কালশিটে দাগ নিয়েও দীপারা বাঁচে (পর্ব ৩ ও ৪)

0
মালবিকা লাবণি শীলা:
৩.
পড়া শেষে দীপা ঢাকার বাইরে একটি কলেজে শিক্ষকতা শুরু করলো। ভেবেছে ছাত্রদের ঠিকমতো গড়ে তুলতে পারলে এরাই হয়তো সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারবে। একা থাকলেও তো সমস্যা নেই। কিন্তু ভাবা আর তা কাজে প্রয়োগ করার মধ্যে যে কতো পার্থক্য তা বুঝতে পারলো কিছুদিনের মধ্যেই।
প্রথম সমস্যা হলো থাকা। একা একটি মেয়েকে বাসা ভাড়া দেবে সেরকম সহানুভূতিশীল অথবা সাহসী বাড়িওয়ালা পাওয়াই দুস্কর। সেই মেয়ের যতোই অর্থনৈতিক নিরাপত্তা থাকুক না কেন! সামাজিক ভাবে বিবাহিতের তকমা সাঁটা না থাকা অথবা স্বামী নামক ডাকটিকেটটি ছাড়া প্রাপকহীন বেয়ারিং চিঠির দশা হলো দীপার।

এক সহকর্মীর বাসায় সাব-লেটে থাকাই ঠিক হলো। পরিবার নিয়ে থাকা এই সহকর্মীই দীপার ত্রাণকর্তা। পর হলেও পুরুষ তো! তার ওপর নতুন যন্ত্রণা হলো অবিবাহিত থেকে বিবাহিত সব পুরুষের উথলে ওঠা প্রেম! একটার পর একটা বিয়ের প্রস্তাব। আপুও ওদিকে অস্থির হয়ে আছে। সবাই আদাজল খেয়ে ওর পেছনে লেগেছে! দীপার মাঝে মাঝেই মনে হয় সব ছেড়ে চলে যায় যেদিকে খুশী! ভাবলেই যে সব করা যায়না তা এতো দিনে বুঝে গেছে দীপা। বছরখানেক সবার সাথে বিভিন্ন যুদ্ধে ক্লান্ত বিধ্বস্ত দীপা ভাবে, আর কতো!

এর মাঝে ঘটা একটি ঘটনায় দীপার মানসিক জোরের শেষ খুঁটিটাও সমূলে উপড়ে যায়। সেদিন বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে ছোট্ট শহরটা পার হয়ে একটু দুরেই চলে গিয়েছিলো ও, সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিলো। বনের পাশ দিয়ে অন্ধকার রাস্তা দিয়ে দ্রুত হেঁটে আসতে গিয়ে মনে মনে ভাবছিলো দীপা এ সময় পাশে কেউ থাকলে খুব একটা খারাপ হতো না। মোড় ঘোরার সাথে সাথেই সামনে পড়ে যায় কয়েকজন ছেলের। কেন জানি মনে হচ্ছিলো ওরা দীপার অপেক্ষাতেই ছিলো। কোনো একটি উদ্দেশ্য নিয়ে ওরা এগিয়ে আসছে। সহজাত প্রবৃত্তি থেকেই বোঝে দীপা, উদ্দেশ্যটি মহৎ নয়। আধো অন্ধকারে আবছায়া শরীরগুলো দূরত্ব কমিয়ে আনছে। চিৎকার করে উঠতে চায় দীপা। পায়ে বা গলায় কোনো জোর নেই ওর..!

৪.

ছায়া শরীরগুলো এগিয়ে এসে দুজন দীপার দু’হাত শক্ত করে ধরে। এতোক্ষণের স্বর বের না হওয়া কণ্ঠ চিড়ে একটা চিৎকার বেরিয়ে আসে দীপার। সন্ধ্যার নিস্তব্ধতা খান খান হয়ে ভেঙে পড়ে। কয়েকটা পাখি ছটফটিয়ে উড়ে যায়। একজন ওর মুখ চেপে ধরে। টেনে বনের ভেতর নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে ওকে। দীপা প্রাণপণে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। পাশের গ্রামের হাট থেকে ফিরতে থাকা কিছু লোকের কানে ওর চিৎকার পৌঁছোয়। ওরা শব্দের উৎস লক্ষ্য করে হৈ হৈ করে ছুটে আসে। বেগতিক দেখে ছেলেগুলো দীপাকে রেখে পালায়। দীপা ঝড়ের পরে ভেজা পাখির ছানার মতো কাঁপছে।

হাটুরে লোকগুলো এসে ওকে রাস্তায় বসে থাকতে দেখে বুঝতে পারে কী ঘটতে যাচ্ছিলো। ওরা ওকে বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। উপদেশসহ, একলা মেয়েমানুষ রাস্তায় বেরুনো ঠিক না। বাসায় এসে রক্তশূন্য ফ্যাকাশে মুখে সহকর্মীর অতি উৎসাহী বৌকে ঘটনাটা জানাতেই হয়। ছোট শহরে এই ঘটনা অনেকেই জেনে যায়। ডালপালা বিস্তার করে। মুখে সহানুভূতি ফুটিয়ে কেউ কেউ জানতে চায় যখন ওকে উদ্ধার করা হয় ওর পরনে নাকি কিছুই ছিলো না! গুজবের জোর আপুকে টেনে আনে। কলেজ থেকে ছুটি নিয়ে ঢাকা আসতে হয় আপুর সাথে। সব স্বাভাবিক আছে এই ভাব নিয়ে চলতে হয়। আজিজ সুপার মার্কেটে প্রিয় বইয়ের দোকান ঘুরে ঘুরে বই কেনে আর ভাবে দীপা কিভাবে এই শহরকে ছেড়ে ছিলো ও, কিভাবে ঢাকাকে ছেড়ে থাকা যায়?

দুলাভাইয়ের এক বন্ধুর বোনের বিয়ে। দীপা অনেক মানা করার পরেও ওকে বাধ্য হয়েই যেতে হয়। এর পেছনে যে আরো কোনো গভীর ষড়যন্ত্র থাকতে পারে তা ধারণাও করতে পারেনি ও। অনেকের সাথেই পরিচিত হতে হয়। তাদের একজন পাত্রের বন্ধু মহসীন। সফল ব্যাবসায়ী, দীপার চেয়ে বছর পাঁচেকের বড়, খুব সুন্দর চোখ! ঘরের অন্য প্রান্ত থেকেও ওর চঞ্চল দৃষ্টি বারবার দীপার ওপর এসেই স্থির হচ্ছিলো। কিছুটা অস্বস্তি আর অনেকটা ভালোলাগা ছুঁয়ে যাচ্ছিলো দীপাকে।

বাসায় এসে একথা ওকথার পর আপু জিজ্ঞেস করেই বসলো, মহসীনকে কেমন লেগেছে দীপার। ওদের নাকি দীপাকে ভীষণ ভালো লেগেছে। এখন দীপা রাজি হলে খুব দ্রুত বিয়েটা সারতে আগ্রহী ওরা। তার আগে অবশ্যই একে অপরকে জানার সুযোগ পাবে। যুদ্ধে হেরে যাওয়া সেনাপতির মতো দীপা রাজি হয়। আগ্রহ যে ওরও কম তা নয়। কয়েকদিন পর মহসীন ওর ভাই ভাবীকে নিয়ে বিকেলের নাস্তা খেতে খেতে কথা বলে ওদের সাথে। এক পর্যায়ে দীপা আবিষ্কার করে ঘরে মহসীন ছাড়া আর কেউ নেই। মহসীন জানতে চায় দীপা কি আবারো আগের কলেজেই ফিরে যাবে কি না! দীপা নিজেও এ প্রশ্নের উত্তর জানে না। হয়তো এখন থেকে দীপাকে ঢাকাতেই থাকতে হবে- এরকম একটা কথা বলে নিজেই অপ্রস্তুত হয়ে যায় মহসীন।
কয়েকদিন পর দীপাকে নিয়ে বের হয় মহসীন। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গাড়ি রেখে হেঁটে বেড়ায় ওরা। চারুকলার সামনে দিয়ে হেঁটে হেঁটে শাহবাগের দিকে, মালঞ্চ থেকে ফুল কিনতে গেলে দীপা বলে বেলী ফুলের মালা ওর খুব প্রিয়। অনেকগুলো মালা কেনে মহসীন। বাসায় ফেরার পথে বেলীর গন্ধ আর অসম্ভব ভালোলাগায় আচ্ছন্ন থাকে দীপা। মহসীনের ওপর একটা গভীর ভালোলাগায় ছেয়ে যাচ্ছে দীপার মন।
(চলবে)
আগের পর্বের লিংক: https://womenchapter.com/views/21309

লেখাটি ১,৩২৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.