একজন নারীকেও যেন যৌনকর্মী হতে না হয়

0

তানিয়া কামরুন নাহার:

সবাই যৌনকর্মীদের ঘৃণা করে, আমি শ্রদ্ধা করি। পৃথিবীর আদিমতম পেশা  পতিতাবৃত্তি। পুরুষতন্ত্রের মনোরঞ্জনে নারীদের যৌনকর্মী হতে হয়েছিল, হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। আবার সেই নারীকেই এই ভণ্ড সমাজ প্রতিনিয়ত গালি দিয়ে গেছে কত কী বলে! লালন বলে গেছেন, গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায়, তাতে ধর্মের কী ক্ষতি হয়!

আসলেই কোন ক্ষতি হয় না। পুরুষ ঠিকই তার নিজের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে, বিকৃত কাম চরিতার্থ করতে যৌনকর্মীর কাছে যাচ্ছে, যাবে। কিন্তু পুরুষের দিকে কেউ কোনদিন আঙ্গুল তুলে কিছুই বলবে না। যত দোষ ঐ যৌনকর্মীর। কিন্তু সেই নারীটি কিভাবে এই পেশায় নিজেকে জড়ালো তা আমরা কেউই ভেবে দেখি না।

বেশির ভাগ সময় অভাবী পরিবারের মেয়েরা চাকরি বা বিয়ের প্রতারণার ফাঁদে পড়ে একদিন দেখে সে বিক্রি হয়ে গেছে কোন যৌনপল্লীতে বা কোন খদ্দেরের কাছে। প্রেমের প্রতারণাও আছে অনেক। মাদকাসক্ত স্বামী নিজে তার স্ত্রীকে বাধ্য করে যৌনকর্মী হতে। এছাড়াও একেবারে শিশু মেয়েরা হারিয়ে গেলে, অপহৃত হয়ে ঘুরে ফিরে একদিন তাদের পরিচয় হয় যৌনকর্মী হিসেবে। কেন না, অল্পবয়সী যৌনকর্মীদের কদরও অনেক।

আর একদিন এ পেশায় নিজের নাম লিখিয়ে ফেললে স্বাভাবিক জীবনে চাইলেও কেউ ফিরে আসতে পারে না। আসলে আমরাই তাদের ফিরতে দিতে চাই না। তাই তারা ঐ পেশা থেকে আর কোনদিন বের হয়ে আসতে পারে না। এযে এক ভয়াবহ চক্র, এর থেকে বের হবার উপায় কেউ জানে না।(কেউ কেউ হয়ত অনেক সংগ্রামের পর পারে। কিন্তু সেসব ব্যতিক্রম। ব্যতিক্রম উদাহরণ হয় না।) মনের আনন্দে নাচতে নাচতে স্বেচ্ছায় কেউ যৌনকর্মী হয় কিনা, আমার জানা নেই।

একজন যৌনকর্মীর জীবনে কিছুই নেই। সে না পায় কারো ভালোবাসা, না পায় মানুষ হিসেবে বাঁচার নূন্যতম অধিকার ও সম্মান, না পায় একটা পরিবার। আমরা প্রতিদিন কত স্বপ্ন দেখি। অথচ এই যৌনকর্মীদের জীবনে সামান্য একটা স্বপ্নও থাকে না। কিচ্ছু না।এমন কি তাদের সন্তানদের জন্যেও কোন ভবিষ্যত থাকে না। ছেলে শিশু হলে হয় ভবঘুরে, মাদকাসক্ত, ছিনতাইকারী হিসেবে বেড়ে উঠে। মেয়ে শিশু হলে মায়ের মতই তার ভাগ্য লেখা হয়ে যায়। তবুও পুরুষতন্ত্র চায় সমাজে যৌনপল্লী থাকুক, যৌনকর্মী থাকুক। এমন নি, আমরা নারীরাও খুব করে চাই, যৌনকর্মী, যৌনপল্লী থাকুক সমাজে। তাতে আমরা নারীরা পথে ঘাটে ঈভ টিজিং এর হাত থেকে রক্ষা পাবো, আমাদের ধর্ষণের শিকার হবার ভয় থাকবে না। যৌনকর্মী নারীরা তাদের সব স্বপ্ন, আশা, আকাঙ্ক্ষা, অধিকার জলাঞ্জলি দিয়ে আমাদের জন্য সুন্দর জীবন নিশ্চিত করবে। শুধু মাত্র এই কারণেই যৌনকর্মীদের আমি শ্রদ্ধা করি, প্রচণ্ডভাবে শ্রদ্ধা করি।

এই যে নারীরা একসময় যৌনকর্মী হয়ে যাচ্ছে, কিংবা বলা যায়, তাকে অমনটা হতে বাধ্য করা হচ্ছে। আচ্ছা, আমরা কি কোনদিন ভেবে দেখেছি, একজন নারীও যদি যৌনকর্মী হতে রাজী না হয় (কেন না, আমরা ধরেই নিচ্ছি নারীরা মনের আনন্দে নাচতে নাচতে যৌনকর্মী হয়)! তখন সবচেয়ে বেশি সমস্যায় কারা পড়বে?

পুরুষেরা চায়, পুরুষতন্ত্র চায়, এমন কি নারীরাও নিজেদের নিরাপত্তা ও সম্মানের কথা চিন্তা করে চায় সমাজের কিছু নারী যৌনকর্মী হয়ে যাক। আর আমি কি চাই জানেন? যদিও খুবই বালখিল্য ও অবাস্তব শোনাবে কথাটা। তবুও বলি। আমি চাই, একজন নারীকেও যেন কোনভাবে যৌনকর্মী হতে না হয়, যৌনকর্মী হিসেবে যারা বর্তমানে কাজ করছে তাদেরকে সম্মানজনক পেশায় পূর্নবাসনের ব্যবস্থা করা হোক। যৌনপেশাটির যদি বিলুপ্ত হয়ে যাবে, তখন নিশ্চয় রাস্তায় কোন নারীকে অহেতুক “এই রেট কত?’ ধরনের ইভ টিজিং এর শিকার হতে হবে না।

আমার নিরাপত্তা ও সম্মানের স্বার্থে আরেকজন নারী তার সব স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিয়ে চিরকাল যৌনকর্মী হয়ে মানবেতর জীবন কাটাক, এটা আমি চাইতে পারি না। একজন মানুষ হিসেবেই চাইতে পারি না।

লেখাটি ২,৪১৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.