো তো, তোমরা সম্প্রতি প্রান্তিক নারীর জন্য কী করেছো! আর উইমেন চ্যাপ্টার কী করবে, কী করবে নাতার হিসেব কেন দেবে! এটা একটা লেখার জায়গা! স্রেফ একটা পোর্টাল!

এককালের সহযোদ্ধা চলে গেছে নিজের পথে! আমার মাথায় ঢুকিয়ে গেছে একটাই আশংকার কথা! উইমেন চ্যাপ্টার নিয়ে ওদেরঅলস মস্তিস্কআজকাল বড্ড ভাবছে!

সংকট তাহলে সামনেই?

আশংকা ফলে গেল আমার! তার মানে, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইকতজন উইমেন চ্যাপ্টার নিয়ে নিজেদের মধ্যে ছক কষেছেন? জানি না? তবে, অপেক্ষায় ছিলেন নিশ্চয়ই! বাগে পাওয়ার! পেয়ে গেলেন!

এইবার শীবের গীত ছেড়ে, ধান ভাঙায় মন দেয়া যাক!

সমস্যাটা আসলে কোথায়? আমার প্রায় সবগুলো লেখায় বারবার একটা কথাই বলেছিসমস্যা ওইতন্ত্রে তান্ত্রিক সাধুবাবার হাতে পুরুষতন্ত্রের পতাকা যার হাতে পতপত করে উড়ছে!

সমস্যা পুরুষের চিরায়ত মানসিকতায় সে রিক্সাওয়ালা হোক বা মধ্যবিত্ত সমাজের মিছিল করা তরুণ বা উচ্চবিত্ত শ্রেণির মোটা মাথার কোনো ভুঁইফোঁড়

মানসিকতা এই যে, নারীরা কম মেধাবী কমজোরি কুটিল দুর্বল! এদেরগোনা কি আছে! নারীরা অধস্তন! পুরুষ উপরের তলার মানুষ নারী পুরুষের যে শ্রেণি বিভাগ (পুরুষতন্ত্রের তৈরি), সেইখানে পুরুষ নারীকে রেখেছে নিচে!

তো, অধস্তন একজন নারী, তার বাড়াবাড়ি সমাজের কেউ খুব ভালো চোখে দেখে না তারপুরুষকে টপকে যাওয়াটা ওই পুরুষটার জন্য আশংকার!

তাই যখন উইমেন চ্যাপ্টার পুরষ্কার পায়, উইমেন চ্যাপ্টার দেশে প্রথম উইমেন মার্চ করে, অলটারনেটিভ ফোর্স হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়,উইমেন চ্যাপ্টারের একটা লেখায় ঘটনার মোড় অন্য দিকে ঘুরে যায়, অপরাধী ধরা পড়ে, আবার আন্দোলনের খাতিরে উইমেন চ্যাপ্টারকে গুনতেও হচ্ছেসেই সময়গুলোয় পুরুষতন্ত্রের ঈর্ষা হয়! শংকা হয়!

পুরুষতন্ত্রের মসনদটা ভেঙে পড়ার শংকা! অধস্তন নারীর, পুরুষকে টপকে উপড়ে উঠে যাওয়ার শঙ্কা! নারীদের হাজার বছরের অবিচারের ন্যায় ফিরে পাওয়ার শঙ্কা! সে শঙ্কার কোনো ভাগীদার নেই শুধু পুরুষতন্ত্রই এর একক দাবিদার!

একটা পক্ষ খুব খেপেছেন এখানে যে নারীরা লেখে, তারা এলিট শ্রেণির লেখক হয়ে আজ দুর্ভাগা মনে হচ্ছে নিজেকে! আমার একটা লেখাও তারা পড়ে দেখেনি এই তো সেদিন লিখলাম, জ্যাকুলিন যখন আত্মহত্যা করলো! লিখলাম, প্রান্তিক নারী যদি জ্যাকুলিন হতো, তার কথাও মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার পেত! পড়েনি সমালোচক গোষ্ঠী বা সিরিয়ালে প্রান্তিক নারীর কথা বা সাঁওতালদের মাথায় যখন ছাদ নেই, লিখেছিলাম, ‘রানীমা লাশের আবার ইজ্জত কী!’ পড়েনি ওরা!

বা অন্য কারোটাই হয়তো পড়েনি যেই লেখাগুলো প্রান্তিক নারীর সমস্যাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে কারণ ধরেই নিয়েছে, হাবেভাবে, দেখে তো মনে হচ্ছে, এরা এলিটগোত্রীও! এদের লেখা পড়ার কী আছে! ওসবজানা কথা’!

সব যুক্তির যেমন দুটো দিক থাকে, এটারও আছে ধরুন, ধরলাম, উইমেন চ্যাপ্টার এলিট নারীদের নিয়ে লেখে তাতে সমস্যাটা কী? বাংলাদেশের কোনো জরিপে কি এটা উঠে এসেছে যে, এলিট নারীরা নির্যাতিত নয়? তাদের সমস্যার কথা লেখা যাবে না? মধ্যবিত্ত নারীর সমস্যাটা, কোনো সমস্যাই নয়? শুধু এলিট বলে, শুধু মধ্যবিত্ত বলে, তার জীবনমান আমি মসৃণ করবো না? করার কথা লিখবো না? এইবার আমার এই যুক্তিটাই ঠ্যা ঠ্যা করে হাসছে! বোকার দল! শ্রেণিশত্রু আসলে কারা, আজ অবধি চিনতেই পারলো না!

এই সমালোচকরা একটু মাথামোটাই আছে কেন বলি! মনে, মননে, চিন্তায় এরা পুরদস্তুর এলিট! জুতা হাসপাপিশ বা এপেক্স! সিগারেট সবচে দামিটা শাড়ি তো দেখি অরণ্য থেকে কেনা (ওসব কেনার সাধ্য সবার হয় না) মিছিল শেষ করে দেখি, নিজের কেনা নতুন গাড়িতে চড়ার আমন্ত্রণও জানান! নামিদামি ব্রান্ডেরহার্ড ডিংক্সএর জন্য বারগুলোয় ভিড় বাড়াচ্ছেন কেন? সোহরাওয়ার্দীর হকাররাপঁচে যাওয়াতালের রস বিক্রি করছে অথবা বাংলা চলুক! হা হা হা!

আচ্ছা বলুন তো, আপনার কাছে, কে বেশি দাম পায়? সম্মান পায়? প্রায়োরিটি পায়! বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, উকিল, ডাক্তার ? নাকি গার্মেন্ট শ্রমিক? কাকে সমঝে চলেন? কে আপনার মিটিং এলে ধন্য হয়ে যান? বর্তে যান? আপনার সংগঠনে, বস্তিবাসী যেই মর্যাদা পায়, একই মর্যাদা মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তের জন্য বরাদ্দ তো?

উত্তর দিতে হবে না! ওটা আমি নিজে দেখে নিয়েছি চৌদ্দ বছর এটুকু দেখার জন্য বিস্তর সময়!

আর কী অদ্ভুত! নারীপুরুষ, সবাই মিলে কেমন করে হেফাজতের বিরুদ্ধে লড়াই করলাম অথচ উইমেন চ্যাপ্টার সম্পাদক প্রশ্নে বামপন্থী আর হেফাজত এক হয়ে গেল? একটাই তো এজেন্ডা সবার! নারীর ক্ষমতা নিপাত যাক! তাই তো?

আপনাদের সবার এজেন্ডা এক! লিঙ্গ রাজনীতি সে কথা স্বীকার করেছে, আপনাদের জন্মের বহু আগে

এবার আসুন নিম্নবিত্ত শ্রেণি প্রশ্নে! সেখানে অনেক সমস্যা! গৃহকর্তা উপরতলার, শ্রেণির নিয়মে সে কাজের লোকের ওপর চড়াও হয় যখনই সুযোগ পায়! এই আপনারা যেমন এখন, লিঙ্গশ্রেণির ওপরতলার মানুষরা পেয়ে গেলেন!

আর নিচেরতলার কাজের লোক কাজে অনিয়ম করে, পেশাদারিত্বের তোয়াক্কা করে না, মার খায়, অন্যায় সয়ে নেয়, আর রাগে ফুসতে থাকে! কখন সুযোগ আসবে কাজ ফাঁকি দেবার! কখন সুযোগ আসবে ওপরতলার বাবুদের অন্যায়কে রুখে দেবার!

শ্রেণিসংগ্রামের নিয়মে নারীরাও তাই ভাবে এমন, ছক কষে!

তাই পরামর্শ, কার বিরুদ্ধে লড়াই আপনার, ঠিকঠাক করে চিনে নিন! একটা নারীবাদী পোর্টালের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন, মানে আপনি প্রমাণ করে দিচ্ছেন আপনার লড়াইয়ের ক্ষমতাটা কত কম! যারা আসলে আপনার বিরুদ্ধ শক্তি নয়, তার বিরুদ্ধে কামান দাগাচ্ছেন! দুঃসময়ে, দেশের যেকোনো আন্দোলনে, এই পোর্টালটিকেই আপনি পাশে পেয়েছেন!

দেশের অনেক সংকট শ্রেণিসংগ্রামে সঙ্গে অন্য সংগ্রামগুলোও যুথবদ্ধ হয়েই লড়তে হবে হেফাজতের সঙ্গে, বিদেশি বেনিয়ার সঙ্গে, দেশের মীরজাফরদের সঙ্গে! এতো এতো যুদ্ধে, যদি নির্ধারণ করে নেন, এসব লড়াই আপনার একার, আপনি লিঙ্গ শ্রেণির রাজনীতিতে ওপরতলার বলে! তাহলে ভুল ভাবছেন!

দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে সরিয়ে রেখে আপনি ওসব আন্দোলন একা করতে পারবেন না আন্দোলনের গাড়িটা চলবেই না! থেমে যাবে!

তাই ভাবুন কী করবেন! উইমেন চ্যাপ্টার দেশের প্রেসার গ্রুপ হিসেবে নিজেকে একটা জায়গায় দাঁড় করাতে চেষ্টা করছে! ঈর্ষান্বিত হবেন? কখন কি ভুল করে অপেক্ষা করবেন? সকাল বিকাল নারীবাদের মুণ্ডু চটকাবেন? কুতর্ক করবেন, নাকি, একসঙ্গে লড়াইটা চালাবেন? নারীমুক্তির আন্দোলন কিন্তু মানবমুক্তির আন্দোলনের বাইরে কিছু নয়!

ভাবুন! আপনার মনের ভেতরে থাকাপ্রগতিটা আপনাকে ছেড়ে বেরিয়ে যাবার আগেই ভেবে ফেলুন নইলে পরে পস্তাবেন!

১৩.০৭.২০১৭

সকাল ১০.২০ মিনিট

দারুস সালাম, ঢাকা

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 312
  •  
  •  
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    316
    Shares

লেখাটি ১,২৯০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.