বিপরীত সমালোচনা কাম্য, কিন্তু সময়টা বিবেচ্য

0

আসমা খুশবু:

বনানীর রেইন্ট্রি হোটেলে মেয়ে দুটি ধর্ষিত হবার চল্লিশ দিন পরে যখন মামলা করলো, তখন একপক্ষ কেনো তারা রাতের বেলা হোটেলে গিয়েছিল, তাদের পোশাক ঠিক ছিল না, তাদের সাথে রেটে মেলেনি, এমন অনেক পর্যালোচনায় ব্যস্ত ছিল। ধর্ষকদের বিচারের দাবিতে যখন প্রতিবাদ চলছে চারদিকে, তখন ঠিক বিপরীত সমালোচনা কতোটা গ্রহণযোগ্য? এতে মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরে যাবার সম্ভাবনা প্রবল, যার ফলে মূল বিষয় বাধাগ্রস্ত হয়।

কিছুদিন আগে ইংল্যান্ডের একটি বাচ্চাদের কনসার্টে বোমা হামলায় মৃত বাচ্চাদের নিয়ে লেখাতে আমার অনেক ফেসবুক বন্ধুই কটাক্ষ করে লিখেছেন, সিরিয়াতে যে মুসলিম বাচ্চাদের মারছে তা চোখে দেখি না কেন? যে কোন মৃত্যুই বেদনার। কিন্তু একটি প্রসঙ্গ যখন গুরুত্ব দাবি করে তখন তার দোষ খুঁজে তুলনামূলক আরেকটি বিষয়, কিংবা ঠিক বিপরীত ইস্যুর অবতারণা করলে মূল ফোকাসটাই সরে যায়, মানুষ বিভ্রান্ত হয়।

অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে আপনি একপক্ষ তো আমাকে আরেকপক্ষ নিতেই হবে। এক কাতারে দাঁড়াতে আমাদের কোথায় যেন বাঁধে। এই পক্ষ টানাটানির সুযোগে ভিকটিম হয়রানির মুখোমুখি হচ্ছে, টাকার কাছে বিক্রি হচ্ছে, অন্যায়কারী সেই সুযোগে আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে গিয়ে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, নতুন অন্যায়ের খোঁজ করছে। তার মানে বিপরীত ধর্মী আলোচনা হতে পারবেনা তাও নয়, তবে কিনা ওই আলোচনার জন্য ওই সময়টা সঠিক কিনা সেটার নির্বাচন গুরুত্বপূর্ন, তা নাহলে সেটা ক্ষতির কারণ হতে পারে। একজন সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে সে দায় আপনি, আমি কেউ এড়াতে পারিনা বোধহয়।

একজন গৃহকর্মী সাবিনা যখন নিষ্ঠুরভাবে গৃহকর্ত্রী আয়েশা লতিফের হাতে নির্যাতিত হয়, তখন ফোকাসটা নির্যাতিতর ন্যায়বিচার পাওয়া, সঠিক চিকিৎসা এবং পরবর্তীতে নিশ্চিত জীবন যাপনের নিশ্চয়তা, এসব দিকেই হওয়া উচিত। উইম্যান চ্যাপ্টার প্রথম বিষয়টি প্রকাশ করে ছবিসহ। এই বিষয়ের উপর বেশ কয়েকটি লেখাও প্রকাশ করে। স্বভাবতই ধরে নেওয়া যায় উইম্যান চ্যাপ্টার নির্যাতিতের পক্ষে কন্ঠ তুলেছে। এই অবস্থায় সম্পাদক Supriti Dhar এর গৃহকর্মীদের অপেশাদারিত্বের সমালোচনামূলক একটি লেখাকে কেন্দ্র করে ফেসবুকবাসী উইম্যান চ্যাপ্টার এবং ব্যক্তি সুপ্রীতি ধরের স্ট্যান্ডই পাল্টে দিয়েছে।

হ্যাঁ লেখাটির বেশ কিছু অংশের সাথে আমি নিজেও একমত নই, বিশেষ করে ‘লক্ষী নামক গৃহকর্মী মায়াবড়ি খেয়ে মাথা ঘুরানোর জন্য সব দুধ খেয়ে ফেলতো’, এখানে মনে হয়েছে মেয়েটি পরিবারের পুরুষদের দ্বারা নিয়মিত যে যৌন নিগ্রহের শিকার হচ্ছে সে বিষয়টি লেখক এড়িয়ে গেছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়, ওটা কোন সঠিক সময় ছিল না এমন বিপরীতধর্মী একটি লেখা প্রকাশের। কারণ একটি দায়িত্বশীল প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে, গৃহকর্মীদের নির্যাতন নিয়ে যখন অনলাইন গরম, তখন তাঁর একটি লেখায় মানুষের ফোকাস ঘুরে যেতে পারে।

এছাড়া দুটি বিষয়ের গুরুত্বও সমান হয় না কোনভাবেই। একজন ছেলে অথবা মেয়ে গৃহকর্মি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মাত্রার নির্যাতনের শিকার হয়, শারীরিক, অর্থনৈতিক, যৌন, শ্রেণী বৈষম্য আরো কতো কী! তো এই বিষয়গুলোর পাশে গৃহকর্মীর অপেশাদারিত্বের সমালোচনা সমান জায়গা পায় না। সবচেয়ে বড় কথা সময় এবং গুরুত্বের বিবেচনায় লেখাটি প্রকাশ ঠিক হয়নি।

এই লেখাকে কেন্দ্র করে লেখকের যে সমালোচনা হয়েছে তা পড়লে রীতিমতো স্তম্ভিত হতে হয়। লেখার সমালোচনা গ্রহণযোগ্য কিন্তু লেখকের ব্যক্তি জীবন কতোটা আলোচনার বিষয় হতে পারে? একটা পেইজ দেখলাম লেখককে নোংরা ভাষায় আক্রমন করে ফাঁসি পর্যন্ত চেয়ে ফেলেছে! তাকে ধর্মীয় সমালোচনার কেন্দ্রীভূত করে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে উস্কে দেওয়া হয়েছে। লেখাকে কেন্দ্র করে লেখকের জীবনকে নরকে পরিণত করার অধিকার আপনার আছে কিনা একটু ভেবে দেখবেন।

আর একজন মানুষের একার চেষ্টায় উইম্যান চ্যাপ্টারের মতো একটি প্ল্যাটফর্ম দাঁড়িয়ে আছে, তার ভূমিকাতো অস্বীকার করা যাবেনা। এদেশের মেয়েরা এটলিস্ট মুখ খুলছে, এটা কতটা আশার কথা শুধুমাত্র তারাই জানেন যারা এরদ্বারা সরাসরি প্রভাবিত। শুধুমাত্রএকটি লেখাকে কেন্দ্র করে এতো জনপ্রিয় একটি পোর্টাল কিভাবে বন্ধ হয়ে যায় বা করে দেওয়া হয় তা আমার বোধগম্য নয়। এখানে বলতেই হয় পুরুষতন্ত্রের একটি সফল পদক্ষেপ এটি।

সবশেষে উইম্যান চ্যাপ্টার চলুক তার নিজস্ব গতিতে, সম্পাদককে নিয়ে ব্যক্তি আক্রমণ বন্ধ হোক। আর এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটা, নির্যাতিত সাবিনা যেন তার উপর হওয়া অন্যায়ের বিচার পায়, আমাদের ফোকাসটা হোক সেদিকেই।।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৭৯৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.