টেরি গোবাঙ্গা একটি সাহসী নাম

0

রামিছা পারভীন প্রধান:

দৈনিক প্রথম আলোর মাধ্যমে জানতে পারলাম যে কেনিয়ার একটি মেয়ে টেরি গোবাঙ্গা, যার হ্যারির সাথে বিয়ে হওয়ার কথা যেদিন, সেদিনই তাকে গণধর্ষণের শিকার হতে হয়। গণধর্ষণের পর তাকে পেটে ছুরিকাঘাত করা হয়। হসপিটালে মৃত্যুর সাথে লড়াই করে সে বেঁচে যায়। কিন্তু চিকিৎসক জানান, ছুরির আঘাতে তার গর্ভাশয় নষ্ট হয়ে গেছে, সে কোনদিন মা হতে পারবে না।

এই ঘটনার সাত মাস পরে ২০০৫ সালে সেই হ্যারির সাথে তার বিয়ে হয়। টেরিকে অবাক করে দিয়ে বিয়ের ২৯ দিনের মাথায় হ্যারি এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়। টেরির জীবনে নেমে আসে চরম হতাশা। মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন তিনি। সে সময় তার জীবনে হাত বাড়িয়ে দেন টনি গোবাঙ্গা। সবকিছু জেনে তিনি তাকে বিয়ে করতে চান। বিয়ের এক বছর পর চিকিৎসকের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, তিনি মা হতে যাচ্ছেন।

এখন তার দুই মেয়ে। এখন তার সুখের সংসার। এই টেরি গোবাঙ্গা এখন ধর্ষণের শিকার নারীদের নিয়ে একটি সংগঠন করেছেন, যেখানে তাদের আশার আলো দেখানো হয়, প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়, নানা সহায়তা দেওয়া হয়।

বাস্তব এই গল্পটার উপরের অর্ধেক অংশ পড়ে আমার মনে হয়েছে এটা বাংলাদেশের কোন চিত্র। কারণ আমাদের দেশে নারীরা ক্রমাগত ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। শুধু আমাদের দেশে নয়,আমাদের পাশ্ববর্তী দেশে ভারতেও একই অবস্থা। কিন্তু এই ঘটনাটা হচ্ছে আফ্রিকা মহাদেশের একটি দেশ কেনিয়ায়। এজন্যই হয়তো আমি একটু অবাক হয়েছিলাম।

তার মানে পৃথিবীর সব দেশেই নারীরা নির্যাতিত। সেখানেও টেরিকে বিয়ের পর যখন তার স্বামী ২৯ দিনের মাথায় মারা যায়, তখন তাকে অভিশপ্ত বলা হয়েছে, কাউকে তার সাথে মিশতে দেওয়া হয়নি। আমাদের দেশেও নব বিবাহিত মেয়ের যখন স্বামী মারা যায় তাকেও অশুভ, অলক্ষী, এরকম নানান অনেক কটু কথা শুনতে হয়। কিন্তু একজন সদ্য বিবাহিত পুরুষের যখন বউ মারা যায় তখন তাকে এসবের সম্মুখীন হতে হয় না। দেশ যত উন্নত আর অনুন্নত হোক সব দেশেই নারীদের দু:খ কষ্টগুলো প্রায় এক।

এখন আসি গল্পটার দিত্বীয় অংশে, যেখানে টেরি গোবাঙ্গের ঘুরে দাঁড়ানোর পিছনে ছিল দুজন মহান পুরুষের আর্বিভাব, একজন হ্যারি আর অন্যজন হলো টনি গোবাঙ্গা। তারাই তার জীবনে আলো নিয়ে এসেছিল। আর এই অংশটির সাথেই আমাদের দেশের চিত্রের সাথে আমি মিল খুঁজে পাইনি। আমার জানা মতে, আমাদের দেশে কোনো মহান পুরুষ স্ব-ইচ্ছায় ধর্ষণের শিকার কোনো নারীকে বিয়ে বা ভালবাসার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে বলে আমার মনে হয় না। বরং পারলে আমাদের দেশের ফতোয়াবাজরা নির্যাতিতা মেয়েটিকে নির্যাতক ধর্ষকের সাথে বিয়ে দিয়ে সমস্যার সমাধান করে ফেলে। শুধু তাই না, নির্যাতিতকে অনেক অপবাদ দিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতেও বাধ্য করা হয়। এ সমাজে বড় কঠিন সমাজ। কোনকিছুই মেয়েদের পক্ষে সায় দেয় না। পুরুষতান্ত্রিক নারীরাও একটি মেয়ের জীবন ধ্বংস করে দিতে সদাপ্রস্তুত।

টেরি গোবাঙ্গা সত্যিই একজন সাহসী নারী । তিনি একজন অনুপ্রেরণাকারী । তার কথাটাই বলি, ঘটনার জন্য তিনি দায়ী নন, বরং তিনি ঘটনার শিকার। আর এজন্যই তিনি অন্ধকারকে ফেলে দিয়ে আলোর পথে হাঁটতে পেরেছেন। সত্যিই তো আমাদের দেশে এই রকম নির্যাতিত মেয়েরা শুধুমাত্র ঘটনার শিকার হয়। তাই তারা যেন নিজেকে দায়ী না ভেবে টেরি গোবাঙ্গের মতো ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। জীবন অনেক সুন্দর, এবং একটাই, কাজেই যে দোষ বা যে অন্যায় তিনি করেননি, অন্যের অন্যায়ের দায়ভার কেন তিনি নেবেন? তাদেরকে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে হবে এবং স্বপ্ন দেখাতে হবে এই সমাজকে ।

বি: দ্র: ছবি প্রথম আলো থেকে সংগৃহীত

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

লেখাটি ১,৩৪৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.