পার্বত্য চট্টগ্রাম: রাজনীতির মারপ্যাঁচে দেশহীন এক জনপদ (পর্ব – ৪)

শাশ্বতী বিপ্লব:

১৯৪৭ সালের আগস্টে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বন্দুকের মুখে ভারতীয় পতাকা নামিয়ে নিলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের নৃগোষ্ঠীদের পার্টিশান বিরোধী উদ্দীপনা দমানো যায়নি। ভারতীয় নেতারাও তাদের পার্টিশান পূর্ববর্তী আবেগ ধরে রাখেন। 

পার্টিশানের দুবছর পর ভারতের কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী সরদার বল্লভ ভাই পাটেল পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আপনারা যারা আমাদের পরিবার/ আত্মীয় (flesh and blood), যারা আমাদের মুক্তির সংগ্রামে আমাদের হয়ে লড়াই করেছেন, তারা শুধুমাত্র দাগের অন্য পাশে বাস করার কারণে হঠাৎ করে আমাদের কাছে ভিনদেশী হতে পারেন না।“ (Singh  2003; 508) পাকিস্তান সরকার যখনই বুঝতে পারলো পার্টিশানের পরও ভারত নৃগোষ্ঠীর নেতাদের মধ্যে সুসম্পর্ক বিদ্যমান, তখনই তারা সেটা বন্ধের উদ্যোগ নিলো।

পাকিস্তান সরকার একটি সেটেলমেন্ট প্ল্যান অধ্যাদেশ ঘোষণা করে এবং পার্বত্য অঞ্চলে বাঙ্গালী জনগোষ্ঠী বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। এতে একদিকে পার্বত্য অঞ্চল পুনরায় ভারতের রাজ্যভুক্ত হওয়ার ঝুঁকি কমে, অন্যদিকে বাঙ্গালীদের মধ্যে পার্বত্য অঞ্চল উন্মুক্ত করে দেয়ার যে দাবি উঠেছিলো সেটা মেনে নেয়া হয়।

১৯৬০ এর শেষ থেকে ১৯৭০ এর শুরু পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার মোটামুটি সকল সরকারি নৃগোষ্ঠী কর্মকর্তাদের পূর্ব পাকিস্তানের অন্য অংশে বদলী করে। এবং বাঙ্গালীদের পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রশাসনের দায়িত্বে বসায়। কৌশলগত কারণে অধিকাংশ বাঙ্গালী ভারতের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে বসবাস শুরু করে যাতে ভারতের সাথে নৃগোষ্ঠীর নিয়মিত যোগাযোগ আটকানো যায়।   

সেসময় ভারত, আমেরিকা তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন (former USSR) এর মতো বৈশ্বিক আঞ্চলিক পরাশক্তির সম্পৃক্ততা পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে করে তোলে। পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নেয়। ভারত সোভিয়েত ব্লকের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থানকে শক্ত করার উদ্দেশ্যে এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

১৯৫৬ সালে নাগা ন্যাশনাল আর্মি (নাগাল্যান্ডের নৃগোষ্ঠীদের গেরিলা সংগঠন) ভারতের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করলে পাকিস্তানের গোয়েন্দা বাহিনী আইএসআই তাদের অস্ত্র আশ্রয় দিয়ে সহযোগিতা করে, যা কিনা পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে পরিচালিত হতো। পরবর্তীতে মিজো গেরিলা যোদ্ধারাও আইএসআই থেকে একই রকম সহযোগিতা পায় এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের রুমা, বলিপাড়া, মোদাক এবং থানচির দুর্গম এলাকা থেকে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। পরবর্তীতে চীনও এই গুপ্ত অপারেশনের যোগ দেয়।

এভাবে ১৯৫০ এর দশকে ঢাকা এই উপমহাদেশের কম্যুনিজমের বিরুদ্ধে সিআইএ এর কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং এখান থেকেই যুক্তরাষ্ট্র চীনের বিরুদ্ধে গুপ্ত অপারেশন পরিচালনা করে। পাকিস্তান এই কৌশলগত সহযোগিতার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিপুল সামরিক সহায়তা লাভ করে। 

 (চলবে)

পর্ব – ৩ এর লিংক: https://womenchapter.com/views/21303

পর্ব – ২ এর লিংক: https://womenchapter.com/views/21196

পর্ব – ১ এর লিংক: https://womenchapter.com/views/21068 

শেয়ার করুন:
  • 81
  •  
  •  
  •  
  •  
    81
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.