গৃহকর্মি নির্যাতন: মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ

0

সুপ্রীতি ধর:

গত কদিন ধরে আমরা একজন কর্নেলের স্ত্রী আয়শা লতিফের গৃহকর্মি নির্যাতনের খবর পড়ছি। ভয়াবহ নির্যাতন। আয়শা লতিফ নিজে ছয় মাসের অন্ত:সত্ত্বা, এসময় তার মনটা অনেক নরম থাকার কথা। কিন্তু নরম তো নয়ই, উল্টো চিত্র আমরা দেখলাম, জানলাম। জানি না, তার পারিবারিক ওরিয়েন্টেশন কী, কীভাবে বড় হওয়া, ‘শিক্ষিত’ হওয়া, কিছুই জানি না। এমনকি তার স্বামী কর্নেল তসলিম সম্পর্কেও আমরা জানি না। গৃহকর্মিদের ওপর তার এই নির্যাতন কি এই প্রথম? নাকি আগেও হয়েছে?  

এটা কি এমন যে, এই আয়শা লতিফ নিজেও নির্যাতিত নানাভাবে, যার সবটুকু এসে পড়েছে ছোট্ট এই মেয়েটির ওপর! যে দুবেলা ভাতের জন্য ঢাকায় পাড়ি জমিয়েছে? কে জানে? হয়তো সে শারীরিক নানান জটিলতায় ভুগে ভুগে মেজাজ খিটখিটে হয়ে গেছে, নইলে সামান্য ডিম পোড়ানোর অভিযোগে এক শিশুকে এমনভাবে মারতে পারে? যার চোখ দুটো ফুলে ঢোল হয়ে গেছে। শরীরের আর কোথায় কোথায় ছ্যাঁকা-ম্যাকা দিয়েছে, তাতো জানলামই না। বন্ধুরা বলছিল, কীভাবে পারলো এভাবে মারতে? ভিতরের হিংস্রতা কতোটুকু হলেই কেবল সম্ভব এমনভাবে নির্যাতন করা!

আর জানবোও না। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে মেয়েটিকে উন্নত চিকিৎসার নাম করে ছোঁ মেরে সিএমএইচ এ নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেইসাথে সাবিনা নামের ১১ বছরের শিশুটিও আমাদের মন থেকে উধাও হয়ে যাবে। সেখানে জায়গা করে নেবে এমনি আরও অনেক অনেক সাবিনা। এটাই এইদেশের নিয়ম। একটা ঘটনা নিয়ে বেশিদূর আমরা যেতে পারি না, তার আগেই অন্য ঘটনা এসে সামনে দাঁড়ায়। 

এ সংক্রান্ত একটি লেখা উইমেন চ্যাপ্টারে ছাপা হওয়ার পর সেখানে তানিয়া তাসলিমা নামে আমাদেরই এক বন্ধু-বোন লিখেছে নিজের অভিজ্ঞতার কথা। মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। লেখাটি এরকম: 

“আমি তো এর উল্টোটা দেখি আমার ঘরে,আয়শা লতিফ খারাপ, সমাজে যেমন চোর ডাকাত,সিলেটে, খুলনায় যে শিশুগুলোকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো,যে মেয়েটিকে ধর্ষণ করা হলো, এসবই অপরাধ, যে মেয়েটি আমার সাহায্যকারী হিসেবে কাজ করেছে তাকে আর তার পরিবারকে আমি কি করেছি তারাও যেমন জানে, আমিও জানি। তাকে গত ১ বছর ধরে আমার বাচ্চাটাকে শুধু খাওয়াতে বলেছি, আর একটি কাজও না…. সে বাচ্চাটাকে মেরে, না খাইয়ে রেখেছে, আমি তাকে কিছু বলতে পারিনি, কান ডলা দিয়ে ব্লাড বের করে ফেলেছে। শুধু বলেছি তোমাকে আর রাখবো না। কাজেই ভালো মন্দ সবখানে আছে, আমার বাচ্চার সাথে আরো অনেক কিছু করেছে, যা বলা সম্ভব নয়, আর হ্যাঁ আমি ব্যবসা করি, আমি আমার বেবিকে আমার প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যাই, কিন্তু তারপরেও safe করতে পারিনি। আপু, বাসায় যারা হেল্পিং হ্যান্ড হিসেবে কাজ করে তারা মিনিমাম ৫০০০ এর নিচে কেউ কাজ করে না .. থাকা খাওয়া, কাপড়, চিকিৎসা সবসহ। কিন্তু দুই পক্ষ যদি ভালো না হয় আপনি ও কোনো বসের সাথে কাজ করতে পারবেন না…আমাদের problem একটাই, কোনো ঘটনা ঘটনা ঘটলে সবকিছু গুলিয়ে এক করে ফেলি..আয়শা লতিফ crime করেছে, আর ওই বাচ্চাটাকে দেখবার পর যেমন আমার চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি, ঠিক তেমনি আমার বাচ্চাটার যখন কান দিয়ে ব্লাড দেখেছি, তখনও চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি”।

আমি তানিয়ার এই লেখাটি পড়ে, এবং তার আগেকার একটি স্ট্যাটাসের সূত্র ধরে কথা বলে যা জানতে পারি, তা রীতিমতো ভয়াবহ। কর্মজীবী মায়েরা আসলে কতোটা অসহায় এই জায়গাটায়, তা মা মাত্রই জানেন। ভাঙছে যৌথ পরিবারগুলো, সেইসাথে বাড়ছে নানারকম নির্যাতন। এর সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছে শিশুরা। আর গৃহকর্মি নামের শিশুরাও একইহারে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে প্রতিদিন।

আমি নিজের একটা অভিজ্ঞতার কথা এতো বছর পর শেয়ার করতেই পারি।

আমাদের একক পরিবার না হলেও একাত্তর পরবর্তী আমাদের ভাঙাচোরা পরিবারই ছিল। মা চাকরি করতো, ঠাকুরমারা থাকতেন গ্রামের বাড়িতে। আমার ভাইবোনেরা সবাই আমার চেয়ে অনেক বড়। তাই আমি যখন ছোট, তখন তারা সবাই কলেজের নানান স্তরে। কেউ ঢাকায়, কেউ ময়মনসিংহে। শুধুমাত্র বোহেমিয়ান বড় ভাই বাসায়। তার কোনো হদিসই মেলে না সারাদিন, কে দেখবে আমায়! আমাকে দেখার জন্য তখন পাশের বাড়ির লক্ষ্মী নামের একটি মেয়ে ছিল। ১৪/১৫ বছর বয়স হবে। এখানে বয়সটা বিশাল ফ্যাক্টর। আমি ছোট ছিলাম, কিন্তু একাত্তরের কথা মনে থাকার কথা না থাকলেও যেহেতু কিছু স্মৃতি আমার আছে, তেমনি আমি এখনও স্পষ্ট দেখতে পাই সেই লক্ষ্মীর কীর্তিকলাপ। 

বাসা একদম খালি না। বড় দাদা আছে, সেইসাথে দূর সম্পর্কের আত্মীয় স্বজন সবসময়ই থাকতো। সেখানে পুরুষদের সংখ্যাই বেশি। লক্ষ্মীর সাথে তাদের দহরম-মহরম আমি বিস্ফারিত চোখে দেখতাম। বুঝতাম না ঠিকই, কিন্তু দৃশ্যগুলো মনে গেঁথে আছে। লক্ষ্মী প্রায়ই আমাকে ঘুম পাড়ানোর সময় তার স্তন আমার মুখে ঠেসে ধরতো। আর আমি প্রাণপনে মুক্তির চেষ্টা চালিয়ে যেতাম। তখন থেকেই ওকে আমি অ্যাভয়েড করা শুরু করি। বড়দের আলাপ থেকে জানতাম, লক্ষ্মীর ঘরে (পাশের বাসাতেই থাকতো ওরা) সবসময়ই কিছু পুরুষের যাতায়াত ছিল।

একদিন শুনি, মায়ের অফিসের কিছু জিনিস মিসিং, এখানে বলে রাখি মা আমার পরিবার পরিকল্পনা অফিসে চাকরি করতেন। তারপর সেই ‘মিসিং জিনিস’গুলো আবিষ্কার হলো লক্ষ্মীর ট্রাংকে। আমার জন্য বরাদ্দ দুধও আমার পেটে পড়তো না, মায়া বড়ি খেয়ে মাথা ঘুরাতো বলে লক্ষ্মী সেই দুধ খেয়ে ফেলতো। আরও কতশত দৃশ্য যে আমার শৈশবকে কলংকিত করেছে, তা বলার নেই। 

আজ অনেকদিন পর তানিয়ার কথা শুনে আমার জীবনের একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল।

পরিপাটি করে সাজানো সাধের সংসারে একটুখানি বিষ ঢেলে দিতে গৃহকর্তার ভূমিকাও কিন্তু কম না। গৃহকর্মিদের ওপর তাদের অত্যাচারটা অন্যমাত্রায় থাকে। গৃহকর্ত্রীর অবর্তমানে গৃহকর্মিকে নানান প্রলোভন দেখিয়ে নির্যাতনের গল্প তো শত শত। কত সংসারে যে এ নিয়ে আগুন লাগছে বা অলরেডি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে, কতজনের খবর রাখি! বিলাসবহুল বিছানা ছেড়ে রান্নাঘরের মেঝেতে শুয়ে থাকা তেল চিটচিটে বিছানায় কতজন স্বামীকে মধ্যরাতে উদ্ধার করে স্ত্রীরা, সেই গল্প কি আমরা জানি না? কত তরুণী গৃহকর্মি বাড়ির পুরুষের যৌন অত্যাচারে অতীষ্ট হয়ে আত্মহত্যা করছে, সেই খবরও তো পাই আমরা। 

আবার অনেক গৃহকর্মির জীবনের শখই থাকে গৃহকর্ত্রীর মতোন হতে, সেই জীবনটা পেতে। সেইজন্য তারা সবকিছু করতে প্রস্তুত। এটা তাদের না পাওয়া জীবন থেকেই হয়, এতে অন্যায় কিছু দেখি না। বরং এটাই স্বাভাবিক। তবে এই চাওয়া যখন মাত্রা ছাড়ায়, তখনই বিপত্তিটা ঘটে। বোকা মেয়েগুলো জানে না, পুরুষগুলোর দৌড় ওই বিছানা পর্যন্তই! আমার রুশ ডাক্তার বলতেন, আমরা মেয়েরা যতোই পরিস্কার-নরম, পারফিউম মাখা বিছানা খুঁজি না কেন, পুরুষরা ওগুলোর তোয়াক্কাই করে না। 

দুরকম-তিন রকম, হাজারও রকম গল্পে ভরা আমাদের এই জীবন। যাদের ছোট বাচ্চা, যারা কর্মজীবী নারী, তাদের জন্য সহায়ক ব্যবস্থা গড়ে না উঠা পর্যন্ত মনে হয় এইসব সমস্যার কোনো সমাধান নেই। সিস্টেমটাকে ভেঙে গড়তে হবে আমাদের কর্মসহায়ক হিসেবে, তাহলে নারীরাও যেমন নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারবে সন্তান রেখে, তেমনি পুরুষরাও যখন সংসারের কাজগুলো, সন্তান লালন-পালনের কাজগুলো ভাগ করে নেবে, তখন এই গৃহকর্মিরাও এই দাসত্ব থেকে মুক্তি পাবে। আর সংসার যতদিন না দুজনের হবে, দুজন যতদিন ভাগ না করে নেবে নিজেদের দায়িত্বগুলো, ততদিনই এ থেকে মুক্তি নেই।

তবে কোনকিছুই গৃহকর্মি নির্যাতনকে সাপোর্ট করে না। না পোষালে ছাড়িয়ে দাও। অত্যাচার করা হবে কেন?

কর্নেল তসলিমের স্ত্রী পরিচয়ে যিনি গর্ববোধ করেন, তিনি এখন থেকে একজন নির্যাতক নারী নামেও পরিচিত হবেন। এটাই তার প্রথম শাস্তি। 

লেখাটি ৫০,৫৭৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.