হিজাব

Sulatana Rahman
সুলতানা রহমান

সুলতানা রহমান (উইমেন চ্যাপ্টার): চেনা জানা, কাছের-দূরের অনেক নারীর মধ্যে একটা বিশাল পরিবর্তন লক্ষ্য করছি। পরিবর্তনটা হিজাব সংক্রান্ত। হিজাব নিয়ে আমার ব্যক্তিগত ‘ভালো লাগা-খারাপ লাগা’ নেই। এমন কি এ বিষয়টিকে উল্লেখ করার মতোও কিছু মনে হয়না আমার। কিন্তু পরিবর্তনটা চোখে লাগছে।

ম আমেরিকায় থাকে ১৫ বছর ধরে। সেখানকার নাগরিকত্ত্ব পেয়েছেন। দেশে থাকতে তিনি ছিলেন মারাত্ত্বক রকম ফ্যাশন সচেতন। পোষাক আশাক, সাজ সজ্জা ছাড়া তার জীবনে আর কিছু আছে বলে মনে হতোনা। বিদেশ গিয়েও তাই। সেখানকার বাঙ্গালী কমিউনিটিতে তিনি ছিলেন ফ্যাশন আইকন। ৪/৫ মাস পর পর চুলের রঙ বদলাতেন। শিফন জর্জেট শাড়ি ছিলো তার প্রিয় পোষাক। ব্লাউজের গলার ডিজাইনের কথা নাইবা বললাম। দীর্ঘ বিরতির পর মাস দুয়েক আগে তার সঙ্গে ফোনে কথা হলো। জানলাম, বছর খানেক ধরে হিজাব করছেন। শুনে অনাকাঙ্খিত ভাবে আমি উচ্চস্বরে হেসে দিলাম। একি কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে! নানান ধরনের প্রশ্ন করে হিজাবের রহস্য বোঝার চেষ্টা করলাম। ইসলামের দৃষ্টিতে হিজাব নিয়ে এমন নতুন কোনও কথা বলতে পারলোনা যা তিনি আগে জানতেননা। তবে বুঝলাম, বিদেশ বিভূইয়ে তার আত্ত্বপরিচয়ের সংকট রয়েছে। প্রথমত: হিজাব না করার কারনে বিদেশে অনেকেই তাকে ইন্ডিয়ান মনে করে। দ্বিতীয়ত, মুসলিম কিন্তু হিজাব নাই-এই আবার কেমন মুসলিম? এ ধরনের পরোক্ষ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। এখন হিজাব পড়ার পর থেকে তার হয়েছে আরেক বিড়ম্বনা। চেনাজানা মানুষরা কম বেশি সবাই আমার মতো কারন জানতে চায় যা কখনো কখনো কৈফিয়তের পর্যায়ে পড়ে।

এখন বলছি একটি পরিবারের কথা। অত্যন্ত সেক্যুলার একটি পরিবার। ঈদ কুরবানীর মতো পূজাও তাদের কাছে বড় উৎসব। তবে তাদের কিছু গোড়ামি আছে-পীরের কথায় উঠ-বস করেন। কেউ একজন দু:স্বপ্ন দেখেছে, সঙ্গে সঙ্গে ছুটবেন পীরের কাছে। পীর হয়তো বলবেন-জানের ছদগা দিতে-একটা খাসি। দু:স্বপ্ন একটু ছোটোমোটো হলে কিছু টাকা দান খয়রাত করলে চলে। আবার স্বপ্ন যদি ভালো দেখেন তাহলেও শুকরিয়া আদায় করতে যান পীরের বাড়ি। এবং ভালো স্বপ্নের জন্যও আছে ভিন্ন তরিকা। দুই থেকে দশ জন মানুষকে খাওয়ানো বা এ বাবদ কিছু টাকা পীরের দরবারে দান। পীর চর্চা ওই পরিবারে বেশ পুরনো, পীরের আদেশ শীরোধার্য এবং সবাই তা ভক্তি-শ্রদ্ধার সঙ্গেই পালন করেন। তবে আবারও বলছি, পরিবারটি কিন্তু আধুনিক উচ্চ শিক্ষিত এবং সেক্যুলার। গত ৪/৫ বছর ধরে এই পরিবারের সব নারী সদস্যদের মাথায় হিজাব উঠেছে, কিন্তু কারো সাজ সজ্জায় এতোটুকু কমতি পরেনি। বরঞ্চ হিজাবের জন্য নিত্য নতুন ফ্যাশন সামগ্রি সংযুক্ত হয়েছে। একেকটি হিজাবের দামও নেহায়েত কম নয়। তাতে আবার নানান কায়দার, নানান বাহারের পাথর বসানো! একদিন কথাচ্ছলে হিজাব রহস্য জানতে চাইলাম। ‘পড়লে ক্ষতি কি!” জবাব পেলাম। ‘ক্ষতির কথা উঠছে না, শানে নযুল এবং মাজেজা জানতে চাই,” বললাম।

হিজাব সংক্রান্ত ইসলামে দীর্ঘ বয়ান শুনলাম। তবু সন্তুষ্ট হতে না পেরে বললাম-আগে এসব অজানা ছিলো কিনা?

“না, তাও নয়। আগেও জানতাম, মানতাম না। এখন মানছি। ভালো লাগে। জেনে শুনে বুঝে মন থেকে করছি”।

‘বাহ। খুব ভালো। কিন্তু হিজাবের একটি অন্যতম প্রধান কারন অন্য মানুষ যেনো আকৃষ্ট না হয়। কিন্তু এতো চকমকা হিজাব পড়লে তো অন্ধকারেও চোখ ওইসব ঝলমলে পাথরের দিকে যাবে, নাকি?”

“ইসলামে সাজতে তো নিষেধ নেই”।

‘না তা নাই। কিন্তু অন্যকে আকৃষ্ট করার মতো সাজ-সজ্জায় তো নিষেধ আছে, না কি?”কথা আর না বাড়িয়ে প্রসঙ্গ বদলালাম। ‘স্টার প্লাসের কোন কোন সিরিয়াল ভালো লাগে?’

“ষ্টার প্লাস দেখিনা আমি। আমি আর আমার শ্বাশুড়ি দেখি জি বাংলা। আমার জা ষ্টার প্লাসের পোকা”।

এরপর আলোচনা শুরু কোন সিরিয়ালের কোন চরিত্র কি করে, কার পোষাক আশাক বেশি ষ্টাইলিশ। শ্বাশুড়ি, দুই জা, ননদ-একজনকে ছাপিয়ে আরেকজনের বলার তাড়না। এতোক্ষন হিজাব সংক্রান্ত আমার কৌতুলী প্রশ্ন শুনেও যিনি গভীর ভাবে অন্যমনস্ক ছিলেন তিনিও উঠে পড়ে লাগলেন আলোচনায় অংশ নিতে। আবশ্য সেই আলোচনায় আমার ভুমিকা নাটকের মৃত সৈনিকের মতো।

২০০১ এ টুইন টাওয়ারে হামলার পর সারা পৃথিবীতেই মুসলামানদের মধ্যে বিশাল পরিবর্তন এসেছে। সেই পরিবর্তনের অনেকখানি বাহ্যিক, বিশেষ করে পোষাকের পরিবর্তন। এবং তা যে শুধু বাংলাদেশী মুসলমানদের মধ্যে তা নয়। তবে বাংলাদেশের মুসলমানদের পরিবর্তনটা হয়তো বেশি দৃশ্যমান, তা দেশেই হোক আর বিদেশেই হোক। তবে আমার ধারনা, বিদেশের মাটিতে আত্ত্বপরিচয়ের সংকট এবং নি:সঙ্গতা ওই বাহ্যিক পরিবর্তনের অন্যতম কারন। আবার ওইসব প্রবাসী আত্ত্বীয় স্বজনদের প্রভাবে দেশে অবস্থানরত আত্ত্বীয় স্বজনদের পরিবর্তন। আবার সেই পরিবর্তন সাইক্লিক হারে অন্যদেরও প্রভাবিত করে। তবে বাহ্যিক পরিবর্তনটি যতটা দৃশ্যমান, অন্তর্গত পরিবর্তন কতটা-সে সম্পর্কে স্বভাবতই অনুমান করা কঠিন।

তবে হিজাবের পেছনে আরও একটি কারন কয়েকজনের মুখে শুনেছি। চারদিকের ‘বেলাল্লাপনা এবং অশ্লিলতা’ অনেককে হিজাবের প্রতি আকৃষ্ট করেছে। নিজেকে ব্যতিক্রম রাখা এবং ওই দুষ্ট স্রোতে গা ভাসানো থেকে বিরত থাকতেও অনেকে ঢাল হিসেবে হিজাব বেছে নিয়েছে। টিন এজারদের মধ্যে যারা হিজাব করে তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে আমার এমনই ধারনা হয়েছে। কয়েকদিন আগে মোহম্মদপুর ইকবাল রোডে ১৫/১৬ বছরের চারটি মেয়েকে দেখেছিলাম সাইকেল চালাতে। তারা রেস করছিলো। প্যান্ট-টিশার্ট পড়া, মাথায় হিজাব। প্রথমে ভেবেছিলাম, তারা বোধ হয় বিদেশ থেকে এসেছে নয়তো পরিবারের চাপে হিজাব করছে। আমি তাদের কাছে আগুন্তক হলেও খুব সহজ সাবলিল ভাবে তারা আমার সঙ্গে কথা বলেছিলো। এ কথা সেকথার পর হিজাব প্রসঙ্গ তুললাম।

“হিজাব করলে কেউ ফালতু মনে করেনা, উল্টাপাল্টা কথা কথা বলার সাহস পায়না”-তাদের এই এক বক্তব্য।

“তোমাদের যেসব বন্ধবী হিজাব করেনা, তাদের সবাইকে কি উল্টাপাল্টা কথা শুনতে হয়?”

“সবার কথা বলতে পারিনা। তবে অনেকে তো নিজেরাই আলতু-ফালতু কথা বলে, ফালতু লোকের সঙ্গে ঘোরে”, একজন বললো।

কি রকম?

“সারাক্ষন মোবাইলে ছেলেদের সঙ্গে কথা বলে, ৩/৪টা প্রেম করে। কে কয়টা প্রেম করেছে, সেই সব গল্প বলে। ওদের সঙ্গে আমরা মিশিনা”।

তোমাদের সবার মা কি হিজাব করে?

‘আমার আম্মু করেনা। আমি করি, সেইজন্য বকাবকি করে”, বললো একজন।

বকাবকি করে কেনো?

“আম্মু মনে করে আমার মানসিক সমস্যা হইছে”, বলে হাসে মেয়েটি, উচ্চস্বরে হেসে ওঠে বাকী তিন বান্ধবীও।

“ও তো অন্য স্কুলে পড়ে। ক্লাসে ওর কোনও বন্ধু নাই। আমরা ছাড়া ওর আর কোনও বান্ধবীও নাই। অন্য কারো সঙ্গে ও মেশেনা-এইজন্য ওর আম্মু টেনশন করে”, এক বান্ধবী ব্যাখ্যা করলো।

আমিও হেসে হেসে বললাম-‘আত্ত্বীয় স্বজনের বাসায় বেড়াতে যাও না?”

“স্কুল আর কোচিং ছাড়া কারো বাসায় যায়না আপু। বাসায় মেহমান আসলে ও নাকি দরোজা বন্ধ করে বসে থাকে”, সবাই এক সঙ্গে হি হি করে উঠলো। মেয়েটিকে একটু বিব্রত মনে হলো। বললো, “আমার কাউকে ভালো লাগেনা”।

মনে পড়লো আমার এক জুনিয়র নারী সহকর্মীর কথা। সাংবাদিক। ছোট বেলায় বাবা মারা গেছে। এইট-নাইনে পড়ার সময়ই আত্ত্বীয় স্বজন তার বিয়ের জন্য বেশ চাপ দিলো। কিন্তু মেধাবি মেয়েটি কিছুতেই বিয়েতে রাজী হলোনা। বরং বোরখা পড়া শুরু করলো। এরপর অনেক বাধা বিপত্তির মধ্যে কলেজ পেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদিকতা বিভাগে অনার্স, মাষ্টার্স করলো, চাকরি শুরু করলো। তুখোড় রিপোর্টার হিসেবে সুনাম আছে তার। বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তাকে চিনতাম, জুনিয়র হলেও আমার সঙ্গে সখ্যতা ছিলো, বিভিন্ন সময়ে তার সুখ-দুখের কথা আমাকে বলতো। সেই সুবাদেই তার পারিবারিক কিছু কথা আমাকে বলেছিলো। কয়েক বছর আগে একটা এসাইনমেন্টে তার চেহারা দেখার সৌভাগ্য হলো। বললো, “আপু চিনছেন আমাকে?” আমি ‘হ্যা না’ বলে আমতা আমতা করি। পরিচয় শোনার পর প্রথম প্রশ্নটিই ছিলো-‘হিজাব কই তোমার?’ আত্ত্ববিশ্বাসের সঙ্গে বললো, “আমি এখন শক্তিশালী নারী। হিজাব আর দরকার নাই আমার। তাই খুলে ফেলছি”।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.