‘মেয়েটি বাঁচতে চেয়েছিল’

ফাহিমা কানিজ লাভা:

কলম্বিয়ান এই মেয়েটার নাম ওমাইরা সানচেজ গারসোন (Omayra Sánchez Garzón )। ১৯৮৫ সালের ১৩ নভেম্বর দেশটির আর্মেরো নামক স্থানে আগ্নেয়গিরির ভয়াবহ এক অগ্ন্যুৎপাতে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল, ধ্বংস হয়েছিল ১৩টি গ্রাম। ১৩ বছরের এই মেয়েটিও ওই দুর্যোগে মারা যায়, কিন্তু তার মরণ বিশেষভাবে কাঁদিয়ে যায় বিশ্ববাসীকেও।

ভূমিধসে সানচেজ তার বাসায় কাদা-পানির ভেতরে কংক্রিটের দরজায় আটকে গিয়েছিল। তিনদিন ধরে সে হাঁটু মোড়ানো অবস্থায় আটকে ছিল। যন্ত্রণায় কাতর সানচেজ বাঁচার জন্য কষ্ট চেপে অপেক্ষা করেছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় উদ্ধারোপযোগী যন্ত্রপাতি না থাকায় তাকে উদ্ধার করা যাচ্ছিলো না।

চোখ লাল হয়েছে, মুখ ফুলে গেছে, হাত সাদা হয়ে গেছে, তবু সানচেজ বাঁচতে চেয়েছিল। এই অবস্থাতেও সে এক সাংবাদিককে গান শুনিয়েছিল। মিষ্টি খাবার খেতে চেয়েছিলো। সাক্ষাৎকার দিতেও রাজি হয়েছিল। ভয় পেলে সে প্রার্থনা করতো, কাঁদতো। সাংবাদিক ও উদ্ধারকর্মীদের বলতো, বিশ্রাম নিয়ে আসতে, তার কাছে থাকতে হবে না। তৃতীয় রাতে তার হ্যালুসিনেশন হওয়া শুরু করলে সে বলেছিল, সে স্কুলে দেরি করে যেতে চায় না। আর অংক পরীক্ষার কথা বলতো।

অবশেষে উপায়ন্তর না দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাকে মরে যেতে দেওয়াই বেশি মানবিক। মেয়েটা মরে যায়। সানচেজের পরিবারে বেঁচে গিয়েছিল তার মা ও ভাই, আর মারা গিয়েচ্ছিল তার বাবা ও বোন।

সানচেজের এই ঘটনা তখন তুমুল আলোড়ন তুলেছিল ওই সময়। কর্তৃপক্ষের অবহেলার বিরুদ্ধে মানুষ উচ্চকণ্ঠ হয়েছিল। জানা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা না নেওয়া, জনগণকে সরিয়ে না নেওয়া ও উদ্ধার তৎপরতায় গাফেলতি বিশ্ববাসীকে ক্ষুব্ধ করেছিল।

এই মর্মস্পর্শী ছবিটা তুলেছিলেন ফ্রাংক ফোর্নিয়ার, শিরোনাম দিয়েছিলেন- “The Agony of Omayra Sánchez”। ১৯৮৬ সালে ছবিটা ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো অব দি ইয়ার’ পুরস্কার লাভ করে, যদিও এই ছবি নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে।

আমাদের দেশেও একের পর এক প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ে মানুষের জীবন বিপন্ন হচ্ছে। চট্টগ্রামে পাহাড় ধস, রানা প্লাজা ধস, তাজরিন গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ড, হাওড়ে বন্যা, সড়কে মৃত্যুর ফাঁদ, অভয়নগর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, গোবিন্দগঞ্জ, লংগদুসহ নানা জায়গায় সাম্প্রদায়িক হামলা ইত্যাদি নানা ঘটনায় কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতা এবং অনেক স্থানে বিপর্যয় সৃষ্টিতে মদদ দেওয়ার ঘটনায় আমরাও বিপন্নবোধ করছি।

আমরা কেউ সানচেজের মতো হারিয়ে যেতে চাই না। আমরা মুক্তি চাই। জীবনের নিরাপত্তা চাই। আমাদের মুক্তির জন্য আমাদেরই ভাবতে হবে।

শেয়ার করুন:
  • 199
  •  
  •  
  •  
  •  
    199
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.