সংসার দুজনের, দায়িত্বও দুজনের

0

বৈশালী রহমান:

ইদানিং আমার ভাই বেরাদরদের মুখে একটা কথা প্রায়ই শুনি, সংসার তাদের একা টানতে হয় কেন? মেয়েরা কেন এই সংসার খরচ শেয়ার করে না? এ প্রসঙ্গে আরেকটা সম্পূরক প্রশ্ন হলো, একটা ছেলে যদি একটা বেকার মেয়েকে বিয়ে করতে পারে, তবে একটা মেয়ে কেন একটা বেকার ছেলেকে বিয়ে করতে পারে না?

এ প্রসঙ্গে আলোচনার আগে আমি প্রথমেই একটা বিষয় পরিষ্কার করে নিতে চাই। একজন সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন এবং বিবেকবান, এবং যুক্তিবাদী মানুষ হিসেবে মেয়েদের আর্থিক স্বাধীনতায় আমার কোনো আপত্তি নেই। বরং আমি মনে করি, আর্থিক স্বাধীনতা নারী স্বাধীনতার একমাত্র নিয়ামক না হলেও অন্যতম প্রধান নিয়ামক। এখন আসুন, কিছু সিনারিও আমরা সবাই একটু দেখে নিই। যেহেতু আমি নিজে বাংলাদেশের নাগরিক, তাই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেই বিষয়টা আলোচনা করবো।

প্রথমত, মেয়েরা বেকার পুরুষের দায়িত্ব নেয় না এটা পুরোপুরি ঠিক নয়। আমাদের দেশের মধ্যবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত সমাজে এটা দুর্লভ ঘটনা হলেও নিম্নবিত্ত সমাজে একেবারে বিরল নয়। প্রায় প্রতি বাসাতেই ঠিকা বুয়া কাজ করেন, যার একজন বেকার স্বামী আছে, অথবা এমন একজন স্বামী আছে যে কিনা রোজগার করে কিন্তু সংসারে কন্ট্রিবিউট করে না। এই “বেকার স্বামী”কে কিন্তু এই মেয়েরাই প্রতিপালন করে।

এবার দেখা যাক “বেকার বউ” এবং “বেকার বর” এর পার্থক্য। খুব সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া আপনারা কি এমন কোনো সিনারিও চিন্তা করতে পারবেন যেখানে একজন নারী কোনো রোজগার করছেন না, টাকা-পয়সার ব্যাপারে পুরোপুরি বরের ওপর নির্ভরশীল অথচ বরকে মারধরও করছেন, হুকুমও চালাচ্ছেন, এবং সংসার বা বাচ্চা কারো দিকেই মনোযোগ দিচ্ছেন না?

মনে হয় না। কারণ আমাদের দেশে সামান্য একদিন ভাত পুড়ে গেলেই যেখানে নারীর “সিরিয়াল দেখা” কে দায়ী করা হয় সেখানে এমন দৃশ্য কিন্তু নিতান্তই বিরল। অথচ এই নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর কর্মজীবী নারীদের “বেকার স্বামী”রা কিন্তু বহাল তবিয়তে, রীতিমতো বাদশাহী চালে থাকেন। এঁরা রোজগার না করলেও সংসারের কোনো কাজ করেন না, বাচ্চাকাচ্চা লালনপালন করেন না, কিন্তু নিয়মমতো স্ত্রীর ওপর অত্যাচারটা ঠিকই চালিয়ে যান। নিজের ভাত কাপড় তো বটেই, নেশার খরচটাও স্ত্রীর কাছ থেকে আদায় করে নেন। অথচ একজন “বেকার বউয়ের” মতো মুখ বুঁজে খাওয়া পরার খোঁটা বা খরচের খোঁটা সহ্য করেন না।

অর্থাৎ, নারী এক্ষেত্রে বেকার পুরুষ প্রতিপালন করছেন ঠিকই, অথচ আমাদের পুংসমাজ “বেকার নারী” বা “হাউজওয়াইফ” এর কাছ থেকে যে আনুগত্য পেয়ে থাকেন, এই নারীরা কিন্তু “হাউজ হাজব্যান্ড” বা “বেকার পুরুষ” দের কাছ থেকে সে আনুগত্য পাওয়া দূরে থাক, প্রত্যাশাও করতে পারছেন না।

এবার আসি আমাদের পরিচিত মধ্যবিত্ত এবং উচ্চমধ্যবিত্ত সমাজে। উচ্চবিত্ত সমাজ সম্পর্কে আমার নিজেরই তেমন ধারণা নেই, তাছাড়া উচ্চবিত্ত সমাজ ঠিক আমাদের দেশের সমাজকে প্রতিফলিত করে না (সংখ্যালঘুত্বের কারণে), এ কারণে তাদের আপাতত এই আলোচনার বাইরে রাখছি।

আমাদের মধ্যবিত্ত এবং উচ্চমধ্যবিত্ত সমাজের পুরুষরা অনেকেই চান তাঁদের স্ত্রীরা তাঁদের সংসার খরচ শেয়ার করুন। অর্থাৎ ডাবল ইনকামের প্রতি তাঁদের একটা ঝোঁক আছে। কিন্তু এরা এটা ভুলে যান যে ডাবল ইনকামের জন্য তাঁদের স্ত্রীদের একটা নির্দিষ্ট সময় সেই অর্থকরী কাজে ব্যয় করতে হবে। এ কারণে তাঁরা করেন কী, স্ত্রী বাইরে কাজ করে অর্থোপার্জন করলে কী হবে, নিজের আরাম আয়েশ তাঁরা বিন্দুমাত্র স্যাক্রিফাইস করতে চান না। অর্থাৎ স্ত্রী কাজও করবে, আবার সংসারের কাজ, বাচ্চা পালন, এমনকি তাঁদের বাপ মায়ের সেবা করার দায়িত্বটা পর্যন্ত স্ত্রীদের ওপর চাপিয়ে দেন। তাঁরা চান, তাঁদের স্ত্রীরা হবে দশভূজা। তাঁরা চাকরিও করবেন, স্বামীপ্রবরটির সামনে পঞ্চব্যঞ্জন সাজিয়েও দেবেন, শ্বশুর শাশুড়ির পায়ে তেলও মালিশ করবেন, আবার বীরপুরুষেরা বাড়িতে ফিরলে তাঁদের স্ত্রীরা নিজেদের পরিপাটি করে সাজিয়ে খাবারের সাথে নিজেদেরও স্বামীদের পাতে পরিবেশন করবেন। এক্ষেত্রে পান থেকে চুন খসার মতো ত্রুটি হলেও স্ত্রীর চাকরির দোষ দেওয়া হবে।

অর্থাৎ, স্ত্রীর টাকা সংসারে লাগলেও আরাম লাগে, আবার সেই সাথে স্ত্রীকে প্রতিনিয়ত চাকরি করার খোঁটা দিতে, তাঁর কাজের দোষ ত্রুটি ধরে চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করতেও আরাম লাগে। পুরা ডাবল আরাম। অথচ এতে করে স্ত্রীর ওপর যে ডাবল কাজের বোঝা চাপে এটা তাঁরা ভুলে যান। এখন কোনো মেয়ে যদি এই ডাবল টানাপোড়েনে বিরক্ত হয়ে চাকরি ছেড়ে দিতে চান, তখন বীরপুঙ্গবরা শুরু করেন ন্যাকামো। “আমি তো বউরে চাকরি করতে মানা করি নাই, সে নিজের ইচ্ছায় ছেড়েছে, সংসারে সময় দেওয়ার জন্য”। এখন কেউ যদি জিজ্ঞেস করে যে, “হে বাপু, সংসারে সময়টা তুমি দাও না ক্যান। এইটা কি তোমার সংসার না?” তখনই শুরু হয়ে যায় নারীবাদ এবং নারীবাদীদের গুষ্টি তুলে গালিগালাজ।

অনেকে আবার এই সমস্যার সমাধান দিতে চান এভাবে যে আমাদের স্ত্রীরা তবে সংসার করুক, আমরা রোজগার করি। কিন্তু এটা আসলে কোনো বাস্তব সমাধান নয়। একটা মেয়ে, যার জীবনে কিছু করে দেখানোর যোগ্যতা আছে, তোমার চেয়ে ওপরে ওঠার যোগ্যতা আছে, সে তোমার সংসারে রান্না করে, বাসন মেজে, তোমার বাপ-মায়ের পায়ে তেল মেখে জীবন পার করবে কেন বাপু? কাল যদি তোমার সাথে তার ডিভোর্স হয়, অথবা তুমি মারা যাও, তবে কি সে চাপার জন্য আরেকটা ঘাড় খুঁজে নেবে? বরং তার চেয়ে এটাই কি বাস্তব সমাধান নয় যে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই রোজগার করবে এবং সংসারের কাজ, বাচ্চা পালন সংক্রান্ত কাজগুলোতে দুজনেই সমভাবে অংশ নেবে?

পরিশেষে বলি, যেসব পুরুষ সংসার খরচে স্ত্রীদের অংশগ্রহণ চান, নিজের সংসারের সব কাজে সমভাবে অংশগ্রহণের জন্য আপনারা মানসিকভাবে তৈরি তো? “বেকার পুরুষ” হিসেবে যারা রোজগেরে গিন্নীর ঘাড়ে চাপার আগ্রহ প্রকাশ করেন, বাসার সব কাজ যেমন রান্নাবান্না, কাপড় ধোয়া, আড্ডাবাজি বাদ দিয়ে বাচ্চার কাজকর্ম এবং শ্বশুর শাশুড়ির সেবাযত্ন করতে প্রস্তুত তো!

বি:দ্র: এই পোস্ট “আমরা তো এইরকম না” গোষ্ঠীর জন্য নয়। এই পোস্টে সাধারণত যেসব ঘটনা ঘটে সেগুলো আলোচনা করা হয়েছে এবং যে কোনো নিয়মেরই ব্যতিক্রম থাকে।

লেখাটি ৪,৬২৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.