আমি সত্যিই একজন আতংকিত মা

0

রামিছা পারভীন প্রধান:

কয়েকদিনের ছুটিতে আমার আড়াই বছরের মেয়েটি একটু পর পর কাছে এসে গলা জড়িয়ে ধরে, কত কথা বলে, ‍আর একটু পর পর বলে, মা আজকে অফিসে যাবা না? আমি যখন বলি, যাবো না, কী যে খুশি হয়, তা বুঝাতে পারবো না। আমি অফিস শুরু করলে ‍সেই হাসিমাখা মুখখানা ‍আস্তে আস্তে মলিন হয়ে যাবে। আবার সে আগের নিয়মে ফিরে যাব। সে হয়তো এই নিয়ম পছন্দ করে না, কিন্তু আমরা বাবা মারাই তাকে এই জীবনযাপনে অভ্যস্ত করেছি।

সেদিন বুঝতে পারলাম যেদিন সেই ছোট্ট মেয়েটি আমাকে বলে, মা ‍আমাকে একটু বাইরে নিয়ে যাও। আমি বললাম, কেন? সে বললো, ‍আমি না একা একা থাকি, শুনে মনে হলো ‍আমার বুকের ভিতরে কেউ ছুরি মারলো। ‍কারণ মা পাশে থাকলে তার একা লাগে না, ভয় লাগে না।

আমার মেয়েটা একটু একটু করে বড় হচ্ছে, আর নানা আশঙ্কা মনের মধ্যে ঘুরপাক করছে। আমার মনে হয়, শুধু আমি না আমার মতো প্রত্যেক চাকরিজীবী মা ছেলে সন্তানের চেয়ে, মেয়ে সন্তানের জন্য বেশি দুঃশ্চিন্তা করে। কারণ চারপাশে যে অবস্থা তাতে একজন মায়ের কোলই হচ্ছে একটি মেয়ে শিশুর নিরাপদ স্থান।

আমার এক পরিচিতা আছে, তার একটি ছেলে সন্তান আছে, তার ও তার স্বামীর খুব শখ একটি মেয়ে সন্তানের, কিন্তু ইচ্ছে থাকলেও তারা নেওয়ার সাহস পায় না সামজিকতা ও পারিপার্শ্বিকতার ভয়ে। বলে, এখন যেসব ঘটনা ঘটছে, তাতে মেয়ে বড় করা খুব কঠিন। শুধু উনি নন, অনেক ‍শিক্ষিত মায়ের কাছে আমি এরকম কথা শুনেছি। তাহলে কী ‍আমাদের সমাজের উন্নয়ন হচ্ছে না! অবক্ষয় হচ্ছে! আমরা মেয়ে সন্তানের এই সমাজে নিরাপত্তা দিতে পারবো না বলেই মেয়ে সন্তান আশা করি না!

পত্রিকা পড়তেই আজকাল ভয় লাগে যখন শুনি পঞ্চান্ন বছরের একজন সাত বছরের একজন শিশুকে ধর্ষণ করে, দাদী তার ধর্ষণকারী ছেলেকে বাচাঁনোর নিজের শিশু নাতনিকে খুন করে। এরকম অসংখ্য ঘটনা আছে যা শুনে আমার মেয়ের মুখটা ভেসে উঠে। আমি চারদিকে অন্ধকার দেখি, আর এই সমাজকে ধিক্কার দিই। আর এজন্যই আমি সব সময় আতঙ্কে থাকি, আমি সত্যিই একজন আতংকিত মা।

কিছুদিন পরে আমার মেযেকে স্কুলে দিতে হবে ভেবে আমি এখন থেকে চিন্তিত। এতোদিন সে বাসায় ছিল, এখন সে বাইরের জগতের সাথে মিশবে, কে কেমন হবে, এখন আর সেই ভরসাটা আর নেই। কিছুদিন আগে শুনেছি ঢাকার এক নামকরা স্কুলে অফিস কর্মীর দ্বারা চার/পাঁচ বছরের শিশু যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। অনেক মা আছে বাচ্চাকে স্কুলে দিয়ে স্কুলের সামনে বসে থাকে, কিন্তু আমার পক্ষে তা সম্ভব নয়, কারণ আমি একজন চাকরিজীবী মা। আমাকে অফিসে থাকতে হয় মানে আমার মেয়ের আড়ালে থাকতে হয়। আর এই সময়টা আমাকে অনেক অজানা আশঙ্কায় পার করতে হয়। অনেকবার মনে হয় জবটা ছেড়ে দিবো কিনা, পরক্ষণে মনে হয় আমার ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই তো জবটা করছি। জব ছেড়ে দেওয়া মানে সব সমস্যার সমাধান না।   

বাসায় গৃহশিক্ষক ও হুজুর রেখেছেন মা, পাশে বসে কড়া নজরদৃষ্টিতে মেয়েকে পাহারা দিচ্ছে, একটু অসাবধান হলে অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটে যেতে পারে। আত্মীয়স্বজনের বাসায় বেড়াতে গেছেন, সেখানেও আপনার মেয়েকে চোখে চোখে রাখতে হয় । কারণ এই ছোট্ট মেয়েটিকে সাবধান করে দেওয়ার মত বয়স এখনও তার হয়নি।

আসলে আমাদের যাদের মেয়ে আছে আমরা সবাই কম বেশি চিন্তিত, মেয়ের বোঝার মতো বয়স না হওয়া পর্যন্ত আমাদের মায়েদের পাশাপাশি একজন বাবাকেও গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করতে হবে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সংসারে একটি মেয়েকে লড়াই করে টিকে থাকতে হয়। তাই এখন থেকে আমরা যেন মেয়েদের একটু প্রতিবাদ করতে শেখাই, যাতে ভবিষ্যতে এই সমাজে তারা যথাযথ মর্যাদা ও আত্মসম্মান নিয়ে টিকে থাকতে পারে।

শেয়ার করুন:
  • 520
  •  
  •  
  •  
  •  
    520
    Shares

লেখাটি ৩,৬০৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.