সত্য ঘটনা -৩

0

রীমা দাস:

আমার ছেলে সুজন। শ্যামলা গড়ন, বুদ্ধিদীপ্ত চোখ আর  এক মাথা কোঁকড়ানো চুলের জন্য এক নজরে সবার চোখ যায় তার দিকে। অথচ এই ছেলের জন্মের পর তাকে দেখে আমি কেঁদেছিলাম। আর আমার স্বজনরা কষ্ট পেয়েছিলেন। আমরা সবাই কষ্ট পেয়েছিলাম আমাদের বংশের ছেলে ‘কালো’ বলে। আমার শ্বশুর বাড়ির প্রত্যেকেই ফর্সা। এই কালো ছেলে তাদের বংশে আসায় তারা এবং আমি নিজেও কালো বলে কষ্টের অন্ধকার গহ্বরে নিমজ্জিত হচ্ছিলাম। সেদিনের কথা মনে করে এখন হাসি। কী বোকা ছিলাম আমি! সেই অন্ধকার সময়ে আমার পাশে ছায়া সঙ্গী হয়ে থেকেছে সুজনের বাবা।            

আমি খুব সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে হওয়ায় বেশি পড়ালেখা করতে পারিনি। ছাত্রী হিসেবে মধ্যম মানের ছিলাম। পাঠ্যবই এর বাইরের বইগুলো আমাকে টানতো বেশি। বয়স ১৮ হবার আগেই বাবা বিয়ে দিলেন সংসারের অভাব অনটনের কারণে। বিয়ের পর নতুন সংসারে এসে প্রথমেই বরের কাছে আবদার করলাম সন্তানকে অবশ্যই পড়ালেখা করাতে হবে। আমার ভালো বর আমার আবদার রাখার প্রতিজ্ঞা করলো।

আমার নয়নের কালো মানিক এর মধ্যে ধীরে ধীরে বড় হতে লাগলো। আর আমি কালো মানিককে ঘিরে স্বপ্ন সাজাতে শুরু করলাম। আমরা মফস্বলে থাকি। বাচ্চাকে স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য বাসার পাশের সরকারি প্রাইমারি স্কুলই নির্বাচন করা হলো। ছেলের পড়ালেখা, রেজাল্ট ও আচরণে শিক্ষকদের ভালোবাসা ও স্নেহ পেতে তার সময় লাগেনি। আমি ‘সুজনের মা’ নামেই পরিচিত হতে লাগলাম। এই স্কুলের পরিসরে বা আমাদের পাড়াতে যখন আমাকে সবাই সুজনের মা বলে পরিচয় করিয়ে দেয়, তখন গর্বে আমার বুকের ছাতি অনেক বড় হয়ে যায়। দেখতে দেখতে আমার সোনা পাখি আট বছরে পা রাখে। তখন সে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র।
সে সময় স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন মাঝবয়সী এক ভদ্রলোক। ভদ্রলোককে দেখলে শ্রদ্ধা হয়। আমার ছেলেকে ভীষণ পছন্দ করেন তিনি। মা হিসেবে আমার খুব ভালো লাগে। আমার নিজের ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে যায়। কোন শিক্ষকের আলাদা স্নেহ পেলে আমরা ধন্য হয়ে যেতাম। আর হেড স্যারের স্নেহ পাওয়া তো যেমন তেমন কথা নয়। আমার ছেলেকে হেড স্যার বেশি পছন্দ করেন, এই অনুভূতিতে আমি স্যারকে আরো বেশি করে শ্রদ্ধা করি।
ছেলেকে প্রতিদিনের সব পড়া ঠিক করে দেই, সুন্দর পরিষ্কার ইউনিফর্ম পরিয়ে দেই। হেড স্যার আমার মনের মধ্যে এতোই জায়গা করে নিলেন যে, আমি আমার ছেলেকে ভবিষ্যতে হেড স্যারের মত জ্ঞানী ও ভালো মানুষ হোক এটা চাইতে শুরু করলাম। স্যারের প্রতি শ্রদ্ধা আমার বাড়তে থাকলো যখন আমি জানলাম স্যার আমার ছেলেকে কোলে বসিয়ে কবিতা শেখান, পড়ালেখার খবর নেন।
আমাদের মধ্যবিত্ত সংসারে আট বছরের ছেলে মানে অনেক বড়। মা ছেলের দূরত্ব তৈরি করে দেয়া হয় পরিবার থেকে। আমি এই দূরত্ব পছন্দ করি না বলেই আমার সোনা পাখি কালো মানিককে আমার কাছে কাছে রাখি সব সময়। সময় গড়িয়ে যায়। হেড স্যারের প্রতি আমার নির্ভরতা তৈরি হয়ে যায় স্যারের আন্তরিক ব্যবহারে। ছেলেকে নিয়ে আমি সেরকম চিন্তা করি না।
সংসারের কাজে আমার সময় কাটতে লাগলো দ্রুত। হঠাৎ একদিন খেয়াল করলাম ছেলে মনমরা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সবার থেকে দূরে দূরে থাকছে। পরদিন সকালে মুখ ভার করে এসে বললো– মা, আজ স্কুলে যাবো না। আমি রেগে গেলাম। চিৎকার করলাম, সুজনকে মারলাম খুব। আমার স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে না, এই চিন্তায় আমি দিশেহারা হয়ে গেলাম। হেড স্যার বলে গেছেন স্কুল কামাই না দিতে। আর আমার ছেলে কি না স্কুলে যাবে না বলছে? এটা আমি মেনে নিতে পারছিলাম না, তাই ছেলেকে জোর করে রেডি করিয়ে দিলাম, স্কুলে পাঠালাম। স্যারের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। এই কৃতজ্ঞতার কারণ হেড স্যার আমার ছেলেকে প্রায় প্রতিদিন স্কুল ছুটির পর বাড়ি পৌঁছে দিতেন।
সেদিনও স্কুল ছুটির অনেকক্ষণ পর হেড স্যার সুজনকে বাসায় পৌঁছে দিলেন আর বললেন— খুব দুষ্টু হয়েছে ছেলেটি, খেলতে গিয়ে ব্যথা পেয়েছে। আগামি দুদিন স্কুলে যাবার দরকার নেই। আমি খোঁজ নেব। আমি ছেলেকে দেখলাম। আমার কালো মানিককে নীল দেখাচ্ছে। সে দাঁড়াতে পারছে না। আমার মাতৃ হৃদয় উথলে উঠলো। আমি সুজনকে কোলে নিলাম। সে আমার গলা জড়িয়ে ধরলো, কেঁপে উঠলো একটু, আর তারপর আমার পিঠে ফোঁটায় ফোঁটায় উষ্ণ জলধারা টের পেলাম। আমার ছেলে বড় হয়ে গেছে। সে মা’কে লুকিয়ে কাঁদছে। আমার ভেতরে প্রবল যন্ত্রণা হচ্ছে। আজ ছেলেটা যেতে চায়নি, আজই আমি তাকে জোর করে পাঠালাম আর আজই সে এতো কষ্ট পাচ্ছে। নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে।
ছেলেকে আমি সান্ত্বনা দিচ্ছি, বুঝাতে চেষ্টা করছি। ছেলের মুখে একটিও শব্দ নেই। আমার ছোট্ট সোনা পাখি নিজের কাপড় নিজেই বদলায়। আজ তার সে শক্তি নেই ভেবে আমি তার শার্ট বদলে দিলাম, কিন্তু স্কুলের প্যান্ট সে বদলাতে দিলো না। ছেলে বড় হচ্ছে ভেবে আমি তাকে কিছু বললাম না। তার হাত মুখ ধুয়ে দিয়ে খাইয়েও দিলাম। এই অল্প সময়ের মধ্যে একবারের জন্যও তার চোখের বৃষ্টি ধারা থামেনি। আমি তাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলাম।
রাত নয়টার দিকে সুজনের বাবা এলেন। সুজনের সাড়াশব্দ না পেয়ে জানতে চাইলেন কী হয়েছে। আমি হেড স্যারের কথা পাখি পড়ার মতো বললাম। ছেলের বাবা বললো— এই বয়সে দুষ্টুমি করবে না তো কখন করবে? বলেই ছেলের কাছে চলে গেলো সে। সুজনের বাবা সুজনের প্রাণ ভ্রোমরা, আবার সুজনও তার বাবার প্রাণ ভ্রোমরা। যতক্ষণ বাবা বাসায় সুজন ততক্ষণ তার বাবার চারপাশে হাত-পা তুলে নাচে। বাপ-ছেলের এই দুষ্টুমি আমি খুব উপভোগ করি। সেই ছেলে বিছানায় ঘুমাচ্ছে এটা বিশ্বাস হচ্ছে না বলেই ছেলে কোথায় ব্যথা পেয়েছে তা দেখার জন্য দ্রুত গেলো ঘরে। বিছানার কাছে দাঁড়াতেই শুনলো ছেলে জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকছে। সুজনের শরীরে হাত দিতেই বুঝতে পারলো জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে শরীর।
সারা রাতের প্রলাপ বকা শেষে আমার ছেলের জ্বর কমতে শুরু করলো ভোরের দিকে। ভোরের আলোয় ছেলে তার বাবাকে দু’হাত  দিয়ে জড়িয়ে ধরলো। আমি ছেলের জন্য খাবার এনে দেখি ছেলে ও ছেলের বাবার চোখ ছলছল করছে। ছেলের বাবার মুখ থমথমে। তাদের এই অবস্থা দেখে নিজেকে অসহায় লাগছিল।
আমাকে দেখেই ছেলের বাবা অস্ফুট কন্ঠে বললো— আমার ছেলে ঘেটুপুত্র কমলা হয়েছে। কী বিষাদময় সেই কন্ঠ! আমাকে সেই কন্ঠ নাড়িয়ে গেলো। ১৫/২০ সেকেন্ড আমার মাথা কাজ করছিলো না। যখন বুঝলাম, শরীর তখন অবশ হয়ে এলো। প্রচণ্ড ঘৃণা হলো নিজের উপর। হেড স্যারকে আগুনে ফেলে দিতে মন চাইলো। আমি আমার কালো মানিককে কোলে নিয়ে কাঁদলাম। আমরা তিনজন পরস্পরকে জড়িয়ে রাখলাম অনেকক্ষণ।
সেই সকাল থেকে আমার সম্পূর্ণ মনোযোগ সুজনের উপর। সুজনের আড়ালে আমি তার বাবার সাথে কথা বললাম। এই লোককে শাস্তি দেবার জন্য আমরা মামলা করবো– এটা সিদ্ধান্ত নিলাম। সেদিন সকালে স্কুলে যাবার সময় সেই নিকৃষ্ট কীট আমাদের বাসায় এলো। আমি কিছুটা অপ্রকৃতস্থ হয়ে হেড স্যারের  দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। আমার মুখে, চোখে হিংস্রতা ছিলো। আমার মনে হচ্ছিল খুন করে ফেলি হেড স্যারকে। আমাকে আটকে রাখলো সুজনের বাবা। শান্ত চেহারা নিয়ে একটা অমানবিক মানুষ কীভাবে আমাদের দিনের পর দিন ঠকাচ্ছিল তা উপলব্ধি করে ঘৃণায়, অস্বস্তিতে আমার গা গুলিয়ে উঠছিলো। আমরা সেই কীটকে সুজনের সাথে দেখা করতে দেইনি।
স্যার চলে যাবার পর সুজন আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো, কাঁদলো অনেকক্ষণ। আমরা আমাদের নাড়ী ছেঁড়া ধনকে আমাদের ছায়ায় লুকিয়ে রাখলাম। ঐদিনের পর থেকে আমার ছেলে এবং বাড়ির প্রত্যেক শিশুর প্রতি আমি আলাদা করে নজর করা শুরু করলাম।
আমাদের খুব আদরের, স্বপ্নের মানিক আমাদের সন্তানরা। তাদের নিরাপত্তা দেবার দায়িত্বও আমাদের। যে শিশুকে গর্ভে ধারণ করে তিলে তিলে সৃষ্টি করে পৃথিবীর আলো বাতাস দেখালাম সে শিশুকে একটা নিরাপদ আবাস দিতে পারছি না— এই বোধটুকু আমাকে বার বারর নাড়া দিচ্ছে। আমরা আমাদের শিশুকে সুস্থ পরিবেশ দেবার জন্য মামলা করেছি। সেই মামলায় কিন্তু হেড স্যারের শাস্তি হয়নি। সমাজের কথিত ভদ্রলোকেরা তাকে নির্দোষ প্রমাণের জন্য বিভিন্ন পথ অবলম্বন করেছিলো। 
মামলা চলার এই ক’দিন প্রচুর মানুষ এসেছিলো আমাদের বাসায়। সেখানে হেড স্যারের ওয়াইফও ছিলেন। তিনি আমাদের বাসায় এসে আমার ছোট্ট সুজনকে দোষ দিলেন। তার স্বামী এরকম কোনো কাজ করতেই পারে না— এটা তার অন্ধ বিশ্বাস। আমরা তো জানি একটা ভালো মুখের আড়ালে কী করে পশু মনোবৃত্তি থাকে! সেই পশু মনোবৃত্তি মানসিকতা থেকে ছোট্ট ফুটফুটে শিশুরা কীভাবে নিজেদের রক্ষা করবে তা আমি শেখাচ্ছি আমাদের শিশুদের।
আমার যাদু সোনাকে বাবা মা’র প্রতি আস্থা রাখা শেখাচ্ছি। কোথাও কিছু হলে তা মা বাবার সাথে শেয়ার করা শেখাচ্ছি। যে শয়তান আমার ছোট্ট পাখিকে এত কষ্ট দিলো তাকে শাস্তি দিতে পারিনি আমরা। হয়ত আমার সন্তান পারবে। আমি তাকে আগামি দিনের জন্য তৈরি করছি।

লেখাটি ৬,৫৫৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.