অনেক কিছুর পরিবর্তন প্রয়োজন  

0

রুনা নাছরীন:

কিছুদিন থেকে কিছু কিছু ঘটনায় মনটা ভীষণ বিষিয়ে আছে। সবকিছু সবসময় চাইলেও করা যায় না। পরিবেশ পরিস্থিতি বুঝে চলতে হয়। কারণ সবাইকে নিয়ে আমাদের বসবাসজীবনের প্রতিটি ক্ষণে ক্ষণে মানুষ নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়, কেউ হয়তো সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়, আবার কেউ তা  নিতে পারে না। আবার কেউ যা দরকার, তাই নেয়, বাকিটা উপেক্ষা করে। তবে ঘটনার প্রবাহে জীবন থেকে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় যে করতে পারে, সেই জীবনের সরল পথে হাঁটতে পারে এবং অতি সহজে জীবনের জটিলতা এড়িয়ে চলতে পারে

এখনকার ছেলেমেয়েরা বাহ্যিক সৌন্দর্যের জন্য যতোটা সময় দেয়, ততোটা মনের সৌন্দর্যের জন্য নয়। নিত্য নতুন ফ্যাশন ধারণের জন্য যতটা সময় ব্যয় করে, সেই তুলনায় মনের খোরাকের জন্য নয়।  ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের বাচ্চাদের মাঝে বাঙ্গালী সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চা নাই বললেই চলে। পশ্চিমা সংস্কৃতিতে বেশী আকৃষ্ট। কী পোষাকে, কী খাবারে, চাল চলনে, গান বাজনা বা সাহিত্য সবকিছুতেই পশ্চিমা সভ্যতার প্রভাব।  সুকুমার, বঙ্কিম, বিভূতি ভূষণ,  শরৎচন্দ্র এদের কাছে যেন ভিনগ্রহের মানুষ।  তাই এদের মানবিক মূল্যবোধও ভিন্ন।

পরিপূর্ণ মানুষ হতে হলে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি অন্য বইও পড়তে হয়আসলে আমরা  সন্তানদের পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের উপর বেশী জোর দেই, পড়িমরি ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হতেই হবে এবং এটাই যেন সমাজে প্রতিষ্ঠিত ও সম্মানিত বিবেচিত হবার একমাত্র মানদণ্ড। এ ধরনের মানসিক চাপে থাকতে থাকতে তাদের স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ হতে পারে না এবং ধীরে ধীরে সামাজিকতা ও মানবিকতা বোধহীন হয়ে পড়ে। এমনিতেই তারা প্রাকৃতিক পরিবেশ বিবর্জিত এপার্টমেন্ট সোসাইটিতে বড় হচ্ছে এবং তারপর নিজস্ব রুমকেন্দ্রিক জীবনধারায় স্বভাবতই তাদের মাঝে একগুঁয়েমি ও এককেন্দ্রিক মনোভাব তৈরি হচ্ছে। নিজস্ব সুযোগ সুবিধার বাইরে এরা কিছু চিন্তা করতে পারে না।

ভালো রেজাল্টের জন্য পরিবার, সমাজ, পরিবেশ ও প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শুধু স্কুল-বাসা-কোচিং এবং পাঠ্যবইয়ের মধ্যে এদের জীবনধারা সীমাবদ্ধ থাকছে এবং এতে কিছু অভিভাবকেরও সম্মতি থাকছে। খেলাধুলা গান-বাজনা অন্য যেকোনো কিছুতে অংশগ্রহণকে সন্তানের পড়াশুনার ক্ষতি হিসেবে চিন্তা করেন তারা। এ ধারায় হয়তো ভালো রেজাল্ট, ভালো চাকরি এবং ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে কিন্তু কতটা মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ হয়, তাতে সংশয় থেকে যায়।

আমার কলিগের একমাত্র ছেলে, ছোটবেলা থেকেই সব পরীক্ষায় সর্বাধিক নম্বরপ্রাপ্ত প্রথমস্থান অধিকারী পিএইচডিধারী বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী। ব্যস্ততার কারণে নাকি মা-বাবার সাথে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন তার। বেশ ভালো। সন্তানের প্রতিষ্ঠার পিছনে যে বাবা-মা নিজেদের সমস্ত সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়েছিল, এখন সেই সন্তানের জন্য হাহাকার তাদের নিত্যসঙ্গী। স্বীকার করলেন তাদের বোকামির কথা।

শুধু পুঁথিগত শিক্ষাই মানুষকে মানবিক করে তোলে না, পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় শিক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পড়াশোনার পাশাপাশি তাদেরকে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহমর্মিতা, সহনশীলতা ও আত্মত্যাগের শিক্ষায় দীক্ষিত করা অতি জরুরি।

মফ:স্বলে আমরা পরিবারের পাশাপাশি পাড়ার গুরুজনদের এবং পাড়ার বড় ভাইবোনদের অলিখিত শাসন-অনুশাসনের মধ্যে থাকতাম। সবার সাথে সবার একটা আত্মিক যোগাযোগ ছিল। তাই ভুল পথে যাবার বা ভুল করার প্রবণতা কম থাকতো। যেকোনো উৎসব পার্বণে, বিয়ে-শাদীতে বা বিপদ-আপদে সবার সহযোগিতা ছিল, খোঁজ-খবর নেওয়া ছিল এবং ছিল সবার অংশগ্রহণ। ঈদ বা পূজায় সমবয়সী বন্ধুরা প্লান করে দলবেঁধে ঘুরতে বের হতাম। দাওয়াত দেওয়া বা নেওয়ার কোনো ব্যাপার ছিল না, ছিল না কোন ধর্মীয় বাধা-বিপত্তি, নির্মল আনন্দে আনন্দিত হওয়াটাই ছিল বড় কথা।

আমাদের বেশির ভাগ বন্ধুরা বিভিন্ন ধর্মের ছিল, এখনও আছে, সবার বাসায় সবার আসা যাওয়া, উঠা-বসা এবং খাওয়া-দাওয়া কিন্তু কখনো মনেই আসেনি, এতে ধর্মের অবমাননা করা হচ্ছে, বা আমার নিজস্ব ধর্ম বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বা যাবে। বাবা-মাকেও কখনো বাধা দিতে শুনিনি। পুজার সময় মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানো, রাত জেগে আরতি দেখা, মেলায় যাওয়া অলিখিত নিয়ম ছিল (এখনো যাই) তেমনি ঈদের সময়ও সবার অংশগ্রহণ ছিল সমান। হয়তো তখন মানুষের নিজস্ব ধর্মীয় আত্মবিশ্বাস প্রখর ছিল এবং বিশ্বাসটা ছিল মুক্ত ও উদার। তাই সব ধর্মীয় উৎসবে সবার আন্তরিকতা ছিল এবং ছিল সমান আনন্দের। কারণ যেকোনো ধর্মই একেশ্বরবাদের কথা বলে, শান্তির কথা বলে, সহমর্মিতার কথা বলে, জীবের প্রতি ভালোবাসা ও সেবার কথা বলে।

মনে হয় এখন মানুষের ধর্মবিশ্বাস সংকীর্ণ হয়ে গেছে, ধর্ম নিয়ে হানাহানি, রেষারেষি চারিদিকে, সংখ্যাগরিষ্ঠের দাপট এবং ধর্মকে এককেন্দ্রিকতা করার প্রবণতা। ধর্ম মানুষের একান্তই নিজস্ব বিষয় এবং চর্চিত হওয়া উচিৎ শান্তি ও প্রশান্তির জন্য। ধর্মবিশ্বাস মানুষকে নমনীয় ও সহনশীল করে এবং সঠিক ধর্মচর্চা মানুষকে নিয়মানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলিত হতে শেখায়।

এককেন্দ্রিক মানসিকতার জন্যই যতো হানাহানি ও যতো হিংসা বিদ্বেষের জন্ম। আমরা এতোটাই এককেন্দ্রিক হয়ে পড়েছি যে নিজস্ব সুখ শান্তি প্রতিষ্ঠা ও নিজস্ব জগত ছাড়া আর কিছু করতে নারাজ। সুস্থ স্বাভাবিক জেনারেশনের জন্য একে অপরের সাথে মেলামেশার সুস্থ পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন সংগঠনের সাথে বাচ্চাদের বেশি বেশি সম্পৃক্ত করতে হবে। পাশের ফ্লাটের এবং এপার্টমেন্ট সোসাইটির সবার সাথে আত্মিক যোগাযোগ বাড়াতে হবে।  

বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান হবে সবার কাছে সমান গ্রহণযোগ্য, সমান আনন্দের। অংশগ্রহণ সম্ভব না হলেও আত্মিক সমর্থন থাকবে। সবাই যেন যার যার ধর্ম সুষ্ঠুভাবে পালন করতে পারে এবং ছোটবেলা থেকেই সবার মাঝে একে অপরের ধর্মের প্রতি সহানুভূতি ও শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করতে হবে । শুধু পড়াশুনা না, মানবিক মূল্যবোধ জাগাতে হবে। ধর্মীয় বিদ্বেষ, ধর্মীয় কুসংস্কার থেকে বের করে আনতে হবে। আর তা সম্ভব পরিবার থেকেই।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৭৫৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.