ভালবাসার মানুষটি যদি প্রেমিক পুরুষ না হয়!

0

কাজী তামান্না কেয়া:

আমেরিকায় মাস্টার্স করার সময় আমার প্রোগ্রামে বিভিন্ন দেশের ছেলেমেয়ে ছিল। ক্লাসের ৩১ জন ছাত্রছাত্রী ১১ টা ভিন্ন ভিন্ন দেশ থেকে এসেছিল। এদের মধ্যে সিরিয়া থেকে আসাদ (ছদ্ম নাম) নামে একটা ছেলে আমার খুব ভাল বন্ধু হয়েছিল। বন্ধু মানে স্রেফ বন্ধু- এখানে পুরুষ বা নারী কোন ফ্যাক্টর না।

আসাদ তার প্রেম, লেখাপড়া, পরিবার সবকিছু নিয়ে কথা বলতো আমার সাথে। ক্লাসের আফগানি মেয়ে প্রজাপতির সাথে তার প্রেম হয়ে যায়। মেয়েটির নামের অর্থ আফগান ভাষায় প্রজাপতি। মেয়েটি যেমন সুন্দর, তেমন পড়াশোনায় ভালো, মন খোলা, হেসে কুটিকুটি হতে জানে- এককথায় প্রজাপতির মতোই তার চলন বলন। আসাদ এর আগে ছোটোখাটো প্রেম করলেও কোন প্রেমই টেকেনি। প্রজাপতির সাথে প্রেমটিকে তার এবার চাই-ই চাই।

এইক্ষণে বলে রাখি, আসাদ  পেশায় ডাক্তার, ৩৭ বছর বয়সে ভার্জিন এবং তা নিয়ে কিঞ্চিত গর্বিত। মেয়েটিকে সে এসাইনমেন্ট করে দেয়, শপিং, বাজার এসব করতে সাহায্য করে। মোট কথায়  বন্ধু বা বয়ফ্রেন্ড হিসেবে সব ধরনের সহযোগিতা করে, মাঝে মাঝে এদিক সেদিক হাঁটতে যায় এবং বিয়ে করার জন্যে এক পায়ে খাড়া টাইপ অবস্থা।

প্রজাপতির একজন বয়ফ্রেন্ড আছে আফগানিস্তানে। সে সেখানকার আমেরিকান অ্যাম্বাসিতে চাকরি করে।  প্রজাপতি তাকে ফোন করে, কথা বলে। কিন্তু বয়ফ্রেন্ডের সস্তা মন মানসিকতার জন্যে তাকে ঠিক অন্তরে ধারণ করে না। আমেরিকায় লেখাপড়া করতে আসার জন্যে ওর যখন টাকার দরকার হয়েছিল, অন্য একজন পুরুষ বন্ধু বা অভিভাবক টাকাটা প্রজাপতিকে ধার  দিয়েছিল, তার বয়ফ্রেন্ড নয়। এসব নানাবিধ কারণে বয়ফ্রেন্ডের প্রতি এক ধরনের দূরত্ব মেনে চলছিল। তবে মূল কারণটা ছিল বয়ফ্রেন্ডের পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব।

আসাদের সাথে প্রজাপতি ঘুরে বেড়ায়, লেখাপড়া করে, মনে মনে বন্ধু হিসাবে বা প্রেমিক হিসাবে পছন্দ করে। দেখতে দেখতে উইন্টার ব্রেক শুরু হল। আমার বাসায় পার্টি। বাসা মানে স্টুডেন্ট হাউজ। ছয় দেশের ছয় জন ছেলেমেয়ে মিলে থাকি। সবাই কিছু কিছু বন্ধু দাওয়াত দিল। খাবার দাবার, বিয়ার, মিউজিক এসব করে পড়াশুনার চাপ থেকে খানিক মুক্তি লাভ করাই উদ্দেশ্য।

নাচ পর্ব শুরু হলো। একেক দেশের জনপ্রিয় মিউজিক ছাড়া হচ্ছে, সবাই হৈ হৈ করে উঠছে। দুলে দুলে কম বেশি সবাই নাচছে, শুধু আসাদ বসে আছে এক কোনে আর প্রজাপতির নাচ দেখছে। নাহ, সে আসলে মুগ্ধ নয়নে নাচ দেখছে না, সে লক্ষ্য রাখছে কোনো ছেলে প্রজাপতির সাথে গা ঘেঁষে নাচে কীনা। নাচের ফাঁকে ফাঁকে কেউ কেউ হয়তো প্রজাপতির দিকে এক আধবার হালকা ঝুঁকে পড়ছে, কিন্তু সেটা কোনো খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে নয়, বরং নাচতে নাচতে একজন আরেক জনের কাছে চলে আসা বলা যেতে পারে। আমি নাচ বলতে যা বোঝায় সেসব মুদ্রা জানি না, তবে মিউজিকের তালে তালে হাত-পা দোলাই, কারণ নাচ এক ধরনের টনিক, রিল্যাক্সেসনের জন্যে বেশ উপকারি, এইজন্যে।  

হঠাত দেখি আসাদ উঠে চলে যাচ্ছে। তার আর ভালো লাগছে না, বাসায় যাবে। এই শীতের রাতে প্রজাপতিকে না বলেই সে বেরিয়ে গেল। আসাদ আসলে অন্য ছেলে বন্ধুরা নাচতে নাচতে প্রজাপতির কাছে চলে আসছে, এই দৃশ্যটা মেনে নিতে পারছে না। নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করার মতো, সে তাই আসর ছেড়ে চলে যেতে চাচ্ছে। প্রজাপতি সবই বুঝতে পারছে। এমন হীনমন্য পুরুষ  জীবনে সে প্রথম দেখছে না। তার বয়ফ্রেন্ড আর আসাদের মধ্য পুরুষালি দৃষ্টিভঙ্গির মিলটা তার চোখ এড়াচ্ছে না কিছুতেই।

শেষের দিকে প্রজাপতি নিজের বাসা ছেড়ে দিল। লেখাপড়া শেষ, আর সাতদিন পরেই সে দেশে যাবে। সাতদিনের জন্যে এক মাসের ভাড়া দেয়ার কোনো মানে হয় না। নিজের বাসা ছেড়ে দিয়ে আসাদের রুমে উঠলো। সাত দিন দুটি প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়ে একসাথে থাকলেও আসাদ প্রজাপতির মন বা শরীর কিছুই জয় করতে পারলো না। কারণ আর কিছুই নয়, আরব পুরুষের পুরুষতান্ত্রিক আচরণ থেকে আসাদ পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি।  

যদিও সে অনেকখানি ব্যতিক্রম ছিল অন্য আরব পুরুষদের তুলনায়। প্রজাপতির স্কার্ট, টপস, চোখের কাজল, বড় কানের দুল, হিজাববিহীন চলাফেরায় আসাদের কোনো সমস্যাই ছিল না। তবু, প্রজাপতি আসাদের সাথে থাকার সময়ে পুরোপুরি শ্বাস নিতে পারতো না। এ যেন আশি ভাগ ভালবাসা, আর বিশ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করা একটা সম্পর্ক। সামাজিক মেলামেশায় বাধা দেয়াও একটি চরম পুরুষতান্ত্রিক আচরণের বহিঃপ্রকাশ, যার কারণ মূলত হীনমন্যতাই।

বাংলাদেশের অধিকাংশ পুরুষ আর আসাদের এই হীনমন্য আচরণের মধ্যে আসলে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। আসাদের মতো আমাদের পুরুষগুলির মেয়েদের সাথে মেলামেশার সময় মেয়েটির ব্যক্তি স্বাধীনতার দিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন। অনেক মেয়েও একই আচরণ করে। সঙ্গীকে কারো সাথে মিশতে দিতে চান না।

আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রতিটি মানুষ আলাদা। তাদের নিজস্বতা থাকবেই। পারসোনাল স্পেস বলে একটি শব্দ আছে। কেউ হয়তো নাচতে পছন্দ করে, কেউ হয়তো কারো সাথে কথা বলতে পছন্দ করে, কেউ হয়তো সাজতে বা নতুন পোশাক কিনতে পছন্দ করে।

এর বাইরে আছে অন্য পুরুষ এবং অন্য নারীর সাথে কথা বলা বা সামাজিক মেলামেশার অধিকার। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুরুষরাই এই উদারতাটুকু দেখাতে পারে না। আজকের মেয়েরা লেখাপড়া জানা মেয়ে, চাকুরি করা মেয়ে, বই পড়া মেয়ে। মা, খালাদের আমলে আসাদের বাবা কাকারা যে আচরণ করতো তাদের স্ত্রী বা সঙ্গীদের সাথে, আজকের যুগে তা অচল।

হে পুরুষ, ভালবাসা মানে প্রেমিকার নিঃশ্বাস চেপে ধরা নয়, তার অস্বস্তির কারণ হওয়া নয়। ভালবাসা মানে দুজনার সময় গুলি চোখের পলকে কেটে যাওয়া। জগত সংসারে আর কিছু নয়, ভালবাসার মানুষকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.8K
  •  
  •  
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.8K
    Shares

লেখাটি ৯,৮৬৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.