কন্যা, স্বপ্নের হাত ধরো শক্ত করে

0

সাবরিনা শারমিন:

ঝর্ণা। ঝর্ণা উঠোনে দাঁড়িয়ে কেঁদেই চলেছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। কখনও বা বৃষ্টির মতো অঝোরে কাঁদছে। ফুটবল টিমের লোকজনরা চলে গেছে। ঝর্ণার বাবা অনুরোধ করে, একেবারে হাত জোর করে তাদেরকে বাড়ি থেকে বিদায় করেছেন। উফফ! কী যে হয়েছে আজকাল লোকজনের! বাড়ি পর্যন্ত চলে এসেছে তার মেয়েকে নিতে।

ঝর্ণা রাজশাহী যাবে ফুটবল খেলতে! এও কী সম্ভব! বাবার চোখেমুখে বিরক্তির রেখা স্পষ্ট। এমনিতেই ডানপিটে এই মেয়ের জন্য গ্রামে মুখ দেখানো মুশকিল হয়ে গেছে। তার উপর ফুটবল খেলতে অত্তোদূর যাওয়া! গ্রামের লোক টিকতে দেবে! ঝর্ণার বাবা অনর্গল বকেই চলেন। ঝর্ণার কান্না থামছেই না। তার স্বপ্ন ভেঙ্গে গেছে। বুকের ভেতরটা হাহাকার করছে। বিভাগীয় পর্যায়ে ফুটবল খেলা। এমন সুযোগ জীবনে সে আর পাবে না। ঝর্ণার মা পাথরের মূর্তি হয়ে সব দেখে। কাউকে কিছু বলে না। না মেয়েকে, না স্বামীকে।

গ্রামের উচ্চ বিদ্যালয়টির কিন্তু গর্বের শেষ নেই ঝর্ণাকে নিয়ে। সে ইতিমধ্যেই স্কুল টিমকে কয়েকটি শিল্ডসহ স্বীকৃতি এনে দিয়েছে। খেলাধুলার জন্য স্কুলটিকে দশ গ্রামের লোক জানে সে তো তার জন্যই। অন্ধ গ্রামে আলো হয়ে জন্মানো ঝর্ণা তাদের অহংকার। তাইতো তারা চেয়েছিলো মেয়েটি আরো বড় পরিসরে যাক, আলো ছড়াক সবখানে। অজ: পাড়া-গাঁয়ের স্কুল ফুটবল টিমটি যখন বিভাগীয় পর্যায়ে খেলার সুযোগ পেল, তখন স্কুল কর্তৃপক্ষের আনন্দ ও গর্বের সীমা রইলো না। তাইতো ছুটে গিয়েছিলো ঝর্ণার পরিবারের কাছে অনুমতি নিতে। পরিবারের অনুমতি মানে আসলে শুধু বাবার অনুমতি। অনুমতি মেলেনি। স্কুল টিমেরও আর যাওয়া হলো না ম্যাচ খেলতে। কীভাবে যাবে! ঝর্ণাই যে তাদের টিমের প্রধান খেলোয়াড়।

ছোটবেলা থেকেই ঝর্ণা ডানপিটে। গ্রামের লোকেরা তিরস্কার করে বলে, “ব্যাটা (ছেলে)”। মেয়েরা নয়, ছেলেরাই তার খেলার সাথী। কেনই বা হবে না! মজার মজার খেলাগুলো তো সব ছেলেরাই খেলে। গ্রামের বালিকারা কি রিক্সাভ্যান চালায়? গাছের মগডালে ওঠে? ফুটবল খেলে? গান গায় গলা ছেড়ে?

নাহ্! এমন দৃশ্য সহজতর নয়। কিন্তু গ্রামের বালকরা এ সবকিছুই করে। তাদের কোনো বাধা নেই, তিরস্কার নেই। বালিকা ঝর্ণা, কন্যা ঝর্ণারও এসব করতে ভালো লাগে। তাই বালকরা, গ্রামের পুত্ররা তার খেলার সাথী। গ্রামের মানুষের নিন্দা বা তিরস্কার এতোদিন পর্যন্ত তার স্পোর্টিং স্পিরিটকে দমন করতে পারেনি। পারেনি বলেই গ্রামের স্কুলটিকে সে গৌরব এনে দিতে পেরেছিলো।

কিন্তু অনগ্রসর জীবন ও সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা গ্রামের মানুষরা তাকে নিয়ে গৌরব বোধ করেনি। তারা ঝর্ণার পরিবারকে তিরস্কার করেছে, সতর্ক করেছে। ঝর্ণার বাবা তাই সাহসী হননি। ঝর্ণার ভাইটিও তার সঙ্গে নেই। ফুটবল খেলবে ছেলেরা, বোনের এখানে কী? মাঝপথে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে ভাঁজ মেরে ঘুরে বেড়ানো ভাইটিও বাবার সঙ্গে, গ্রামের মানুষের সঙ্গে সুর মেলায়।

আমার সামনে ঝর্ণার মা। আমার সামনে ঝর্ণা। ঈদের একদিন পর গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলাম একবেলার জন্য। বাবা-দাদাসহ পরিবারের পূর্বসূরীদের কবর যিয়ারত করতে প্রায় প্রতি বছরই যাওয়া হয়। আত্মীয়-স্বজন, গ্রামের অন্যদের সঙ্গে গল্প করছি। আম্মা বললের, ঝর্ণার মা আসছে তোর সাথে কথা বলতে।

ঝর্ণাকে নিয়ে, ঝর্ণার মাকে নিয়ে আমাদের ঘরে বসি। ঝর্ণাকে এই প্রথম দেখলাম। ট্র্যাডিশনাল ব্যাকরণে ছিপছিপে চেহারার সুন্দরী এক কিশোরী। দশম শ্রেণিতে পড়ে। আমায় দেখে ম্লান হাসে। ঝর্ণার মা এক নিঃশ্বাসে মেয়ের কথা বলে চলে। ঝর্ণার আহ্লাদের কথা, স্বপ্নের কথা, স্বপ্ন পূরণে বাধার কথা বলে। আমি চুপচাপ শুনি। মুগ্ধ হয়ে দেখি এক মায়ের ভেতরের আকুতি, তার আত্মবিশ্বাস ও শক্তি। ভাবি, ঝর্ণার মতো ঝর্ণার মায়েরও কি স্বপ্ন ছিলো একদিন? যে স্বপ্ন কিশোরী বয়সেই ভেঙ্গে গেছে। আজ এক মা তার মেয়ের স্বপ্নখেয়ার কাণ্ডারি হতে চায়, মেয়ের স্বপ্নের হাল ধরতে চায়। মেয়ের স্বপ্নকে পৌঁছে দিতে চায় গন্তব্যে।

এর আগে সে বড় মেয়ে মিতালীর স্বপ্ন গুঁড়ো গুঁড়ো হতে দেখেছে। লেখাপড়ায় ভালো হওয়া সত্ত্বেও তাকে বিয়ে দেওয়া হয়েছে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার আগেই। লেখাপড়া সেখানেই থেমে গেছে। ছোট মেয়ের ক্ষেত্রে সে তা চায় না। ঝর্ণার বিয়ের প্রস্তাব আসতে শুরু করেছে। বড্ড ভয়, ডানপিটে ঝর্ণাকে কখন না জানি বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য করা হয়। ঝর্ণা লেখাপড়া করতে চায়। বড় হতে চায়। ফুটবল তার ভালোবাসা, তার ধ্যান। ফুটবলার হতে চায় সে। কিন্তু মা ছাড়া আর কাউকে পাশে পায়নি সে।

আমি তার গ্রামেরই মেয়ে। তার দূর সম্পর্কের আত্মীয়া, আপা। স্বপ্ন পূরণের নৌকায় ঝর্ণা আমাকে পাশে পেতে চায়। তাই ছুটে এসেছে। সাহস পেতে চায়। সমর্থন পেতে চায়। আর পেতে চায় আশ্বাস। না বলি কি করে! আমি যে ওর গ্রামের মেয়ে। ওর আপা। আমাকেও কি কিছু কম পথ পাড়ি দিতে হয়েছে!

স্বপ্নবাজ হবার জন্য, নিজের মতো করে বাঁচবার জন্য সব মেয়েকেই পাড়ি দিতে হয় দীর্ঘ বন্ধুর এক পথ। ঝর্ণাকে বলি, তোমার স্বপ্নের হাতটা ধরো শক্ত করে। আমরা সঙ্গে আছি। পাশেই আছি।

লেখক: উন্নয়নকর্মী

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ১,৪৬৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.