‘কাজের মানুষ’ পিটানো আয়শা লতিফরা সাবধান

নাদিয়া ইসলাম:

সাবিনা নামের ১১ বছরের একটা মেয়ের খবর ঘুরতেছে নিউজ ফিড জুইড়া। আর্মি অফিসারের স্ত্রী এবং ছয় মাসের প্রেগন্যান্ট আয়শা লতিফ বইলা একজন সুন্দরী ভদ্রমহিলা সাবিনারে ডিম ভাজি পুড়াইয়া ফেলার ‘অপরাধে’ পিটায়ে চোখ মুখ ফুলায়ে ফেলছেন। বাকি শরীরে কী করছেন জানি না, সেই খবর পত্রিকায় আসে নাই।

আমি উইমেন চ্যাপ্টারে খবরটা পড়ার পরে আয়শা লতিফের ছবির দিকে তাকাইয়া ছিলাম অনেকক্ষণ। বাংলা সিনেমা মারফত আমরা ‘ভিলেন’দের কদাকার টাকমাথা দাঁত-উঁচু তেল চকচকা পেটমোটা মিশমিশা কালো চেহারা দেইখা অভ্যস্ত।

আমাদের রূপকথার ডাইনীদেরও হাড় জিড়জিড়া শরীর- তোবড়ানো গাল, মূলার মত নাক, আগুনের ভাঁটার মতো চোখ আর শনের মতো খরখরা সাদা সাদা চুল! সেই থিকা আমাদের সাবকনশাসে মনে হয় খারাপ মানুষ মানেই ‘খারাপ’ চেহারা সমার্থক শব্দ হিসাবে ঢুইকা গেছে। অথচ বাস্তবে দেখেন, এইসব এইসব খারাপ এইসব নোংরা এইসব কুৎসিত এইসব অসুস্থ মনের মানুষেরা কী সুন্দর সুন্দর ‘ভালোমানুষ’ চেহারা নিয়া বইসা আছেন আমাদের আশেপাশে!

তবে হ্যাঁ, ঢালাওভাবে একলা আয়শা লতিফরে গালি দিয়া লাভ নাই। বাংলাদেশে কাজের লোক পিটান না কে?

বাংলাদেশে কাজের লোকরে বাসি ভাত খাইতে দেন না কে? বাংলাদেশে কম পয়সায় এতো এতো এতো এতো সার্ভিস পাইয়াও “জানেন ভাবী, আমার বাসার রওশন একদম কাজ করে না!” বইলা পাশের বাসার ভাবীর সাথে কুৎসা করেন না কে? বাংলাদেশে নিজেরা সকাল বিকাল বাংলাদেশ ব্যাংক- রিজার্ভ ব্যাংক থিকা একশ’ চৌদ্দ কোটি টাকা চুরি কইরাও ড্রাইভার, দারোয়ান, কাজের লোকদের কাছ থিকা সামান্য সাবান চুরির অপরাধে বেতন থিকা ২০০ টাকা কাইটা রাখেন না কে? বাংলাদেশে ‘শিশু মালিক’দের দিয়া তাদের চাইতে বয়সে তিনগুণ বড় কাজের লোকরে তুই সম্বোধনে ডাকতে শিখান না কে?

বাংলাদেশে নিজের সন্তানের সামনে তার বাপের বয়সী চাকররে হুইস্কির গ্লাসে বরফ কম পড়ার জন্য চড় মারেন না কে? বাংলাদেশে নিজের “আহা আমার বাবু কিছু খায় না” বলা একশ’ সাতাত্তর কেজি হোদলকুৎকুৎ সন্তান কোলে নিয়া ২৪ ঘণ্টা খাড়ায় থাকা কাজের মেয়েরে রেস্টোরেন্টে নিয়া গিয়া অতিশয় ‘শুকনা’ সন্তানের মুখের ভিতর চিকেন উইংস আর কোক আর বিরিয়ানি আর মুরগ মুসল্লম আর চিজ কেক আর পেপারনি পিৎজা আর আইসক্রিম আর তাবত দুনিয়া একলগে ঠুসতে থাকার সময় ঐ কাজের মেয়েরে কিছু না খাওয়ায়ে রেস্টোরেন্টের এক পাশে দাঁড়া করায়ে রাখেন না কে?

বাংলাদেশে নিজের সন্তানের সুশিক্ষার জন্য একহাজার প্রাইভেট টিউটর রাইখা সন্তানের সমবয়সী কাজের লোকের জন্য একটা সাধারণ বর্ণমালার বইয়ের ব্যবস্থা করেন কে? বাংলাদেশে নিজে গরমে আহা-উহু কইরা এসির বাতাস এবং বরফ দেওয়া লেমনেড খাইতে খাইতে কাজের লোকরে রান্নাঘরের পাশে চিপা এক কোনায় ফ্যানহীন জানালাহীন গুমোট অন্ধকারাচ্ছন্ন অস্বাস্থ্যকর ঘরে শুইতে বাধ্য করেন না কে?

বাংলাদেশে কাজের লোকরে নিজের পেরুর ভ্যাকুনা ভেড়ার গায়ের লোম দিয়া বানানো সোনার সুতায় সেলাই করা উলের চাদরে বসতে দিলে চাদর ছিঁড়া- ভাইঙ্গা গুঁড়া গুঁড়া হইয়া নীল আসমানে সাঁই সাঁই উইড়া যাবে এই চিন্তায় তারে এই মহার্ঘ্য চাদর বিছানো খাটে, সোফায় বসতে দেন কে?

আপনি? আপনি উনারে বসতে দেন আপনার পাশের চেয়ারে? আপনি উনারে নিজে যা খান তা খাইতে দেন? আপনি নিজে যা পরেন তা পরতে দেন? আপনি নিজ সন্তানের জন্য যা করেন, তার অর্ধেকও উনার জন্য করেন? তাইলে আপনি ব্যতিক্রম। তাইলে আপনার নাম বাংলাদেশের কাজের লোকের ইতিহাস বইয়ে স্বর্ণাক্ষরে লিখা রাখা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশের উচ্চ- উচ্চমধ্যবিত্ত- মধ্যবিত্ত ৯০% পরিবারেই আমি এই চিত্র দেইখা আসছি। আমি দেখছি আয়শা লতিফের মত সুন্দরী মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্ত নারীদের কুৎসিত চেহারা। এবং বাংলাদেশের ঘরে ঘরে উনারা আছেন।

শিশু নির্যাতকের আলাদা চেহারা নাই। যারা শিশু পিটাইতে পারেন, তারা কিশোরও পিটাইতে পারেন, বয়স্কও পিটাইতে পারেন। যারা গৃহকর্মী নির্যাতন করেন, তারা “আমি উচ্চশ্রেণি” “আমি মালিক” এই ধরনের সামন্ততান্ত্রিক তথা পুরুষতান্ত্রিক চিন্তায় গৃহকর্মীদের অপমান করার, লজ্জা দেওয়ার, বঞ্চিত করার, শারীরিক- মানসিক এবং অর্থনৈতিকভাবে নির্যাতন করার ‘সামাজিক সার্টিফিকেট’ হাতে নিয়া বইসা একধরনের বিকৃত যৌনসুখ পাইয়া থাকেন।

বাংলাদেশ বিউরো অফ স্ট্যাটিস্টিকসের ‘লেবার ফোর্স সার্ভে’ ২০০৬ এর রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশে ঐ মূহুর্তে প্রায় ২০ লাখ মানুষ এই পেশায় জড়িত ছিলেন বইলা ধারণা করা হয়। আমি ২০০৬ এর পরে এই জাতীয় কোনো রিপোর্ট অনলাইনে খুঁইজা পাই নাই। এল-এফ-এস রিপোর্ট অনুযায়ী এর মধ্যে ৩ লাখ ৩৩ হাজার গৃহকর্মীর বয়স ১৫’র নিচে। ‘আই-এল-ও ইউনিসেফ বেইজলাইন’ ২০০৭ রিপোর্ট অনুযায়ী ঐ মূহুর্তে শুধু ঢাকায় ১ লাখ ৪৭ হাজার শিশু গৃহকর্মী হিসাবে কাজ করতেছেন। এবং এইসব শিশুরা সঠিক বেতন দূরে থাকুক, বেশিরভাগক্ষেত্রেই কোনো প্রকার সাধারণ মানবিক সুবিধা পান না। অনেকক্ষেত্রে যৌন নির্যাতনের শিকার হন।

বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন আইন, পিনাল কোড, কোড অফ ক্রিমিনাল প্রসেডিওর ইত্যাদির অস্তিত্ব থাকলেও ট্রেইড ইউনিয়ন থিকা ‘শ্রমিক আইন’এ ক্যানো গৃহকর্মীদের যুক্ত করা হয় নাই তা নিয়া মাথাব্যথা দেখানো হয় নাই এবং এমনকি বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাগুলি বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন সময়ে তাদের নিয়া বিচ্ছিন্নভাবে আইনী ফাইট দিলেও বা দুই তিন দিন মানববন্ধন করলেও এই সংক্রান্ত আইন ক্যানো পাশ হয় নাই তা নিয়া মৌনব্রত পালন করছেন।

২০০৮ থিকা ২০১১’র মধ্যে যদিও কিছু বেসরকারী সংস্থা (NDWWU এবং DWRN) নিজেদের উদ্যোগে ‘কোড অফ কনডাক্ট’এর ড্রাফ্‌ট্‌ যথাযথ মন্ত্রণালয়ে নিয়া গেছে এবং ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা এবং কল্যান নীতিমালা’র প্রস্তাব করছে, যা মাত্র গতবছর অর্থাৎ ২০১৬ তে আইসা সংসদের অনুমোদন পাইছে, যেইখানে বলা হইছে গৃহকর্মীরা শ্রমিক আইনের আন্ডারে ‘শ্রমিক’ হিসাবে চিহ্নিত হবেন এবং যাবতীয় সরকারী ছুটি ছাড়াও মাতৃত্বকালীন বেতনভুক্ত চার মাসের ছুটি পাবেন।

২০১৫ নীতিমালা, যা এখনো পুরাপুরিভাবে বাস্তবায়ন হয় নাই, তার শর্ত অনুযায়ী, গৃহকর্মীর চাকরি করার নির্ধারিত বয়স থাকবে, তাদের আইন অনুযায়ী বেতন দিতে হবে, তাদের জন্য স্বাস্থ্যকর কাজের পরিবেশ দিতে হবে, কাজের নির্ধারিত সময়সীমা বাইন্ধা দিতে হবে, তাদের স্বাস্থ্যসেবা এবং যেকোনো দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, তাদের বিশ্রাম এবং বিনোদনের জন্য সময় দিতে হবে।

বাংলাদেশে আজকের দিন পর্যন্ত গৃহকর্মী নিবন্ধনের কোনো ফরম্যাল বা লিগ্যাল রেজিস্ট্রেশান সিস্টেম নাই। ২০১৫ নীতিমালা অনুযায়ী এখন থিকা গৃহকর্মীদের সবার বাধ্যতামূলকভাবে কাজ শুরু করার আগে কাজ সংক্রান্ত লিখিত দলিল এবং আইডি কার্ড থাকতে হবে যার মাধ্যমে তারা যেকোনো মৌখিক, শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইনী সাহায্য পাবেন।

এই আইন এখনো পাশ হয় নাই, কিন্তু আমি এই আইনের পক্ষে দরকার হইলে পিটিশ্যান জোগাড় করতে রাজি। আমার ফেইসবুকে আইন বা এই নিয়া যারা কাজ করেন, তারা দয়া কইরা আওয়াজ দিয়েন। আয়শা লতিফের মতো কুৎসিত এবং ক্ষমতাবান যৌনবিকারগ্রস্থ অসুস্থ শিশুনির্যাতক অমানবিক পুরুষতান্ত্রিক নারী তার স্বামীর আর্মিত্বর কারণে যাতে বিচারপ্রক্রিয়া এড়াইয়া না যাইতে পারেন, সেই নিয়া সচেতন থাকা জরুরী।

আর আপনারাও, যাদের আয়শা লতিফের মতো নোংরা চেহারা এখনো ফেইসবুক বা পত্রিকায় উইঠা আসে নাই, যারা নিয়মিত বিরতিতে গোপনে গোপনে কাজের লোক নির্যাতন কইরা আসতেছেন, তাদের সুবিধা বঞ্চিত করতেছেন, তারা সাবধান হইয়া যান। সামনের দিন আপনাদের জন্য সুবিধার না। এতোদিন সস্তায় কাজের লোক পাইয়া আপনার নিজের গু-মুত, আপনার বাচ্চার গু-মুত, আপনার বাপ মায়ের গু-মুত খুব আরেকজনরে দিয়া সকাল বিকাল ধোওয়াইছিলেন, এখন গৃহকর্মী আইন বাস্তবায়ন হইলে আর গার্মেন্টস সেক্টরে আপনাদের কাজের লোকেরা টাটা-বাইবাই-খোদা হাফেজ ম্যাডাম-খোদা হাফেজ স্যার বইলা ট্যাংট্যাঙ্গাইয়া চইলা যাইতে থাকলে নিজের গু-মুতের মধ্যে মুখ দিয়া পইড়া কাইন্দা কূল পাইবেন না। সুতরাং সাবধান হোন।

ডিয়ার আয়শা লতিফ, আমি প্রতিশোধপরায়ণ না। তাই আপনার পেটে যেই সন্তান আসতেছেন, তার ভাগ্য যেন সাবিনার মতো না হয়, সেই কামনা করি। আপনি মানসিকভাবে সুস্থ হোন, সুস্থভাবে বাচ্চা জন্ম দেন এবং এরপর অন্ততঃ এক বছর জেলে পঁচেন, এই কামনা করি।

এ সংক্রান্ত খবরের লিংক: https://womenchapter.com/views/21529

শেয়ার করুন:
  • 992
  •  
  •  
  •  
  •  
    992
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.