কমল পর্বতের পথে পথে (২)

ফাতিমা জাহান:

গোয়াংজি প্রদেশে তৃতীয় দিন। রওনা দিলাম আরেকটি মনোরম স্থান ইয়াংশৌ এর উদ্দেশ্যে। লি নদীর কোল ঘেসে অবস্থিত ইয়াংশৌ শহর আর আশপাশের গ্রাম। এ শহরটি বিখ্যাত আমার মতো ব্যাকপ্যাকারদের মতো, যারা পিঠে একটা ব্যাগ ঝুলিয়ে স্বল্প খরচে দুনিয়াটা প্রাণভরে দেখার ইচ্ছে রাখে। তবে এর অপরূপ শোভা দেখার জন্যও পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে পর্যটক আসেন।

গুইলিন শহর থেকে বাসে করে আসতে লাগে দেড় ঘন্টার মতো। হোটেল অনলাইনে বুক করা ছিল। তাই হোটেল রুমে ঢুকে জানালার পর্দা সরাতেই দেখলাম সেই ভূবন ভোলানো পর্বতরাশি। একেকজন আরেকজনকে বিরক্ত না করে সারি সারি গাঢ় সবুজ কারপেট জড়িয়ে আকাশের দিকে মুখ করে আছে।

ইয়াংশৌ আরেকটি কারনে বিখ্যাত, ছোট্ট শহরটি সব ধরনের দূষণমুক্ত, পরিচ্ছন্ন। যদিও গোটা চীনে আমি আমাদের দেশের মতো বায়ু, শব্দ দূষণের চিহ্নমাত্র দেখিনি তাও এদের স্ট্যান্ডার্ডে এ শহরটি দূষণমুক্ত।

বাইরে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিল আর এর মধ্যেই স্বভাবসুলভ হাঁটতে গেলাম ছাতা মাথায়। দুপুরের খাবারের জন্য পৌঁছে গেলাম ওয়েস্ট স্ট্রিট, যা এখনকার সবচেয়ে জমজমাট জায়গা। হোটেল, রেস্তোরাঁ,  স্যুভেনিয়ারের দোকান, কী নেই এখানে! আমি অবশ্য সেখান থেকে একটু দূরে নিরিবিলি গ্রামে একটি হোটেলে উঠেছি।

দুপুরের খাবার খেলাম এখানকার বিখ্যাত ফিস কারি আর ভাত। ৭/৮ ইঞ্চি মাপের কার্প মাছ খেতে আমার বেশ বেগ পেতে হলো। হালকা মসলাদার এ ডিশটি ট্রাভেলারদের জন্য উপযুক্ত খাবার। মসলা বলতে পেঁয়াজ, কাটা আদা রসুন, টমেটো আর ধনেপাতা। খেয়ে হাঁটতে লাগলাম রাস্তা ধরে লি নদী পর্যন্ত। নদীর পার ধরে হাঁটলাম সন্ধ্যা অবধি।

পরদিন একটা মোটরবাইক ভাড়া করলাম আশপাশের গ্রাম আর দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার জন্য। এখানকার মোটরবাইক দেখে আমি খুব কনভিন্সড। যেহেতু পাহাড়ি এলাকা আর যখন-তখন বৃষ্টি হয়, তাই বাইকে ছাতা লাগানো আছে। চীন দেশে যতোই ঘুরছি, ততোই বিস্মিত হচ্ছি। জনসাধারণের সুবিধার জন্য কতো পদ্ধতিই না আছে!

শুরু করলাম যাত্রা ‘মুন হিল’ এর দিকে, যা শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। মোটরবাইক চালাতে চালাতে পথ জুড়ে মনে হলো প্রকৃতি যেন সকল সৌন্দর্য্য উজাড় করে দিয়েছে। পথে পদ্মপুকুর দেখে থামলাম। বিশাল এলাকা জুড়ে শুধুই পদ্মফুল, যা আমি আগে কখনো দেখিনি। খানিক এগিয়ে দেখলাম ‘বাটারফ্লাই হিল’, থামলাম ভেতরে যাবার জন্য। খানিকটা পাহাড় বেয়ে উঠে চারপাশের দৃশ্য দেখে ছুটলাম মুন হিলের দিকে। মুন হিলে প্রবেশমূল্য ৫০ ইউয়ান। টিকেট কেটে ভেতরে না গেলে হয়তোবা বুঝতেই পারতাম না যে ভেতরের পাহাড়টি কত মনোরম। পাথুরে পাহাড়ের ঠিক মাঝখানে গোলাকার চাঁদের মতো ছেদ। দেখলে তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছে করে চাঁদ ভেবে।

এরপর ঘুরতে লাগলাম সেই গ্রামেই। নারী-পুরুষ সকলেই চাষাবাদের কাজে ব্যস্ত। পরিবারের বয়স্করা তখন বাড়িতে তাদের নাতি-নাতনিদের দেখাশোনার কাজ করেন। প্রত্যেকটি গ্রামের রাস্তাঘাট পাকা এবং বাড়িগুলো আমাদের দেশের শহরের মতো দ্বিতল বা ত্রিতল। আরো বিস্মিত হলাম, যখন দেখলাম কৃষকদের বাড়িতে নাগরিক সকল সুবিধা উপলব্ধ, এই যেমন টিভি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, এসি ইত্যাদি। একটা দেশ কতখানি উন্নতি করলে তবেই গ্রামের সাধারণ চাষীদের ঘরে সকল সুখ-সুবিধা এনে দিতে পারে তাই ভাবছিলাম। কৃষকদের মধ্যে দু একজন ভাঙা ভাঙা ইংরেজি জানেন, তাদের সাথে খানিকক্ষণ আলাপ হলো।

সারাদিন পাহাড় আর গ্রামবাসীদের সাথে মিতালী করে সন্ধ্যায় ফিরে এলাম। এসে হোটেল লবিতে বসে চীন দেশের বিখ্যাত চা পান করতে করতে হোটেল মালিকদের একজনের সাথে আলাপ হলো। তাঁর নাম আছুং, বয়স আমার মতোই হবে, আরো জানলাম তিনি মাউন্টেন ক্লাইম্বিং করেন এবং আনন্দের বিষয় তিনি ইংরেজি জানেন। তাকে অনুরোধ করলাম কাছে কোথায় ক্লাইম্বিং করা যায় জানাতে। তিনি সাথে সাথে একজন রক ক্লাইম্বিং অর্গানাইজারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তো ঠিক হলো পরদিন সারাদিনের জন্য নিরুদ্দেশ হবো রক ক্লাইম্বিং করতে।

পরদিন ভোরে সাইকেল চালিয়ে (যা হোটেল থেকে ফ্রিতে পাওয়া যায়) চলে গেলাম অর্গানাইজারের অফিসে, সেখান থেকে আমিসহ আরো আটজন ক্লাইম্বার প্রয়োজনীয় ক্লাইম্বিং গিয়ার সংগ্রহ করে দলবেঁধে সাইকেল বহর নিয়ে গেলাম ডিসুই রোডে। সেখানে সাইকেল রেখে কিছু হাঁটা পথ পাড়ি দিয়ে শুরু হলো চুনাপাথরের তৈরি গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টিতে পিচ্ছিল পাহাড় চড়া।

পাহাড়ের একদম উপরে উঠতে ঘন্টা দেড়েক লাগে আর সেখান থেকে পুরো ইয়াংশৌ শহর দেখা যায়। একারণেই এ শহরকে রক ক্লাইম্বারদের ‘মক্কা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। পাহাড়ের চূড়ায় উঠে চারপাশ দেখে, সংগে আনা স্ন্যাকস খেতে খেতে অন্যান্য সাথীদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে দুপুর গড়িয়ে গেল। সূর্যাস্ত দেখে তারপর হোটেলে ফিরলাম।

গোয়াংজি প্রদেশে আমার ষষ্ঠ দিন। এখানকার বিখ্যাত ফিশিং ভিলেইজ না দেখে যাওয়া মানে মক্কাতীর্থে এসে মদিনায় না গিয়ে ফিরে আসা। কারণ এ গ্রামের একটি বিশেষ পাহাড়ি  জায়গার ছবি চীনা মুদ্রা কুড়ি ইউয়ানে ছাপা আছে। গুঁড়িগুঁড়ি বৃৃষ্টিতেই বেরিয়ে পড়লাম শিংপিং ফিশিং ভিলেইজ দেখতে। ইয়াংশৌ থেকে বাসে করে যেতে লাগে প্রায় এক ঘন্টা। কেউ ইচ্ছে করলে ট্যাক্সি করেও যেতে পারেন, তবে ইয়াংশৌর ট্যাক্সি ভাড়া চীনের অন্যান্য শহরের চেয়ে অনেক বেশি, তাই আমি পাবলিক ট্রান্সপোর্টে চলাফেরা করার সিদ্ধান্ত নিলাম। যেহেতু আমাদের দেশের বাসে চলাচলের মতো বিপত্তিকর পরিস্থিতি যেমন মেয়েদের গায়ে হাত দেয়া উত্যক্ত করা বা চোখ দিয়ে গিলে ফেলার মতো পরিস্থিতির সম্ভাবনা নেই, তাই নিশ্চিন্তে বাস ভ্রমণ শংকাহীন, আরামদায়ক।

বাস থেকে নেমে হেঁটে প্রথমেই চলে গেলাম সেই বিখ্যাত দৃশ্য দেখতে যা কুড়ি ইউয়ান নোটে ছাপা আছে। সেখান থেকে চলে গেলাম জেলেদের গ্রামে। পথে খানিকটা শপিং সারলাম। হাতে বোনা গায়ের চাদর, স্যুভিনিয়র ইত্যাদি কিনলাম।

জেলেদের গ্রাম ভীষণ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন আর আধুনিক। আমি খুঁজছিলাম এমন কাউকে যিনি ইংরেজি জানেন। আর আগে থেকেই ঠিক করেছিলাম এখানকার এক জেলে পরিবারের একদিনে অতিথি হয়ে যাবো। সেরকম ব্যবস্থা এখানে নেই, তবে ইয়াংশৌতে এক ভারতীয় ব্যবসায়ীর সাথে পরিচয় হওয়ায় তিনি আমাকে ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।

যাদের অতিথি হলাম সে পরিবারের নাম আমিং, যৌথ পরিবার। ভীষণ হাসিখুশী পরিবার। অবশ্য চীন দেশের সব পরিবারই সুখী যৌথ পরিবার। বাড়িতে প্রবেশ করতেই বিভিন্ন রকমের ফল ও কেক দিয়ে আপ্যায়ন করালো। এরপর দুপুরে ভাতের সাথে কয়েক রকমের সবজি, বেশিরভাগই সেদ্ধ আর মাছ পরিবেশন করলো। খেতে খেতে তাদের পরিবারের আটজনের সাথে লাইফস্টাইল, উৎসব, সামাজিক ব্যবস্থা ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা হলো। কেউই ইংরেজি জানেন না শুধু ১৪ বছরের লি ছাড়া, তিনিই ভাষান্তরের কাজ করছিলেন।

আরেকটা কথা, জেলে বাড়িতে কিন্তু এক ফোঁটা মাছের গন্ধ ছিলো না।

বিকেলে চলে গেলাম মাছ ধরা দেখতে। লি নদীতে জেলেরা সন্ধ্যা থেকে লন্ঠন জ্বালিয়ে মাছ ধরেন। মাছ ধরার জন্য এখানে করমোরেন্ট নামের এক পাখি ব্যবহার করেন, আর সেটা দেখার জন্যই আমি মাছ ধরা দেখায় এতো আগ্রহী। পাখির গলায় প্রথমে সূতো বাঁধা হয়, যাতে জলের নীচে গিয়ে পাখি মাছকে পুরোপুরি গিলে ফেলতে না পারে আর জেলেরা যেটা পরে জলের উপর থেকে সংগ্রহ করে নেয়। জেলেদের পোষা এ পাখিগুলো তাই জলের নিচ থেকে সোজা জেলেদের কাছেই ফিরে আসে। জেলেরা মাছ ধরার জন্য বাঁশের তৈরি ভেলা ব্যবহার করেন।

মাছ ধরা দেখে ফিরে গেলাম আমার হোস্টের ডেরায়। রাতে খেলাম মাছের তৈরি নুডল স্যুপ। খেতে অসাধারণ। পরদিন সকালে আমিং পরিবারকে বিদায় জানিয়ে আর দুহাত ভরে তাদের দেয়া উপহার আর মন ভরে মানুষের ভালবাসা নিয়ে বাসে চেপে রওনা দিলাম গুইলিন এয়ারপোর্ট এর উদ্দেশ্যে। পরবর্তী গন্তব্য চীনের ঐতিহাসিক শহর শিয়ান।

উল্লেখযোগ্য তথ্য:

গুইলিন শহরে চীনের যেকোন শহর থেকে ট্রেন বা প্লেনে যাওয়া যায়। যেকোনো শহরের হোটেল স্টাফরা টিকেটের ব্যবস্থা করে দিতে পারেন।

গুইলিন শহরে প্রায় ৪০ টির মত পাঁচ তারা আর কয়েকশত চার/ তিন তারা হোটেল আছে যা অনলাইনে বুক করা যায় আগে থেকেই।

ইয়াংশৌ শহরে বেশ কিছু পাঁচ তারা মানের হোটেল আছে, আর পাশাপাশি সব বাজেটের হোটেল / হোস্টেল তো আছেই।

শিংপিং গ্রামেও কিছু উন্নত মানের হোটেল আছে।

ফাতিমা জাহান, [email protected]

শেয়ার করুন:
  • 73
  •  
  •  
  •  
  •  
    73
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.