আমার যন্ত্রণাময় জঞ্জাল ছুঁড়ে ফেলার ডাস্টবিনটাকে মুক্তি দিন

0

মলি জেনান:

সিস্টেমটাকে কেউ প্রশ্নবিদ্ধ করছে না, সিস্টেমটাকে আঘাত করছে না কেউ, যতোটা আঘাত করলে তা ভেঙ্গে পড়বে। যে প্রবল স্রোতে কুট তর্ক, ব্যক্তি সমালোচনা এবং ব্যাক্তিগত আক্রমণের বন্যা ভেসে যায়, ততোটা সদলবলে যদি প্রশ্ন করা যেতো, আঘাত করা যেতো সিস্টেমটাকে, তবে সমস্ত অন্যায় ভেঙ্গে পড়তো, নতজানু হতো মানুষের তরে।

আমরা ভয়াবহ আবেগপ্রবণ জাতি; অল্পতেই বন্ধু হয়ে যাই, আবার বন্ধুর সামান্য ভুলে শত্রু। বন্ধু ভুল করলে তাকে বলি না, ‘এটা তোমার ভুল, এটাকে শুধরে নাও, স্বীকার করো এবং সবশেষে আমি তোমার বন্ধুই আছি’। কিন্তু তা না করে বরং ভুলের সুযোগটা কাজে লাগাই বন্ধুর শত্রু হয়ে উঠে আমার বন্ধু! হাজারটা ভালোর মধ্যে এক ফোঁটা ভুলের ক্ষমা নেই আমাদের কাছে। তাই আমি যখন ভুল করি, আমার বন্ধুও তাই করে, চরম দু:সময়ে একলা হাতটি আরও একলা করে দিয়ে চলে যায়, আর আমিও তার ভুল ধরিয়ে দেওয়া আচরণটাকে মেনে নিতে পারি না। শুরু হতে থাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ!

বন্ধু হয় চরম দুর্বল মুহূর্তের আশ্রয়, সমস্ত দুর্বলতার সাক্ষী। অথচ তার পরিবর্তে কী হচ্ছে? ভুল সময়ে ভুল করলে সেই ভুলের মাশুল দিতে হয় আরও চরম ভাবে। আপনজনই মাইকিংকরে সারা রাষ্ট্রে ছড়িয়ে দেয়ার দায়িত্ব নেন আমার সমস্ত দুর্বলতার কথা, অক্ষমতা আর সেগুলোর হাত-পা গজিয়ে আরও দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে।

গত কদিন ধরে যতটা আলাপ-অপলাপ, আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে সুপ্রীতি ধর আর উইমেন চ্যাপ্টারকে ঘিরে, তার হাজার ভাগের এক ভাগ প্রশ্নও উচ্চারিত হয়নি, ওই নির্যাতিত শিশু সাবিনা কেমন আছে? সিএমএইচের নিচ্ছিদ্র নিরপত্তার মধ্যে সাবিনার ক্ষতগুলো আরো ফুলে ফেঁপে উঠলো? না কমে গেল? এত কাঁদা ছোঁড়াছুড়ির মধ্যে প্রত্যেকেই যদি একবার করে প্রশ্ন করতাম, কেন আমরা এই হাজার বছরের দাস প্রথার শিকল টেনে নিয়ে যাচ্ছি? কেন আমরা এই ঘূণেধরা, পচে যাওয়া নষ্ট সমাজ ব্যবস্থাকে একঘরে করতে পারছি না? যত সহজে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত আক্রমণেই একঘরে করে ফেলতে পারি সুপ্রীতি ধরদের, কেন আমাদের কী বোর্ডে ঝড় উঠে না নারী শ্রমিকদের অল্প মজুরির বিরুদ্ধে? কেন গৃহকর্মিরা বেতন ভোগী কর্মচারি নয়? কেন তাদের সপ্তাহে নিদেনপক্ষে মাসে একদিনও ছুটি নেই? কেন তাদের কর্মঘন্টা সীমিত নয়? সেই সিস্টেমে কেন আমরা নতজানু হই, যে ব্যবস্থায় সন্তানসম্ভবা চাকরিজীবী নারীকে সম্মানের বদলে অপদস্থ করা হয়, শুধুমাত্র সন্তানের জন্য কেন হাজারটা কর্মজীবী নারীকে বাধ্য হয়ে চাকরি ছাড়তে হয়? কেন আমাদের কাজের জায়গায় ডে-কেয়ার গড়ে উঠে না?

আমরা আসলে প্রশ্ন করতে শিখিনি। আমাদের তথাকথিত সু-শিক্ষা(!) প্রশ্ন করতে শেখায় না, শেখায় নতজানু হতে, মেনে নিতে, মানিয়ে নিতে; আর মেনে নিতে, মানিয়ে নিতে নিতে ভেতরে ভেতরে আমরা হয়ে পড়ি ভয়ানক রকমের অসহিষ্ণু। তাই আপাত দৃষ্টিতে দুর্বল যে, যে সংখ্যলঘুরও সংখ্যালঘু, তার উপর চলে নির্যাতন!

উইমেন চ্যাপ্টার নারীদের পোর্টাল, আর তার সম্পাদক সুপ্রীতি, সে একে তো নারী, তার উপর জন্মগতভাবে হিন্দু! তাহলে বুঝেন, এ তো সংখ্যালঘুর চেয়েও সংখ্যালঘু! আর যায় কোথায়! বহুদিন ধরে বার বার যারা উইমেন চ্যাপ্টারের বিরোধিতা করে এসেছে, অস্ত্রটা এবার আমরাই তাদের হাতে তুলে দিয়েছি বুঝে বা না বুঝে। কারও কারও চোখে উইমেন চ্যাপ্টার হয়ে উঠেছে এখন এলিট নারীবাদী, সুবিধাভোগী নারীবাদী, নব্য নারীবাদী, আর কোনো বিশেষ গোত্রের কাছে তো বেহায়া-লাগামহীন-বেশ্যা মেয়েছেলেদের আড্ডা খানা, এর কোনো কোনো লেখা নাকি চটিকেও হার মানায়!

এসব যারা বলছে, তারা কী উদ্দেশ্যে, কোন লক্ষ্যে বলছে, তা আপনাদের না বোঝার কথা নয়। উইমেন চ্যাপ্টারের এসব অপবাদে আপনাদের কারও কিছু আসলে না গেলেও আমার আসে যায়। নারীদের যখন ঘরের ভেতরে বন্দী করে রাখার প্রক্রিয়া চলছে, তখন শুধু উইমেন চ্যাপ্টার নয়, যে কোনো নারী গ্রুপের অপবাদ আমাকে আশাহত করে। আর উইমেন চ্যাপ্টার আমার প্লাটফর্ম। আমি এলিট/সুবিধাভোগী নারীবাদী নই (নারীবাদ, নারীমুক্তির বিশাল পাঠের প্রথম পৃষ্ঠাও আমার পড়া হয়ে উঠেনি), আবার তথাগত শ্রেণীবিন্যাসে নিম্নশ্রেণী বলতে আপনারা যা বোঝান, আমি তাও নই, আপনাদের দৃষ্টিতে আমি সুবিধাবাদি মধ্যবিত্ত; বলতে লজ্জা নেই আমারও যাপিত জীবনের যন্ত্রণা রয়েছে, আর এই যন্ত্রণা যখন জঞ্জাল হয়ে উঠে, আমি তখন তা উইমেন চ্যাপ্টার নামক ডাস্টবিনেই(!) ছুঁড়ে ফেলে বেঁচে থাকার রসদ জোগাই। তাই এ প্লাটফর্ম আমার এবং আমার মত আরও অনেকের।

এটা যেহেতু প্লাটফর্ম, এখানে হাজার রকমের মানুষ থাকবে, তাদের হাজার মতামত থাকবে। এখানে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক, সেলিনা হোসেন, হুমায়ুন আজাদরা লিখেন নাই কখনও, তাই এর লেখার মান নিয়ে হা হুতাশে আমি একটু অবাকই হয়েছি আর কী!

সুপ্রীতি ধরের লেখার শিরোনাম আমার ভালো লাগে নাই, আপনার কিছু অংশ ভালো লাগে নাই, অন্যের পুরোটাই ভালো লাগে নাই, তাতে সমস্যটা কী? লেখার সমালোচনা করুন লেখা দিয়ে। সুপ্রীতি ধরের লেখার পরপরই নাদিয়া ইসলামের ‘আপনি আচরি ধর্ম, পরেরে শেখাও’ লেখায় তীক্ষ্ণ সমালোচনা কি আসেনি? এরকম আরো একশটা সমালোচনা আসতে পারতো, আর যতটা জানি প্রত্যেকটাই উইমেন চ্যাপ্টারেই ছাপা হতো। এটা হতো সমালোচনা। তা না হয়ে যা হলো, বা এখনো হচ্ছে, তা হলো নোংরামি।

সুপ্রীতি ধরকে টেনে হিঁচড়ে নর্দমায় নামিয়েছেন, নামান, আমার কী! এভাবেই তো চলে আসছে! এই সিস্টেমেই তো আমরা নতজানু, খাই-ঘুমাই-হাগুমুতু করি, কিন্তু আমার প্লাটফর্মকে, আমার যাপিত জীবনের জঞ্জাল ছুঁড়ে ফেলার ডাস্টবিনটাকে এই নোংরামিতে নিয়ে যাবার অধিকার আপনাদের নেই।

আর অনেক ‘মুক্তমনা’রা বলেছেন লেখা তুলে নিতে, এটা কি আসলে সমাধান? লেখা দিয়েই লেখার সমালোচনা করুন, তুলে নিতে হবে কেন? আপনারাই তো মুক্তবুদ্ধির চর্চা করেন, মত প্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলেন, আজ সুপ্রীতি ধরের লেখাটা তুলে নিতে বলছেন, কাল যখন আপনার লেখা কারো ভালো না লাগবে, তখন তো সেটাও তুলে নিতে হবে।

আপনি যখন নারী স্বাধীনতার কথা বলবেন, তখন ধর্ম ব্যবসায়ীরা বলবে, তুলে নাও তুলে নাও, এতে ধর্ম অবমাননা হচ্ছে, তখন কী বলবেন? রাষ্ট্র ঘটে যাওয়া অন্যায় নিয়ে কথা বলবেন তখন রাষ্ট্রযন্ত্র বলবে, তুলে নাও তুলে নাও, রাষ্ট্রের অবমাননা হচ্ছে, তখন কী করবেন? তুলে নেওয়াও সমাধান নয়, ব্যক্তি আক্রমণও সমাধান নয়, বরং লেখা দিয়ে লেখার সমালোচনা করুন।

কোনো এক প্রতিক্রিয়ার নিচে মন্তব্যে দেখলাম সুপ্রীতি ধরকে উইমেন চ্যপ্টারের সম্পাদকের পদ থেকে সরিয়ে দেবার কথা বলা হয়েছে। ভালো তো, আপনারা উদ্যোগী হয়ে বসুন না- টেনে হিঁচড়ে নর্দমায় নামিয়ে আনা পুঁতি গন্ধযুক্ত (!) সুপ্রীতি ধরকে সরিয়ে দিন, তাকেও মুক্তি দিন, আপনারাও মুক্ত হোন। আর আমার যাপিত জীবনের জঞ্জাল ছুঁড়ে ফেলা ডাস্টবিনটাও (!) মুক্ত হোক প্রতিক্রিয়াশীলদের থাবা থেকে।

আর না হয় আপনারা যারা এনজিওবাজ নন, সুবিধাভোগী এলিট নন, আপনাদের যাদের কথায় এবং কাজে কোনো ভুল হয় না, যারা ব্যক্তি সীমাবদ্ধতা বাদ দিয়ে শুধু অন্যের কথা ভাবেন, তারা একটা প্লাটফর্ম তৈরি করেন না, আমি বা আমরা যারা আছি, সেখানেই আমাদের জঞ্জাল ফেলবো কথা দিচ্ছি।    

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2
    Shares

লেখাটি ১,১৪৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.