মানুষ যখন পোশাকের ফাঁদে

শিল্পী জলি:

আমেরিকার যে শহরে আমি থাকি সেখানে বাঙালি বলতে আমি একা। কোনো ইন্ডিয়ান বা পাকিস্তানিও নেই। থাকার মধ্যে আছে প্রধানত সাদা প্রজাতির আমেরিকান এবং কিছু মেক্সিকান। আমার যেটুকু সামাজিক চলাফেরা তাদের সাথেই, কেননা দেশীয় বাঙালীদের বসবাস আমার থেকে ২০/২৫ মাইল দূরে।

গতকাল কাজের খাতিরে গিয়েছিলাম একটি হাসপাতালে। কাজ শেষে হাসপাতালের মাঠটিতে এসে কিছুটা সময় আতিকের অপেক্ষায় বসে থাকি। অতঃপর সময়ের ভারে ঘাসের মধ্যেই শুয়ে পড়ি। পাশাপাশি হাত/কাঁধ/পিঠের ব্যায়াম চালিয়ে যাই। নতুন জায়গা, পার্কিং আছে কিনা ভেবে নিজের গাড়িটি নেয়া হয়নি, তাই এই পরনির্ভরশীলতা।

তখন প্রায় সাড়ে এগারটা বেজে গিয়েছে। চারিদিকে কড়কড়ে, টাটকা রোদ। দেখলাম, কাজ থেকে একজন মহিলা এবং পুরুষ কথা বলতে বলতে বের হয়ে এলেন। দুজনই নীল পোশাক পরা- একই কাট। দুজনই ফতুয়া টাইপের জামাটি পাজামার মধ্যে ঢুকিয়ে পরেছেন। অর্থাৎ তাদের কাজের পোশাকের ওটাই নিয়ম।

তারা ভিন্ন দুই লিঙ্গের মানুষ হয়ে একই রকমের পোশাক পরলেও কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছে না, বরং অন্য একটি বিষয় নিয়ে গভীর আলোচনায় মগ্ন। হয়তো সম্পাদিত কাজের সুবিধা/অসুবিধা এবং মান নিয়ে আলোচনা করছেন। ওটুকু সময়েই নানা বয়সী নারীদের দেখলাম। নানা কাজে মগ্ন তারা। সত্তর/পঁচাত্তর বছর বয়সী একজন নারী শর্টস এবং স্যান্ডো গেঞ্জি পরে দ্রুততার সাথে ব্যায়ামের হাঁটা হেঁটে যাচ্ছেন। আরেকজন আবার সরাসরি ব্যায়ামেই লিপ্ত। দুজন মেয়ে লাঞ্চ ব্রেকে এসে হাসপাতালের ধূমপান নিষিদ্ধ এলাকা পার হয়ে রাস্তায় উঠেই সিগারেট ধরালো। সামার আবহাওয়া থাকায় প্রায় প্রতিটি মেয়েই হাতা কাটা গেঞ্জি এবং শর্টস পরা– তিনি মাই হোন বা দাদিই হোন এবং বয়স আশি বা নব্বই যাই হোক না কেন, কাজ ছাড়া এই আবহাওয়ায় এখানে এগুলোই এখন সাধারণ পোশাক

দিন পাঁচেক আগে চাকরির মেডিক্যাল করাতে গিয়ে ফেরার পথে দুটি ছবি তুলি। ফেসবুকে পোস্ট করতেই এক বাঙালি ইংরেজীতে লিখলেন, বুবস ! ভুলেই গিয়েছিলাম নিজেকে এভাবে খণ্ডিত চিত্রে দেখার কথা। কমেন্ট পড়তেই চমকে উঠে ভাবলাম, বলে কী, ছিঃ, আমার আমেরিকান বান্ধবীরা এই মন্তব্য পড়লে আমার দেশ সম্পর্কে কী ভাববে? তারা কী ভাববে না বাংলাদেশী ছেলেরা জীবনে কোনদিন বুবস দেখেনি, অথবা দেখলেও এখনও বুবসের চক্কর থেকে বের হয়ে এসে জীবনে অগ্রসর হতে পারেনি?

মেয়ে হলে বুবস থাকবে, এটাই কী স্বাভাবিক নয়?

কোনো কথা না বাড়িয়ে ঝটপট কমেন্টটি ডিলিট করে দিলাম।

দম নিয়ে বসতে না বসতেই ছেলেটি আবার কমেন্ট করলো ব্রা‘ ! তাও ইংরেজিতে।

ভাবলাম, খাইছে এভাবে সে যদি সামাজিক মাধ্যমে মন্তব্যের ঘরে বুবস, ব্রার চক্করে পড়ে থাকে, তাকে অচিরেই ব্লক করতে হবে। তবুও আরেকবার ভদ্রতা শেখার সুযোগ দিয়ে ব্রা-কমেন্টটিকেও ডিলিট করলাম। এবার সে কমেন্টে হাসলো হা হা হা

মনে মনে ভাবলাম, তুমি যা বলছো সেই মানসিকতাকে বহু আগেই আমি অতিক্রম করেছি, এখন আর লক্ষ্য পূরণ হবে না।

উল্লেখ্য, ভারতে নাটক/সিরিয়ালে অতি দেশীয় ফ্যাশনে অভ্যস্ত মেয়েদেরকে যেমন বহিন জীবলা হয়, এখানে এদেশীয়দের চোখে আমার পোশাক/আষাকের ধরনও অনেকটা তেমনই– এক কথায় বাংলাদেশের শাড়ির মতো। সেখানে তারা যদি এসব কমেন্টস দেখে বুঝতেই পারবে না সমস্যা কোথায়? গোল বাঁধলো কী করে !

যাই হোক, ঐ সাধারণ দুটি ছবিতে ছেলেদের যতো পছন্দ, মন্তব্য, কটাক্ষ, এবং আগ্রহ দেখলাম, তাতে রীতিমতো হোঁচট খেয়েছি। কেউ একজন আবার লিখেছেন ইনডিসেন্ট। উদাহরণ উপমাও টেনেছেন তার আত্মীয় স্বজনদের ইউরোপ/আমেরিকাতে চলাফেরা নিয়ে। আবার দাবিও করেছেন, তিনি নাকি মেয়েদেরকে চাপিয়ে রাখা নয়, বরং তাদের স্বাধীনতাকেই অধিকতর গুরুত্ব দেন।

তবে তাদের মন্তব্য পড়ে যে কারোরই মনে হবে, তারা চান দেশে বা বিদেশে মেয়েরা হয় হিজাব ধরুক, অথবা ব্রেস্ট চেছে রেখে চলাচল করুক। সেটা যেহেতু সম্ভব নয়, তাই ওড়না তো পরতেই হবে। এমনকি চাকরির ক্ষেত্রেও– তাদের আত্মীয়রাও যে পরেন। অতএব চলাচল শিখতে হবে তাদের আত্মীয়দের কাছে! অথচ ইউরোপ বা আমেরিকায় অনেক চাকরিতেই ড্রেস কোড থাকে। তবুও তারা ওড়না পরিয়েই ছাড়বেন। কেননা তারা মেয়ে দেখলে চব্বিশ ঘন্টাই উত্তেজনায় থাকেন এবং তাদের আত্মীয়রাও ঐ একই চিন্তার ধারক এবং বাহক। অতএব ওটাই একমাত্র সমাধান

মেয়েদের বুকপাছু শরীরেরই দুটো প্রয়োজনীয় অঙ্গ। এর প্রতি যে ছেলেরা সময়ে /অসময়ে আকর্ষণ/বিকর্ষণ অনুভব করেন এটারও সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়। তবে তাদের আশেপাশে মেয়ের বংশ না থাকলেও ঘুমের মধ্যেও উত্তেজনা এসে যে কল্পনায় নারীর আগমন ঘটিয়ে কাল্পনিক সঙ্গমের ঘটনা ঘটাতে পারে, সেটাও অনেকেরই জানা, যাকে ইংরেজিতে বলে নকটারনাল ইমিশন। শরীরে যদি নিয়মিত টেসটসটরনের উৎপাদন অব্যহত থাকে তাহলে এটা স্বাভাবিক ঘটনা। আবার শরীরে টেসটসটরনের যদি ঘাটতি থাকে, তাহলে কোনো মেয়ে বাস্তবে নগ্ন হয়ে এসে জড়িয়ে ধরলেও বাবারে-মারে বলে দৌঁড়ে পালাবে ছেলেরা, সেটাও স্বাভাবিক। অর্থাৎ ছেলেদের শরীরের ভারসাম্য না থাকলে মেয়েদের শরীর তাদেরকে প্রভাবিত করতে পারে না। তাই যারা মেয়েদের শরীর দেখে উত্তেজনা অনুভব করে নিজেদেরকে রোধ করতে না পেরে একেবারে কাঁত হয়ে পড়েন তাদের দুটি বিষয় ভাবার আছে। এক, শরীর এখনও ১০০ % ঠিক আছে। দুই, পড়ালেখা বা কাজে ফাঁকি দিয়ে অকাজ বেশি করা হচ্ছে

জীবনে নারী-পুরুষের মাঝে আকর্ষণ-বিকর্ষণ, একটি বিশেষ সম্পর্কের আদানপ্রদান, এবং বন্ধন থাকলেও ওটিই মানুষের পুরো জীবন নয়। কেননা চব্বিশ ঘন্টায় ঐ আদানপ্রদানের ক্ষণটি ১০ মিনিটেরও কম। অথচ ঐ দশ মিনিটের দোহাই দিয়েই পরতে পরতে নারীকে পেঁচিয়ে রাখার পাঁয়তারা চলে নানা ছলছুতায় !

আর কতকাল চলবে এসব? পোশাক একটি নির্জীব পরিধেয় বস্তুমাত্র। দেশ, কাল, পাত্র,পরিবেশ, ধর্ম, বর্ণ, সময়, আবহাওয়া, প্রয়োজন, কর্মভেদে অহরহ পোশাকের ধরনধারণ বদলে যায়। আবার এই বদল ঘটাতে দু’মিনিটও লাগে না। অথচ এই পরিধেয় বস্তুটিকেই প্রধান মূল্যায়ণের মানদণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করে একজন নারীকে পদে পদে মূল্যায়ণ করা হয়, কিন্তু একজন পুরুষকে নয়! আর ধর্ম এবং সমাজে একজন নারীকে এভাবে একটি সেক্স অবজেক্ট হিসেবে উপস্হাপন এবং চিন্তাচেতনা নারীকে হাজার বছর পিছিয়ে দেয়

শেয়ার করুন:
  • 193
  •  
  •  
  •  
  •  
    193
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.