কুলখানির লেবু ,কাঁচামরিচ,পেঁয়াজ ও সেলফি সমাচার

0

সাবিনা শারমিন:

কুলখানিতে অনেকে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করে। এই আয়োজনে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করার জন্য আত্মীয়-স্বজন ফকির মিসকিনকে দাওয়াত দেয়া হয়। এটি যতোটা না ধর্মীয়, ততোটাই সামাজিক। আসলে এখানে এসে কে কার জন্যে দোয়া করে? মন থেকে কি কেউ দোয়া করে? না খেতে আসে? নাকি ছেলেমেয়ের বিয়ে দিতে আসে?

একজনকে দেখেছি এর মধ্যেও খোঁজ নিচ্ছেন কার ছেলে আমেরিকায় থাকে এবং সে পাত্রী খোঁজ করে কিনা! অনেক বাড়িতে রোস্ট পোলাউ রেজালার আয়োজন করা হয় কুলখানিতে। এই অনুষ্ঠানে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে বিরিয়ানি খেতে আমি অনেককেই দেখেছি। মোরগের রোস্ট এর মাংস চিবাতে চিবাতে কেউ কেউ আবার বলেন, লেবু, কাঁচামরিচ নাই? লেবু কাঁচামরিচ ছাড়া বিরিয়ানি খাওয়া যায়?

আরেকজন বলছেন, ‘ছেবেনাপ কোক নেই’? আরেকজন বলেন, ‘এক খিলি পান হবে রতন জর্দা দিয়া’? আমার এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় চলে গেলে তার মরদেহ ঘরে থাকা অবস্থাতেই অন্য এক আত্মীয় জিজ্ঞেস করছে, বাড়িটি কার নামে? এক মৃত বাড়িতে আমাকে এক মহিলা বললেন, ‘ভাবী মনে হয় আগের চেয়ে একটু মোটা হয়েছেন! বয়স বেশি লাগছে’।

আমার ছোট বেলার বন্ধুর মা গত কয়েকদিন আগে ওদের পাঁচ বোনকে একা করে দিয়ে চিরতরে চলে গেছেন। গতকাল কুলখানিতে ওর বাসায় গিয়েছিলাম। মৃত মানুষের বাড়িতে খুব স্বাভাবিকভাবেই আত্মীয় স্বজন এবং প্রতিবেশীরা জড়ো হোন। শোকার্ত মানুষের পাশে এই জড়ো হওয়াটি অনেকের কাছেই উৎসব।

এখানে অনেকেই দেখতে আসে শোকার্ত মানুষের মধ্যে কে কাঁদে, আর কে কাঁদেন না। তা নিয়ে আবার সমালোচনায়ও বসেন অনেকে। এখানে দাদী – মাসী ধরনের অনেক নারীই অত্যন্ত নির্মম নিষ্ঠুর আচরণ করেন। মৃত মানুষ ঘরে থাকতেই তারা সম্পদের ভাগাভাগি করে ফেলেন। অনেকে মৃত বাড়িতে এলেই ভাত খাওয়ার আবদার করতে থাকেন বেলা-অবেলায়। বিকেলে চা নাস্তার ব্যবস্থা নাই কেনো, তা নিয়ে অভিযোগ।

আমার বন্ধুর এক আত্মীয় বেডরুমে বসে কিচেন থেকে তাকে ভাত নিয়ে আসতে বললো। আরো বললো, একটি পেঁয়াজ চার টুকরা করে আনতে। বন্ধু এনেও দিলো। এরপর সে বললো, পেঁয়াজটি নাকি গতকালের কাটা। তাই নতুন করে আরেকটি কেটে নিয়ে আসতে!

(লেখার মধ্যেই বন্ধুর ফোন এসেছে! এতোক্ষণ কথা বলে তাকে সান্ত্বনা দিলাম। ও যা বললো)
একজন নারীর নামে নালিশ করলো যে তিনি নাকি কুলখানিতে এসে সেলফি তুলেছে। এই বলে মন খারাপ করছিলো। ওর ছোট বোন লন্ডনে থাকে। মাকে আইসিইউতে ভর্তির খবরে সে এক কাপড়ে ঢাকা রওনা দিয়েছে। সেই মুহূর্তে এক নিকট আত্মীয় তার সাথে ঢাকায় পাঠানোর জন্য কিছু কাপড় চোপড় এবং পারফিউম সুটকেসে করে পাঠানোর জন্য দিতে এসেছে!

গতকাল কিছুটা সময় ওর হাত ধরে বসে ছিলাম। কোনো কথা বলে লোড দেইনি তাকে। বন্ধুদের গেট টুগেদার এর একটি প্রোগ্রাম ছিলো। ওখানে না গিয়ে ওর মায়ের সাথে ছোটবেলা কী কী স্মৃতি রয়েছে ভাবতে বাসায় আসলাম। বেঁচে থাকলে আবার দেখা হবে বন্ধুদের সাথে!

কিন্তু কেউ কি বলতে পারেন মৃত মানুষের বাসায় এসে মানুষ কেনো এতো নির্দয় আচরণ করে?

লেখাটি ৪,৩২২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.