আঁধারে আলোর সুলুক সন্ধান

0

মালবিকা লাবণি শীলা:

ঘরটা অন্ধকার, কিরকম ভ্যাপসা, চাপা একটা গন্ধে শুরুতে আমার গা গুলিয়ে উঠতো। এখন বোধগুলো প্রায় ভোঁতা হয়ে এসেছে! দিনরাত কিছুই বুঝতে পারছিনা। তলপেটে আর উরুর সংযোগস্থলে একটা চিনচিনে অথচ ধারালো ব্যথা, পরনের কাপড়ে রক্ত শুকিয়ে যাওয়া অস্বস্তি, হয়তো পিরিয়ড হয়েছে।

দিনে দুইবার করে লাঠি ঠকঠক করে কেউ একজন এক বোতল পানি আর কিছু খাবার দিয়ে যায়, টর্চের আলোতে সে আমাকে দেখলেও আমি তাকে দেখিনা। প্রথম কয়েকদিন খেতে ইচ্ছে করেনি, নিজের ওপর রাগে ক্ষোভে আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে! বাবা মাকে শিক্ষা দিতে গিয়ে আমি নিজে এ কোন গ্যাঁড়াকলে পড়লাম!

টিংকুর সাথে আমার ফেইসবুকে পরিচয়। গত সাত মাস ধরে আমরা সময় অসময় ভুলে কথায় ডুবে থেকেছি। আমার প্রতি ওর কনসার্ন আমাকে অন্যরকম আনন্দ দিতো, বাবা মা যে কেয়ারটা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন, টিংকু তার চেয়ে বেশি খোঁজ নিতো, খাওয়া, গোসল, ঘুম সবকিছুই আমি ওর কথায় করতাম, কলেজে আবার নিয়মিত যাওয়া শুরু করলাম। বাবা মার সাথে আমার সবসময়েই দূরত্ব ছিলো, হাই সোসাইটির হাই প্রাইস আমরা সবাই পে করে যাচ্ছিলাম। বাবা ব্যবসার নামে নিত্যনতুন গার্লফ্রেন্ড বগলদাবা করে দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়ান। মা সোশ্যাল ওয়ার্ক আর এনজিওর নামে আঙুলের বয়েসী ছেলেদের সাথে হাহাহিহি করেন। এরকম মানুষ যে কেন বিয়ে করে বাচ্চা নেয়!

বাবা মায়ের ওপর অশ্রদ্ধা আমার আগাগোড়াই ছিল। ছোটবেলায় বিভিন্ন উপায়ে প্রাণপণ চেষ্টা করতাম ওদের মনোযোগ আকর্ষণের, লাভ হতোনা। কৈশোর থেকে আমি নিজেকে গুটিয়ে নিতে থাকলাম। নিজেকে ধ্বংস করে দিতে চাইতাম! বারো বছর বয়েস থেকে বাবা অথবা মায়ের প্যাক থেকে লুকিয়ে সিগারেট নিয়ে খেতাম। জ্বলন্ত সিগারেট চেপে ধরতাম নিজের শরীরের এখানে ওখানে, ব্লেড দিয়ে হাত কেটে শরীরের সব দুষিত রক্ত বের করে দিতে চাইতাম। খোলা বোতল থেকে প্রায়ই হুইস্কি চুরি করে পানির বোতলে করে লুকিয়ে রাখতাম আমার লক করা ড্রয়ারে। রাতে সাউন্ড সিস্টেমে লাউড মিউজিক ছেড়ে নির্জলা হুইস্কি খেতাম। খেয়ে বমি করলেও আমাকে দেখার অথবা বাধা দেওয়ার কেউ ছিলনা। ফাঁকা আর ঝিম ধরা মাথায় জড়িয়ে আসা চোখে খুব মন চাইত বাবা অথবা মা এসে আমার পাশে বসুক, মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দিক। নাহ কেউ আসেনা। কোটি কোটি টাকার মালিকদের এইসব সস্তা আবেগ নিয়ে থাকার সময় কোথায়!

আমার বাবা মায়ের ওপর আমি সবচেয়ে বেশি বিরক্ত হলাম, যখন বাসায় একজন মাঝবয়েসী লজিং মাস্টার রাখা হলো, মাস্টার আমাকে উঠতে বসতে উপদেশ দেন। এই মাস্টার মায়ের এলাকার, কাজেই পাল্টা দান হিসেবে বাবা তাঁর এক দুঃসম্পর্কের বিধবা বোনকে নিয়ে এলেন আমাকে বেবি সিটিং করতে, এই মহিলা ননস্টপ কথা বলেন, বেবি ডাকেন, যদিও আমি আর বেবি নই। শপিং অথবা পড়া ছাড়া একা একা বাইরে যাবার অনুমতি সহজে পাওয়া যায়না, কাজেই ঘরের কাজের লোকজনের কার্যকলাপ দেখে দেখেই আমি বিনোদিত হতাম। প্রতি সপ্তাহে বাবা আমাকে বেশ কিছু টাকা দিতেন। সেই টাকা খরচ হতো খুব সামান্যই। অনলাইন শপিং করলে বাবার ক্রেডিট কার্ড তো আছেই।

তবুও মাঝেমাঝে বাইরে যাওয়ার অনুমতি আমি আদায় করতাম। কোনো একটা শপিং মলে ঢুকে ড্রাইভার চাচ্চুকে কিছু টাকা দিয়ে দুই তিন ঘন্টা পরে আসতে বলে দিতাম। ড্রাইভার চাচ্চু সরে যাওয়ার সাথে সাথে আমি শপিং মল থেকে বেরিয়ে আশেপাশে যতো ভিখারি, আর পথশিশু পেতাম সবাইকে নিয়ে ঢুকে যেতাম কোনো রেস্টুরেন্টে। ভোট নিয়ে ঠিক করা হতো আমরা কি খাবো। প্রায় সময়েই বিপুল ভোটে কাচ্চিবিরিয়ানি জয়ী হতো। বোরহানিতে চুমুক দিতে দিতে ক্ষুধার্ত মানুষগুলোর আনন্দিত মুখ দেখে আমার যে কী ভালো লাগে! সব মিলিয়ে আমার বারো থেকে পনেরো হাজার টাকা খরচ হয়, অথচ আমাদের বাসার এক একটা পার্টিতে এর চেয়েও কয়েকগুণ বেশি টাকার খাবার ফেলে দেয়া হয়। ফাইভ স্টার রেস্টুরেন্টের শেফের পুতুপুতু মার্কা ডিশে চোখের তৃপ্তিই হয় শুধু। পেট ভরেনা, আর সুশি তো একবেলা বাইরে থাকলেই খাওয়ার অযোগ্য হয়ে যায়!

টিংকুর সাথে আমার এই অসহনীয় দিনকাল নিয়ে কথা বলতাম। ওর সাথে কয়েকবার দেখা করার প্ল্যান করেও দেখা হয়নি। একই ঘরে থেকে বাবা মায়ের সাথেই আমার সপ্তাহের পর সপ্তাহ দেখা হয়না। ওরা যখন ঘরে ফেরেন তখন আমি ঘুমে, আমি যখন উঠি ওরা তখন বাইরে চলে গেছেন।

আমি সত্যি এই বৈভবের ভালোবাসাহীন কারাগারে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। একদিন আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গুঁড়িয়ে গেলো!
ঘুমিয়ে পড়েছিলাম,পাশের রুম থেকে আসা তীক্ষ্ণ চিৎকারে আমার ঘুম ভেঙে গেলো। মা অকথ্য ভাষায় বাবাকে গালি দিচ্ছেন, বাবা শ্লেষাত্মক হাসি হেসে ফোঁড়ন কাটছেন। দুজনেই ইনটক্সিকেটেড! এদের মধ্যে যাওয়ার কোনো ইচ্ছেই আমার নেই। তবে মায়ের একটা কথা শুনে আমি তড়াক করে উঠে বসলাম, অকথ্য গালিগালাজের ফাঁকে মা ফুঁসে উঠে বললেন,
– আমার ক্যারিয়ার নিয়ে তুমি জেলাস ছিলে বলেই আমাকে তুমি ট্রিক করে প্রেগন্যান্ট করেছিলে, নইলে কবে তোমাকে ছেড়ে আমি চলে যেতাম! আমি তো সন্তান চাইনি! ইউ ব্রুট!!

বাবা ততোধিক ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন,
– পরে যখন অ‍্যাবরশন করতে বললাম, তখন তো রাজি হলেনা! আমাকে জন্মের শিক্ষা দিতে বাচ্চা নিলে! নইলে আমিই কি এই নরকে থাকতাম ভেবেছো?

নিজের ওপর ঘৃণায় লজ্জায় আমি মাটির সাথে মিশে যেতে থাকি! ছিঃ! দুজন ভালোবাসাহীন মানুষকে আমি একসাথে থাকতে বাধ্য করে আসছি দেড় যুগ ধরে! উপায় থাকলে এখনই বেরিয়ে যেতাম! যেদিকে ইচ্ছে চলে যেতাম! কলেজে কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধু নেই। টিংকুকে নক করি। ও অনলাইনেই ছিলো। আমি ওকে নিজ্ঞেস করি,
– সত্যি করে বলো, তুমি আমাকে ভালোবাসো কি-না।
– তোমার কোনো সন্দেহ আছে?
– প্রশ্নের উত্তরে প্রশ্ন কোরোনা, প্লিজ। উত্তর দাও।
– হ্যাঁ আমি তোমাকে ভালোবাসি।
– বিয়ে করবে আমাকে?
– এখন?
– আবার প্রশ্ন! জাস্ট টেল মি, ইয়েস অর নো।
– আমার অবস্থা তো তুমি জানোই, মিনিমাম কিছু টাকা তো লাগবে! কাজি সাহেবকে দেওয়ার মতো টাকাই আমার নেই।
– ও নিয়ে তুমি ভেবোনা, আমার হাতে ভালো অ‍্যামাউন্টের টাকা আছে। অর্নামেন্টস আর ব্যাংকের টাকা সব মিলিয়ে অনেকদিন চলে যাবে। বাই দিস টাইম আমরা দুজনে একটা ব্যবসা শুরু করে দিলে আর চিন্তাই থাকবেনা।
টিংকু কিছুক্ষণ ভেবে রাজি হয়ে যায়। আমি ওকে লাভ আর কিসের ইমো দিয়ে ভাসিয়ে দেই। কথা হয় পরেরদিন আমি ব্যাংক থেকে টাকা উঠিয়ে পরিবাগে ওর এক বন্ধুর বাসায় ওর সাথে দেখা করবো।

ড্রাইভার চাচ্চুকে নিয়ে ইস্টার্ন প্লাজায় নেমে একহাজার টাকা দিয়ে চাচ্চুকে দুই ঘন্টা পরে আসতে বলে দেই। যদিও আমাকে রেখে কোথাও যাওয়ার অনুমতি ওঁর নেই। কারো সন্দেহ উদ্রেক করতে চাইনি বলে আমি আমার ব্যাকপ্যাকে শুধু অলংকার, টাকা আর চেকবুক নিয়েই বের হয়েছি। কিছুক্ষণ পর বাইরে উঁকি দিয়ে দেখি ড্রাইভার চাচ্চু গাড়িতে নেই। দ্রুত একটা রিক্সা নিয়ে ব্যাংকে যাই। টাকা উঠানোর জন্যে যখন ক্যাশিয়ারের কাছে যাই, তখন তিনি আমাকে ম্যানেজারের কাছে পাঠিয়ে দেন। বেশ বড় অ‍্যামাউন্ট বলে বাবা অথবা মায়ের অনুমতি লাগবে! কি মুশকিল! এখন উপায়?
যাক, হাতে যা আছে তাতে বেশ কিছুদিন চলা যাবে। ম্যানেজারকে পরে আসছি বলে ম্যানেজ করে বেরিয়ে পরিবাগ টিংকুর বন্ধুর বাসায় চলে গেলাম। গেইটের বাইরে একটা মাইক্রোবাস দাঁড় করানো। কিরকম একটা অন্ধকার অন্ধকার শ্যাওলা পড়া বাড়ি! গা ছমছম করছে! কিন্তু আমি কিছুতেই আর বাড়ি ফিরতে চাইনা।

নির্দিষ্ট বাসায় ঢুকে দেখি ঘর একদম অন্ধকার, মোটা পর্দা ভেদ করে বাইরের আলো খুব সামান্যই ঢুকতে পারছে! গাঁজা আর সিগারেটের দমবন্ধ করা গন্ধ! ধোঁয়া ফুঁড়ে যে ছেলেটি আমার সামনে এসে দাঁড়ায় তার সাথে টিংকুর মিল খুবই সামান্য, দিনরাত নেশা করলে মানুষের চেহারায় যেরকম অনুজ্জ্বল ভাব আসে ওর চেহারা ঠিক সেরকম, পাঁশুটে, শুকনো শুধু চোখদুটো অস্বাভাবিক রকম জ্বলজ্বলে! মাটিতে পাতা বিছানায় আরো তিনজন ছেলে। টিংকু আমাকে বসতে বললে আমি ভয়ে ভয়ে ওদের কাছাকাছি গিয়ে বসি। গাঁজার স্টিক হাতে হাতে ঘুরে আমার হাতেও আসে। আমি টান দেই, সিগারেটের চেয়ে বেশ হাল্কা। একজন ইয়াবা পুড়িয়ে পাঁচ টাকার গোল করা নোটটা এগিয়ে দেয়। আমি টান দিয়ে আকাশে উড়তে থাকি, আহ! বাবা মা কি আমার খবর পেয়েছেন! ধুত! পেলেই কী! ওরা আমাকে চান নি, আজ আমিই ওদের চাইছিনা, সহজ হিসাব!

টিংকুরা সবাই মিলে বাইরে যাবে বলে আমরা মাইক্রোবাসে গিয়ে উঠি। আমার কিছুই মনে নেই। আমি ঝিম মেরে বসে আছি। ওদের টুকটাক কথা ভেসে আসে,
“দারুণ জিনিশ জুটিয়েছিস রে..ভালো র‍্যানসাম পাওয়া পাওয়া যাবে..ফুর্তিও করা যাবে..ওর বাপ মাকে ফোন দে..এককোটি তো ইজিলি…!!”

আমার আর কিছু মনে নেই। মাথা ক্লিয়ার হলে বুঝলাম আমার ব্যাকপ্যাক ওরা সরিয়ে ফেলেছে, মোবাইলটা ওর ভেতরেই ছিলো..আচ্ছা ওরা কি আমাকে ধর্ষণ করেছে! সবাই মিলে? ওরা খাবারের সাথে কি ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দিচ্ছে? এতো উইক হয়ে পড়ছি কেন আমি? সারাজীবন বাবা মাকে দোষ দিয়েই এসেছি, কিন্তু বাবা মার সাথে আমার কি সুখস্মৃতিও নেই? ছোটবেলায় মা আমাকে গুনগুন করে গান শুনিয়ে ঘুম পাড়াতেন। আমি স্নো গ্লোব পছন্দ করি বলে বাবা বিশ্বের যে কোনো দেশে গেলেই মনে করে একটা করে স্নো গ্লোব নিয়ে আসেন। হয়তো তাঁরা পরিকল্পনা করেননি, কিন্তু আমাকে মেনে তো নিয়েছেন!

মাঝখানে কয়দিন পার হয়েছে আমি জানিনা। একদিন আমার ঘুম ভেঙে গেল ঘরের মধ্যে কয়েকজনের কথার শব্দে। জানালাটা খোলা, আলোতে আমি চোখ পিটপিট করছিলাম। আমাকে কে যেন জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। আমার মা! বাবা বারবার চোখ মুছছেন। সাথে কয়েকজন পুলিশ, ওদের কথাবার্তায় শুনি টিংকু আর ওর বন্ধুরা ধরা পড়েছে।

আমি এতোকিছুর পরেও মনেমনে টিংকুকে ধন্যবাদ দেই। ওর কারণেই আমি বুঝতে পেরেছি বাবা মাকে আমি কতোটা ভালোবাসি। বাবা মায়ের উদ্বিগ্ন চেহারা আমাকে বুঝিয়ে দেয়, আমার প্রতি ওঁদের ভালোবাসাও কম নয়। আহ! আমি এবার বাড়ি যাবো। হোম সুইট হোম!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৪৯৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.