আপনি আচরি ধর্ম, পরেরে শেখাও

0

নাদিয়া ইসলাম:

পরশুদিন আয়শা লতিফ এবং গৃহকর্মী নির্যাতন নিয়া একটা লেখার পরপরই আমার ইনবক্স এবং ফেইসবুক ভইরা গেলো “এক হাতে তালি বাজে না” মার্কা মুদ্রার ঐ পিঠে গৃহকর্মীরাও যে কত খারাপ হইতে পারেন এই ধরনের লেখা দিয়া।

প্রচুর নারী জানাইলেন তাদের বাসায় গৃহকর্মীদের ‘প্রচুর’ বেতন দিয়া ‘আদরযত্নে’ রাখা হইলেও তাদের ‘কৃতজ্ঞতা’ নাই, তারা চুরি করেন, কাজে ফাঁকি দেন, ‘মালিক’ চইলা গেলে তাদের ড্রেসিং টেবিল, ফ্রিজ ইত্যাদিতে হানা দেন, ‘মালিক’ বাসা থিকা বাইর হইয়া গেলেই তারা টিভি খুইলা ফ্যান এবং এসি ছাইড়া সোফায় গা এলাইয়া দেন, বাসার ‘শিশু-মালিক’দের খাইতে না দিয়া নিজেরা খাইয়া ফেলেন এবং অনেকক্ষেত্রে বাসার ‘পুরুষ-মালিক’দের সাথে শুইয়া রাত্রে গৃহকর্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন!

খাড়ান মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত আপা, হাইসা লই। আর কতভাবে নিজের ক্ষুদ্রত্ব এবং আপনার একপাক্ষিকভাবে দেখার ‘চোখ’ এবং শ্রেণিঘৃণা প্রমাণ করবেন আপনি? আর কতভাবে নিজের দোষ ঢাকবেন আপনি?

প্রথমতঃ আপনি একদিনে গড়ে ১৪ থিকা ১৮ ঘণ্টা কাজের জন্য কত টাকা দেন একজন গৃহকর্মীরে? মাসে ১০ হাজার? ম্যাক্সিমাম ১৫ হাজার? এখন হিসাব করেন আপনি অফিসে যেই ৯টা-৫টা কাজ করেন, তার বিনিময়ে ইনক্রিমেন্ট, সরকারী ছুটি, বাৎসরিক ছুটি এবং অন্যান্য বেনেফিটসহ আপনি মাসে কয় লাখ টাকা বেতন পান? আপনি আপনার অফিসে যেকোনো একটা স্পেশালাইজড কাজ করার বিনিময়ে টাকা নেন, অপরপক্ষে আপনার বাসার গৃহকর্মী বাসা এবং আপনার কাপড়চোপড় পরিষ্কার করা থিকা শুরু কইরা রান্নাবান্না এবং বাচ্চা (এবং বৃদ্ধ বাপ মা থাকলে, তাদের) দেখাশোনা ইত্যাদি বিভিন্ন স্পেশালাইজড দায়িত্ব পালন কইরা থাকেন।

পৃথিবীর উন্নত দেশগুলির দিকে তাকাইয়া দেখেন, একজন গৃহকর্মীর বেতন একজন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর, একজন রিসার্চ সায়েন্টিস্ট, একজন সংসদ সদস্য এবং একজন ইঞ্জিনিয়ারের চাইতে বেশি। কারণ, তারা আপনার সবচাইতে নোংরা এবং সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলি কইরা থাকেন। তাদের কাছে আপনি আপনার জীবনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ, আপনার বাচ্চাদের এবং আপনার বৃদ্ধ বাপ মা’দের রাইখা যান।

তা বাংলাদেশ যেহেতু গরীব দেশ, এবং এই দেশে যার কাছে টাকা তার কাছেই আইন, সুতরাং আপনি ভাবেন এই ১০-১৫ হাজার টাকা, বছরে দুইটা শাড়ি আর এক ঈদে তিন দিনের জন্য ছুটি নিয়াই গৃহকর্মীদের সুখে আহ্লাদে আষ্টখান চল্লিশখান হইয়া আপনারে সকাল বিকাল নমঃ নমঃ করার কথা।

না আপা, একজন গৃহকর্মীরও আপনার মতো দুইখান বাচ্চা আছেন, উনারও আপনার মতো বাপ মা আছেন- যাদের আপনি ১০ হাজার টাকা দিয়া একমাস পালার চেষ্টা কইরা দেখতে পারেন। আপনার বাসার গৃহকর্মীদের যাওয়ার জায়গা নাই, তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নাই আপনার মুখে লাত্থি দিয়া টাটা-বাইবাই বইলা বাইর হইয়া যাওয়ার, তাই উনারা আপনার বাড়িতে ১০ হাজার টাকা নিয়া কাজ করতেছেন। এবং সুখে করতেছেন না। সুতরাং উনাদের কৃতজ্ঞতা আশা করবেন না। কেউ যদি কৃতজ্ঞতা দেখান, সেইটা আপনার উপরি পাওনা।

দ্বিতীয়তঃ, সততা আপেক্ষিক জিনিস। গরীব মানুষের সততা না থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু আপনি নিজে মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত হইয়া কত সৎ তা একবার ভাইবা দেখেন তো! তা বাংলাদেশের প্রতিটা সেক্টরে যে দুর্নীতির গল্প শুনি আমি, এই যে সরকারী অফিসাররা যে ঘুষ ছাড়া কাজ করেন না, এই যে গ্রামীন ফোনে টাকার বিনিময়ে আমার বায়োমেট্রিক ডিটেইল বিক্রি হইয়া যায়, এই যে ডাক্তাররা নিজের কমিশন পাওয়া ওষুধ আপনারে দিয়া জোর কইরা কিনান, এই যে আড়ং-এর দুধে ভেজাল পাওয়া যায়, এই যে সংবাদপত্রগুলি “ইউনেস্কো রামপালের বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ প্রত্যাহার কইরা নিছে” বইলা মিথ্যা খবর ছাপায়, এই যে ব্র্যাক কয়েক কোটি টাকা ঋণখেলাপি করে, এইসব কারা করেন? আপনার দুই টাকার গৃহকর্মীরা? আপনি করেন না? আপনি খুব সৎ? আপনি একজন সাধারণ স্কুল টিচার? একজন সাধারণ মধ্যবিত্ত?

আমি বলবো আপনি সুযোগের অভাবে চরিত্রবান। চুরির সুযোগ পাইলে আপনিই সবার আগে চুরি করবেন। কিন্তু না, যেই চুরি আপনি করেন নাই, সেই চুরির দায় আপনারে আমি দিবো না, ভয় নাই। কিন্তু আমি আপনারেও সৎ মানুষ বলবো না। কারণ, এই আপনিই দুই টাকার জন্য রিক্সাওয়ালারে ঠকান। এই আপনিই কাজে ফাঁকি দেন, দেরি কইরা অফিসে যান, আগে আগে বাসায় চইলা আসেন। এই আপনিই মাছের বাজারে আপনার ব্যাগে ভুল কইরা দুইটা মাছ বেশি চইলা আসলে খুশিতে বাকবাকুম করেন। এই আপনিই লম্বা কিউ উপেক্ষা কইরা ডাক্তারের চেম্বারে সবার আগে ঢুকতে পারলে আনন্দে আহ্লাদিত হন। এই আপনিই ড্রাইভিং লাইসেন্স, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট বানানোর জন্য দালালদের ঘুষ দেন। এই আপনিই নকল কইরা পরীক্ষায় পাশ করেন। এই আপনিই স্বামীর কথায় হিজাব পইরা বাসা থিকা বাইর হইয়া বন্ধুদের সাথে দেখা করার আগে হিজাব খুইলা ফেলেন। এই আপনিই প্রভাবশালী মামা চাচা ধইরা চাকরির ব্যবস্থা করেন।

আপনি পদ্মা সেতু বানাইতে গিয়া চুরি করেন না ঠিক, মাছে ফরমালিন মেশান না ঠিক, কিন্তু সমাজের সামগ্রিক চৌর্যবৃত্তিতে আপনার অবদান কম নাই হাহা। সুতরাং আপনার বাসার নিম্নবিত্ত গৃহকর্মী ক্যানো চুরি করেন এই বৈজ্ঞানিক গবেষণা করার আগে সমাজের চরিত্র এবং আপনার চরিত্রের দিকে তাকান। অন আ ডিফরেন্ট নোট, চুরি ঠেকানোর সহজ রাস্তা আছে। সেই রাস্তায় না গিয়া আপনার হীরার কানের দুল আর আইফোন সেভেন যদি একজন গরীব মানুষের নাকের ডগায় ফালায়া রাইখা “ওগো আমার সর্বনাশ করে দিয়েছে গো” বইলা মরাকান্না কান্দেন, তাইলে আমি বলবো, আপনি একজন নির্বোধ মানুষ বিশেষ। হ্যাঁ, আলমারি বা ভল্ট ভাইঙ্গাও চুরি হয়, কিন্তু তার জন্য স্পেশালাইজড চোর দরকার।

সুতরাং কাজের লোকের চুরি নিয়া ভ্যানভ্যান করার চাইতে নিজে সতর্ক থাকেন, কাজের লোক নিয়োগের সময় তাদের আদ্যপান্ত খবর নেন, আইডি কার্ড জমা রাখেন এবং এরপর ছোটখাট আম- জাম- দুইটা ডিম- একটা মাছের মাথা- আপনার লাল রঙ্গের চুমকি বসানো ওড়না চুরি হইলে নিজের বড় বড় চুরির কথা ভাইবা সেই গল্প পেটের ভিতর হাপিশ কইরা দেন।

তৃতীয়তঃ, আপনার বাচ্চা বা বৃদ্ধ বাপ মা পালার জন্য স্পেশালাইজড মানুষ রাখেন। আপনি আপনার বাচ্চারে যেইভাবে ভালোবাসেন, এবং আপনার চোখে আপনার বাচ্চা যেইরকম পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বাচ্চা, অন্যের কাছে তা নাই হইতে পারে। আপনার বাচ্চার যেই আহ্লাদে আপনি হাইসা গড়ায়ে পড়তে পারেন, সেই আহ্লাদে অন্য মানুষ বিরক্ত হইতেই পারেন। আপনার যেই ‘সোনাবাবু’ খান না বইলা আপনার এত অভিযোগ, সেই সাতান্ন কেজি সোনাবাবুরে কোলে নিতে কারো কারো নাকের পানি চোখের পানি এক হইয়াই যাইতে পারে। সুতরাং আপনার গৃহকর্মী, যার বাচ্চা পালার অভিজ্ঞতা নাই, তারে মাসে ১০ হাজার টাকা দিলেই উনি আপনার বাচ্চারে নিজের বাচ্চা ভাইবা মাতৃস্নেহে লালন পালন করবেন ভাবলে আপনি ডোনাল্ড ট্রাম্প পরবর্তী দুনিয়ার এক নাম্বার জোক!

আপনার যদি কারো কাছে বাচ্চা বা বৃদ্ধ বাপ মা রাইখা যাইতে হয়, তাইলে স্পেশালাইজড কারো কাছে তাদের রাইখা যাবেন, এবং তা করার ক্ষমতা না থাকলে এবং গৃহকর্মীর মত ট্রেইনিংবিহীন মানুষের কাছে তাদের গু-মুত পরিষ্কার করার এবং খাওয়ানো দাওয়ানোর এত বড় দায়িত্ব দিতে বাধ্য হইলে অন্ততঃ এইটুক জাইনা যাবেন যে গৃহকর্মীরা আপনার মত কইরা এই কাজ করতে সক্ষম হবেন না। এবং জানবেন তাদের মারফত কাজে গাফিলতি হবেই। তাতে পরবর্তীতে “জানেন ভাবী, আমার বাসার রহিমা না বাবুকে সেরেল্যাক না খাইয়ে নিজেই খেয়ে ফেলেছে!” বইলা তিন আলিফ লম্বা টান দিয়া আপনার গান গাইতে হবে না।

চতুর্থতঃ, গৃহকর্মী যদি ‘মালিক’এর সাথে শুইয়া গৃহকর্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন তাতে সমস্যা কোথায়? যৌন নির্যাতনের কথা বলতেছি না, কিন্তু কোনো বাসার ‘মালিক’এর সাথে যদি স্বেচ্ছায় কোনো গৃহকর্মী যৌন বা প্রেমের সম্পর্কে জড়ান, তাতে আপনাদের এত জ্বলে ক্যানো? শ্রেণি ঘৃণার কারণে? না আপনার মত ফারজানা শাকিল থিকা চুল বাইন্ধা আসা ম্যানিকিওর পেডিকিওর করা ‘সুন্দরী’রে ফালাইয়া ‘কালো’ ‘কুৎসিত’ ‘গায়ে দুর্গন্ধওয়ালা’ কুলসুমের সাথে উচ্চশ্রেণির মালিক চইলা গেছেন, তাতে আপনাদের সমস্যা?

আমার বাংলা সিনেমা খুব পছন্দ। বাংলা সিনেমাগুলিতেই দেখা যায় বড়লোকের মেয়ের সাথে তার ড্রাইভার আর দারোয়ানের প্রেম। রাজার মেয়ের সাথে রাখালের প্রেম। তা গৃহকর্মীরা যদি সেই সব সিনেমা দেইখা সেইরকম স্বপ্ন দেখেন, সেইটা দোষ হয়? আপনি উচ্চাভিলাষী না? আপনি বিয়া করার সময় বাড়ি-গাড়িওয়ালা বড়লোক ছেলে খোঁজেন না? আপনি প্রেম করার সময় গাড়িওয়ালা বাইকওয়ালা ক্যামেরাওয়ালা বয়ফ্রেন্ড খোঁজেন না? আপনি আরেকজনের ছবি দেইখা জামাইয়ের পয়সায় মরিশাসে হলিডে’ করতে যাইতে চান না? আপনি জামাইয়ের পয়সায় লাখ টাকা দিয়া পাখিড্রেস কিনেন না? আপনি জামাইয়ের পয়সায় বড়লোকী করেন না? আপনার উচ্চাভিলাষ থাকলে উনাদের থাকবে না ক্যানো? 

“যদিও এক্সট্রা ম্যারিটাল এফেয়ার অন্য জিনিস। আপনি একজনের স্ত্রী হিসাবে থাকার পরে আপনার স্বামী যদি বিলকিস বানুর সাথে গিয়া ঘুমাইতে চান, তা সমাজের চোখে পরকীয়া অর্থাৎ ‘অন্যায়’ হয়। ন্যায় অন্যায় আপেক্ষিক আলাপ সুতরাং পরিত্যাজ্য- ” – তবে এই ঘটনা থিকা এইটা মাথায় রাখতে পারেন, যিনি ঘরে আপনারে রাইখা বিলকিসের সাথে ঘুমাইতেছেন, তার আপনারে পছন্দ না। দোষ বিলকিসেরও না।

আপনার স্বামীর ঘরে বিলকিস না থাকলেও উনি অফিসে, কক্সবাজারে, পার্টিতে, হংকংয়ে বিলকিসের মতো আর কাউরে জোগাড় কইরা নিবেন। সুতরাং বিয়া টিকাইতে চাইলে বিলকিসের চাকরি পাল্টানোর আগে নিজেরে পাল্টান। বিয়া টিকাইতে না চাইলে স্বামীরে ডিভোর্স দেন। সোজা হিসাব। শুধু শুধু গৃহকর্মীর উচ্চাভিলাষের কারণে আপনার ‘নিপাট ভালোমানুষ’ স্বামীটা ‘বখে’ গেলেন, এবং আপনাদের ‘সুখের সংসার’ ভেঙ্গে গেলো, এইরকম ফালতু কান্নাকাটি করবেন না। প্লিজ। শুনতেও বিচ্ছিরি লাগে।

লাস্টলি, গৃহকর্মীদের মানুষ হিসাবে দেখতে শিখেন। শ্রেণিঘৃণা থিকা বাইর হন। তারা আপনার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলি করেন। তাদের প্রাপ্য সম্মান এবং প্রাপ্য মজুরি দেন। তারা আপনার মনমত না হইলে তাদের বেতন দিয়া বিদায় কইরা দেন, কিন্তু তাদের শারীরিক, মানসিক, মৌখিক এবং যৌন নির্যাতন কইরেন না।

তারা আপনার সামর্থ্যের বাইরে পয়সা দাবি করলে নিজে কাজ করা শিখেন, বিলকিসের সাথে শুইয়া বেড়ানো আপনার স্বামীরে দিয়া ঘর মুছান, আপনি নিজে অফিস এবং বাসা একসাথে সামলান, রাত্রে স্বামী-স্ত্রী দুইজন মিলা রান্না করেন, চাকরিতে এইচ-আর’রে প্রেশার দেন যাতে তারা অফিসেই বাচ্চা পালার ডে-কেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থা করে। কারণ, এমনকি পয়সার বিনিময়েও আপনার বাচ্চা, আপনার বাপ মা, আপনার বাসারে আপনার মত কইরা ভালোবাসবেন এমন দ্বিতীয় মানুষ নাই।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ১০,৬০৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.