নারীবাদ এবং আমার ৩৫ বছরের জীবন

0

ফারজানা আকসা জহুরা:

আমি নারীবাদ বুঝি না। আমার এটা বোঝার দরকারও ছিল না। আমার বাবা ছিলেন একটা বট গাছ। তিনি আমাদের সব কাজই করে দিতেন। আম্মু ছিল দেহরক্ষী, সব সময় আমাদের চোখে চোখে রাখতেন। এলাকার স্কুলে পড়েছি। বাবা মায়ের কল্যাণে কখনও কোনো সমস্যা হয়নি। প্রথম যেদিন কলেজে যাওয়ার জন্য লোকাল বাসে উঠলাম, ঠিক সেদিনই বুঝলাম বাবা-মা ছাড়া মেয়েদের চলতে ফিরতে কত শত সমস্যা হয়। আর তখন থেকেই নিজের রক্ষার ব্যবস্থা নিজেই করা শুরু করি।

আমার বাবার অবস্থা ভালোই ছিল। কিন্তু সবার তো আর গাড়ি থাকে না। আর প্রতিদিন কি সিএনজি ভাড়া করে কলেজ যাওয়া যাই? আচ্ছা যাদের অবস্থা আমাদের চেয়েও খারাপ ছিল, তাদের নিশ্চয়ই আরও সমস্যায় পড়তে হতো? যাদের পড়াশোনার খরচ নিজেদের জোগাড় করতে হতো, তারা কী করতো? নিশ্চয়ই টিউশনি কিংবা চাকরি! আমাদের কলেজে তো অনেক দূর থেকে, এমনকি গ্রাম থেকেও মেয়েরা একা একা পড়তে আসতো। তাদের নিশ্চয়ই আরও বেশি সংগ্রাম করতে হতো। ওরা কি সবাই নারীবাদী ছিল?

আমাদের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিলো। তাই বোনেরা পড়াশোনা শেষে কেউ ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তা করেনি। চাকরি করার কথাও তেমন ভাবেনি। বিয়ে করে সবাই গৃহিণী হয়ে গেছে। আর এইসব নিয়ে আব্বুর তেমন সমস্যা হয়নি। শুধু আম্মুই দুঃখ করতো, বলতো, আমার মেয়েরা কিছুই হতে পারলো না!

এরপর হঠাৎ আব্বুর টাকা উপার্জন বন্ধ হয়ে গেল, যখন আব্বু খুব অসুস্থ হয়ে পড়লো। সংসারের আয় রোজগারের পথ বন্ধ। তখনই বুঝলাম নারীদের উপার্জন করতে হয়। একজনের উপার্জনে কখনও নির্ভর করতে হয় না। সবার তো আর বাবা মা থাকে না, আবার থাকলেও কি সবার টাকার গাছ থাকে? একজনের আয়ে সংসার চালানো যে খুবই কষ্টের এবং ঝুঁকিপূর্ণ, নিজ জীবনেই দেখলাম। এক ধাক্কায় একেবারে দুয়ারে সবাই।

তখন থেকেই চাকরি করি। এতো বড় সংসারটা আমি একা কী করে টানি বলুন তো? আশপাশের সবাই ওই বয়সে বিয়ে করে বাচ্চার মা। আমার আশেপাশের লোকেরা তখন বলতো, মেয়ে দেখতে ভালো না। বিয়ে হয় না। তখন মনে হতো বিয়ের চেয়ে অনেক জরুরি সংসারটাকে বাঁচানো। ঐ অতটুকু বয়সে আমার ছোট বোনও চাকরি শুরু করলো। রাতে ছুটি হলে আমার বাবা বোনকে অফিস থেকে নিয়ে আসতো। আচ্ছা যাদের বাবা নেই, ভাই নেই তারা কী করে? তাদের অফিস থেকে কে নিয়ে আসে?

মধ্যরাতে আব্বু যখন অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল, একবার ভাবুন তো, অত রাতে আমরা মেয়েরা আব্বুকে নিয়ে কই যাই? আপনার বাবা প্রচণ্ড অসুস্থ, তাকে ডাক্তারের কাছে নিতে হবে, আপনার তেমন টাকাও নেই যে এ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করবেন, ঠিক ঐ মুহূর্তটা! আচ্ছা সব বাড়িতেই কি দুই-তিন জন পুরুষ সদস্য সবসময় উপস্থিত থাকে? আর যাদের থাকে না, তারা কী করবে? বাবা মায়ের মৃত্যুর অপেক্ষা?

আপনারা যখন কথায় কথায় বলেন, রাতের বেলায় মেয়েদের বের হওয়া ঠিক না। যখন রাতের বেলা বের হওয়া নিয়ে এতো এতো লেকচার দেন, যখন রাতে বের হলে মেয়েদের ধর্ষণ হওয়া স্বাভাবিক বলেই মনে করেন, তখন সত্যই আমার খুবই রাগ হয়, আর সহ্য হয় না।

কেন আমি আমরা আমাদের প্রয়োজন রাতে বের হতে পারবো না? কেন আমার পদে পদে এতো বিপদ থাকবে? কেন সমাজটা আমাদের নিরাপত্তা দিতে পারবে না? কেন? বলুন তো? মেয়েদের কি বাবা মা থাকতে নেই? তাদের কি রাতে প্রয়োজন হয় না? তাদের কি টাকাপয়সার দরকার হয় না? তাদের কি অসুখ-বিসুখ হয় না? আবার একটি বিবাহিত মেয়েকে যদি তার স্বামী অনুমতি না দেয় তার বাবা-মা’র দায়িত্ব নিতে কিংবা নিজ সংসার ফেলে বাবা-মা’র দেখাশোনা করতে, তখন সেই মেয়েটি কী করবে? তার অসুস্থ বাবা-মা’কে ঐ অবস্থায় রেখে দেবে মরার জন্য? আর তার বাবা মা কে কে দেখবে?

আমার বিয়ে না হওয়াটা আমার উপকার করেছিল তখন। কিছুদিন হলেও সমাজে নারীদের সংগ্রামটা খুব কাছ থেকে টের পেয়েছি। নিজের যোগ্যতাও উপলব্ধি করেছি। আজ যখন কেউ বিয়ে আর মাতৃত্ব নিয়ে বড় বড় লেকচার দেয়, তখন আমার হাসি পায়। আচ্ছা দুনিয়াটা কি সবার জন্য এক?

আমার মা আমাদের ভাইবোনদের মানুষ করতে গিয়ে স্কুলের চাকরি করেনি। কিন্তু আমার মা যখন অসুস্থ, শয্যাশায়ী. তখন কে তার দেখাশোনা করেছে? কেউ না, সবাই তখন নিজ নিজ মাতৃত্বের দায়িত্ব পালন করেছে। আমার দেখা বেশিরভাগ নারীই তাই করে। সমাজ মেয়েদের এটাই শেখায়।

আব্বুর মৃত্যুর পরে আবার রাতের অন্ধকারে আমাদের জমি দখলের চেষ্টা হলো। তখন এই সমাজের কোনো পুরুষ আমাদের পাশে দাঁড়ায়নি। আম্মু আর আমাকে মেয়ে হয়েও জমি উদ্ধারের সংগ্রাম করতে হলো।

আপনারা যখন বলেন, মেয়ে মানুষের এতো সাহস ভালো না, তাদের বলি, মেয়ে মানুষ বলেই তাদের সাহসী হতে হবে। তা না হলে, তাদের সম্পত্তি কে রক্ষা করবে? আপনি? নাকি মেয়ে মানুষের সম্পত্তি দখলের জন্যই তাদের দুর্বল হয়ে থাকতে বলা? নাকি তাদের যাতে রাস্তায় নামিয়ে শোষণ করা যায়?

আম্মু আর আমাকে ঐ মিস্ত্রিদের সাথে দাঁড়িয়ে থেকেই বাড়ি বানাতে হয়েছে। মিস্ত্রিদের সাথে গিয়ে গিয়ে ইট … বালু …. সিমেন্ট … দরজা … জানলা সবই কিনতে হয়েছে। কই সমাজ তো আমার এই কাজগুলি করে দেয়নি? মেয়ে বলে পদে পদে ঠকিয়েছে। হেনস্থা করেছে। এই সমাজে যে মেয়ে মানুষ হওয়াই বড় পাপ!

আপনারা যখন কথায় কথায় নারীবাদী বলে নারীদের গালি দেন, কেন জানি আমার তখন খুব লাগে, কখনও কখনও খুবই লাগে। আমি নারীবাদী নই। কখনও নারীবাদ নিয়ে পড়াশোনাও করিনি। আমি ধর্মে বিশ্বাসী। সমাজ বলেছে, নারীবাদ খারাপ জিনিস, আমিও তাই শিখেছিলাম। আমি ছিলাম শুধুই একজন নারী। যে নারী ছোট থেকে একটি সিংহী মা’কে দেখেছে। যে তার মেয়েদের জন্য হুংকার দিয়ে বেড়াতো। যে নারী কৈশোরে রান্নাঘর সামলিয়েছে, দেখাশোনা করেছে ছোট ছোট ভাই বোনকে। যেই নারী তরুণী হয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসেনি। সেই বাবা-মায়ের সংসারের দায়িত্ব পালন করেছে। যেই নারীর যৌবনে বাবা-মা সহ সমস্ত সংসারের বোঝা নিজেই বহনের চেষ্টা করেছে। যেই নারী অন্য নারীর দুঃখ, জীবন-সংগ্রাম খুব কাছ থেকে অনুভব করেছে। যেই নারী সততার জন্য সরকারি চাকরির ধারের কাছেও হাঁটেনি, এই নারীর মতো অনেক নারী আছেন, যারা নারীবাদ বোঝেন না। কিন্তু জীবনের প্রতিটি মোড়েই সংগ্রাম করে গেছে। সমাজের নির্ধারণ করে দেয়া পুরুষের কাজ এবং দায়িত্ব উভয়ই পালন করেছে।

আমি হলাম সেই নারী, যে নারী তার ৩৫ বছর জীবন দিয়ে প্রচণ্ডভাবে অনুভব করে, নারীদের আসলেই নারীবাদী হওয়া উচিৎ।

অসমাপ্ত

লেখাটি ৭,০৭৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.