‘আমার সম্মান আমার যোনিতে কে রেখেছে?’

0

শর্বাণী দত্ত:

দুএক মাস আগে বাংলাদেশে একইসঙ্গে অনেক কটা রেপ কেস আলোয় এসেছিলো। না, আলোয় এসেছিলো বলেই ভিক্টিমরা আলোর মুখ দেখেছে এমনটা নয়। এতো সহজ বোধহয় আমাদের উপমহাদেশীয় সমাজ ব্যবস্থায় কোনো রেপ ভিক্টিম মেয়ের জীবন কখনওই ছিল না। আজ হঠাৎ পুঁজিবাদী পুরুষদের দয়ায় মেয়েরা এক আধটু রাস্তায় বেরোনোর বা পছন্দমতো পোশাক পরার স্বাধীনতা পেয়েছে বলে তাদের এতোদিনের গড়ে তোলা ব্যবস্থায় চিড় ধরে যাবে, এত দুর্বল এটি নয়।

যাই হোক, আমি ইচ্ছে করে এ ব্যাপারে তখন কিছুই বলিনি। এখন যখন অন্যান্য নানা ইস্যুর তলায় ওগুলো ঢাকা পড়ে গেছে, এখনই তাই আবার সবাইকে একটু মনে করিয়ে দিতে ইচ্ছে হলো। 

ধর্ষণ একটা সিরিয়াস ক্রাইম। নি:সন্দেহেই। কারো ইচ্ছের বিরুদ্ধে তার শরীরটাকে খেলনাপাতির মতো দুমড়ে মুচড়ে তাণ্ডব চালানো, তাকে শারীরিক ও মানসিক দুভাবেই ট্রমাটাইজ করা, এ অপরাধের ক্ষমা হতে পারে না।

কিন্তু আমার প্রশ্নটা হলো, এই যে ধর্ষণের গোটা একটা কনসেপ্ট- “একজন মেয়ের সঙ্গে বলপূর্বক যৌনমিলন, সোজা কথায় তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে তার সঙ্গে সঙ্গম বা ইন্টারকোর্স করা এবং তার মাধ্যমে মেয়েটিকে যতটা না শারীরিক তার চেয়ে বেশি মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয়া, সামাজিকভাবে ‘হেয়’ করা (কারণ সে আর ভার্জিন নয় বা পরপুরুষের সঙ্গে তার যৌনতার অভিজ্ঞতা হয়েছে), তাকে আর দশটা মানুষ থেকে আলাদা করে ফেলা কারণ সে একটা ক্রাইমের ভিক্টিম হয়েছে” এই কনসেপ্টটাই বা ঠিক কতটা মেয়েদের জন্য?

একজন মেয়ের যখন ধর্ষণ হয়, আমরা বলি ‘ওর জীবন শেষ হয়ে গেলো’, ‘সব সম্মান কেড়ে নিলো’। একটা সময় পর্যন্ত আমিও এভাবেই ভাবতাম। এভাবেই রেপ ভিক্টিমের প্রতি সহানুভূতি দেখাতাম। এরপর একদিন এটা খেয়াল করা শুরু করলাম যে একজন মেয়ের জীবনে কখনো একবার ধর্ষণ হয় না। যে একবার ধর্ষিত হয়, সে এরপর আরো কোটিখানেক বার ধর্ষিত হয়। একজন ধর্ষক হয়তো তখন জেলের ভেতর।

কিন্তু এ সমাজের অলিতে গলিতে যে ধর্ষক, মেয়েটির বাড়িতে যে ধর্ষক, তার পরিবার-প্রতিবেশীর মধ্যে যে ধর্ষক তাদের জেলে ঢোকানো সম্ভব নয়। এরা ওই ঘৃণ্য অপরাধের শিকার হওয়া মেয়েটিকে উঠতে বসতে ধর্ষণ করে। তাদের বোকাবোকা সহানুভূতি মেয়েটিকে দিবারাত্রি ধর্ষণ করে। ‘এখন তোমার কি হবে?’, ‘সম্মান শেষ মেয়েটার’, ‘কে বিয়ে করবে আমাদের মেয়েকে?’ এগুলো ধর্ষণের প্রতিবাদ নয়, বিশ্বাস করুন। এগুলোর নাম ‘কথার ধর্ষণ’। এগুলোর নাম পিতৃস্নেহের প্যাকেটে মোড়া পিতৃতান্ত্রিক বর্বরতা।

ধর্ষণের রাষ্ট্র নির্ধারিত সংজ্ঞা হিসেবে, ‘জোরপূর্বক ইন্টারকোর্স’ না হলে তা ধর্ষণ নয়। অর্থাৎ আমার শরীরের ওপর ঝড় বইয়ে যাবে যাক, আমার যোনি অক্ষত থাকলেই আমি ধর্ষিত হইনি। আমার শরীর নিয়ে যা খুশি করুক, ইন্টারকোর্স না করলেই সে আর ধর্ষক নয়। অতএব তার শাস্তিরও প্রয়োজন নেই। তাহলে রাষ্ট্রের আপত্তির মূল জায়গাটা কোথায় বলুন তো? কুমারিত্ব কেড়ে নেয়ায়। মানে ঘুরেফিরে মেয়ের ভার্জিন থাকা কিংবা ‘একমাত্র স্বামীরই সম্পত্তি’ থাকাটাই আসল ব্যাপার। ঘটনার শিকার মেয়ের মানসিক বা শারীরিক যন্ত্রণা, আতঙ্ক, ব্যথা এখানে গৌণ। 

‘রেইন ট্রি’ হোটেলে মেয়ে দুটোর রেপ হওয়ার পর কথা উঠেছিলো ‘ওরা নিজেরাই বা কেমন মেয়ে? রাতবিরেতে যে মেয়ে পুরুষ বন্ধুর সঙ্গে হোটেলে যায় সে মেয়ে নিশ্চয় ভালো মেয়ে নয়।’ এ প্রশ্নটা যারা করেছেন তাদের বক্তব্যের ভেতরের কথা হলো রাত্রিবেলা দুজন মেয়ে তাদের অন্য ছেলেবন্ধুদের সঙ্গে পার্টি করার অর্থ তারা সে বন্ধুদের সঙ্গে শুতে গিয়েছিলো। কারণ রাতের পার্টি মানেই নিশ্চয় ‘শোয়া’। আর শোয়া মানেই কি তা তো বলে দিতে হয় না। এখন আমি কি করে সে মানুষগুলোকে এটা বোঝাই যে, ‘ভালো’ ‘খারাপ’ এক অত্যন্ত আপেক্ষিক বিষয়। কারো লাইফস্টাইল দিয়েই আমরা তার চরিত্র ভালো বা মন্দ বলতে পারি না যতক্ষণ না সে অন্য কাওকে এক্সপ্লয়েট করছে। এগুলো লোকের ব্যক্তিগত স্পেস। একটি রেপ কেসে অভিযোগকারিনীর জীবনযাপনের ঢঙ নিয়ে প্রশ্ন তোলাটাই তাই অপরাধ। সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক। কারণ কেউ ‘কেনো’ ধর্ষিত হলো তার কোনো কনক্রিট উত্তর হয় না।

তাছাড়া আমাদের সমাজে তো আবার ‘বাঙালি সংস্কৃতির’ দোহাই দিয়ে ক্রমশ গড়ে উঠছে ধর্ষণের সংস্কৃতি। ‘এ পোশাক আমাদের কালচার নয়’, ‘এ সময়ে আমাদের দেশের ভদ্র বাড়ির মেয়েরা বাড়িতে থাকে’ ‘এসবের জন্যই রেপ হয়’। এসব আলোচনা অনেক পুরনো হয়ে গেছে, জানেন তো?

আমাদের পূর্বাঞ্চলীয় রক্ষণশীল সংস্কৃতির নাকের ডগা দিয়ে ঘটে গেছে হাজার হাজার ধর্ষণ। পর্দানশীন মেয়েরাও রক্ষা পায়নি, শিশুর সদ্য ফোটা যোনিপথ দেখেও লালসা হয়েছে বহু উল্লুকের। দিব্যি বাড়ির ভেতর আটপৌরে ঘরোয়া মেয়েটির রেপ করেছে নিজের লোক। দিনশেষে এই দেখা গেছে যে, ধর্ষণ একটি মানসিকতা।

এটি কেনো করা হচ্ছে, কি ভেবে করা হচ্ছে, কাদের করা হচ্ছে, কাদের করা হচ্ছে না তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। আর কূপের বাইরে বেরিয়ে একটু চারিদিকে দেখলে এও বোঝা যাবে যে, এমন অনেক লোকই আছে যারা রাত্রিবেলা পার্টি করলেই ‘শোয় না’। ‘শুলেই’ সঙ্গম করে না। সুতরাং কেউ যদি কারো সঙ্গে রাত্রিযাপনও করে, তার ‘হ্যাঁ’ ‘না’ এর তোয়াক্কা না করে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন তা ধর্ষণই। অন্য কিছু নয়।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ১৭,০১৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.