নারীর যৌন-প্রজনন অধিকার, সহবাস ও নির্যাতন: প্রেক্ষিত ধর্ম 

ঈশিতা বিনতে শিরীন নজরুল:
১.
একটি গবেষণা কাজের জন্য বেশ কিছুদিন এইচআইভি পজেটিভ ব্যক্তিদের কাছাকাছি হওয়ার সুযোগ ঘটেছিল। প্রত্যেকের দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা ভয়াবহ। তাদের ভেতরে নারীদের অবস্থান যেন একটু বেশিই ‘অভিশপ্ত’!
কেন বলছি? অনেককেই খুঁজে পেয়েছিলাম যাদের বাধ্য হয়ে স্বামীর সাথে সহবাস করতে হয়েছিল; স্বামীই পরম দেবতা বলে কথা!!  ছোটবেলা থেকে তো তাদেরকে সেটিই শেখানো হয়েছিল, তাই তো স্বাস্থ্যকর্মীদের নিষেধ শুনে তারা পাপ করতে চায়নি যেখানে তাদের স্বামীরা চেয়েছে সহবাস করতে! তবে, এমনও আছে যারা চেয়েছিল প্রতিবাদ করতে, যারা চায়নি মানা সত্ত্বেও সহবাস করতে!! কিন্তু একে তো সে ঘরের বউ, তার ওপরে আবার ‘মেয়েমানুষ’। ‘মেয়েমানুষে‘র আবার ইচ্ছা-অনিচ্ছা কী রে ভাই!! 
সেই নারীরা অামাকে জানিয়েছিল যে, “আমারে তো ডাক্তার আফারা মানা কইরা গেছিলো, কিন্তু হ্যায় তো আমার কথা মানে না। হ্যায় কইছে, চুপ কইরা থাক। তুই আমার বউ, আমার কথা মানবি। মাইনষের কথা এতো ধরছস ক্যান?’’ এই ব্যক্তি হাজার কনসালটেন্সির পরেও কনডম ব্যবহার করেনি। ফলে উনি মারা গেছেন আর ভাইরাসটি নিষ্ঠার সাথে দিয়ে গিয়েছেন তার স্ত্রীকে, যাকে স্বামীর অনুপস্থিতিতে দুই সন্তানের দেখাশোনা করতে হয়। গ্রামের সবাই এই মহিলাকে ‘খারাপ মেয়েছেলে’ মনে করে। কারণ তারা জানে যে স্বামী ছাড়া অন্য কারও সাথে শুলেই বা অনেক পুরুষের সাথে শুলেই এই ‘রোগ’ হয়।
২.
অনেকেই আবার ধর্মের প্রসঙ্গ নিয়ে আসেন, ধর্মে স্ত্রীকে সহবাসে বাধ্য বলা হয়েছে। যাদের সাথে কথা বলেছিলাম, তারাও বলেছে যে, ‘আপা, ধর্মে তো আছে, স্বামীর কথা শুইন্যা চলতে হইবো। এখন না শুইন্যা কি পাপের ভাগী হমু নাকি?’ কী করে যে বলি তাদেরকে পাপের ভাগী হতে! কী আর হবে বলুন, এইচআইভি সংক্রমণের পরে শুধুমাত্র সমাজের সবার থেকে ‘নষ্ট মেয়েমানুষ’ কথাটি শুনতে হবে স্বামী মারা যাবার পরে, সবাই একঘরে করে দিবে গ্রামীণ সমাজে…. সন্তানের ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়বে!!! কী আর করা, পতিদেবতার জন্য এইটুকু করলে নিশ্চয়ই পরকালে বিশেষ পুরস্কারের ব্যবস্থা রয়েছে!!
৩.
ধর্মের দোহাই যখন সবাই দেন, তো আমিও দিয়ে দেখি। ‘কোন স্ত্রী যদি তার স্বামীর বিছানা পরিহার করে রাত কাটায় তবে ফেরেশতারা সকাল পর্যন্ত তাকে অভিশাপ দিতে থাকে। (মুসলিম, হাদিসের ইংরেজি অনুবাদ-৩৩৬৬)’ । ঠিক ঠিক, স্ত্রীর কথা তো বলেনি এখানে। স্ত্রীর যেন যৌন আকাঙক্ষা হতেই পারে না! 
ধরুন, ‘ভুলবশতঃই’ স্ত্রীর যদি স্বামীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতে প্রথমে ইচ্ছা করে, তাহলে? ধরুন স্বামী যদি স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক স্থাপনে রাজী না হন,সেক্ষেত্রেও কি ফেরেশতাগণ স্বামীকে সারা রাত অভিশাপ দিতেই থাকবে?? এই বিষয়টি আমি জানি না; তবে কিছু হাদীস আমিও জানি…..  আপনারা কেন এসব হাদীসের উল্লেখ করেন না ধর্মের সাফাই গাওয়া ভাইবোনেরা?
বুখারি, হাদিস নং -১৮৬৭,  মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং- ৬৪৪১,মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, হাদিস নং: ১২৫৮৮ ইত্যাদি অনেক হাদীসেই বলা হয়েছে স্ত্রীর যৌন চাহিদাকে সম্মান করার প্রসঙ্গে অর্থাৎ স্ত্রী আগ্রহী হলেও স্বামীকে একইভাবে সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে হবে, যেমনটি স্বামীর ক্ষেত্রেও বলা হয়েছে। এমনকি স্ত্রীকে ও পরিবারকে সময় দেবার প্রসঙ্গকেও সুন্নাত হিসেবে বলা হয়েছে। যে ব্যক্তি আমার সুন্নতের প্রতি আগ্রহ রাখে না সে আমার দলভুক্ত না। [মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং- ৬৪৪১]
৪.
নারীদের নিয়ে কিছু বললেই যেন সবাই খাই খাই করে তেড়ে আসে!!  কতো কথাই বলে, কতো যুক্তিই না দেখায়। সেইসব কথাই ধর্মের জ্ঞানেই আটকে যায়। আমরা এতোই কম জানি, ধর্ম নিয়ে কিছু বলতেও পারি না। অন্তত আমি তো কম জানি….  তবে একজন গবেষক হিসেবে অামি জানি, আমি দেখেছি যে, সহবাস তো ছেড়েই দিলাম, নারীর যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য পর্যন্ত কতোটা নাজুক ও অবহেলিত!! নারীর যে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার রয়েছে, সেটি তো কোনো নারীই বিশ্বাস করতে চায় না। বলতে গিয়ে কতবার তো উল্টো আমিই খারাপ হয়ে গিয়েছি!! 
অাপনি কি জানেন, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার যে নারীরও রয়েছে? অথবা আপনি কি জানেন যে, আসলে এটি কি?
যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার হলো নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে যৌন ও প্রজনন সংক্রান্ত যেকোনো প্রসঙ্গে নিজস্ব সম্মতি ও নির্বাচনের অধিকার। যা কিনা নারীর আদৌ নেই। সহবাস করবে কী করবে না, কীভাবে সে সহবাসে বেশি আনন্দ পায়, তার অর্গাজম হতে সাহা্য্য করা ,সন্তান নেবে কী নেবে না, কনডম পরতে বলতে পারবে কী পারবে না, পিল খাবে নাকি জন্ম নিয়ন্ত্রণের অন্যান্য ভয়াবহ পদ্ধতি গ্রহণ করবে শারীরিক কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও….. না, এসব কোনো কিছু নিয়েই সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার নারীকে দেয়নি পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজ। যার দেহে জন্ম নেবে সন্তান, তার সিদ্ধান্ত নেবার কোন অধিকারই নেই যে কখন, কোথায়, কীভাবে জন্ম হবে শিশুটির বা কোন পদ্ধতি তিনি আদৌ ব্যবহার করতে চান কি চান না, সঙ্গমে তার ইচ্ছা-অনিচ্ছা !!
৫.
বিশ্বাস করুন, কিছু মানুষ এই লেখার পর উঠে পড়ে লাগবে যে, ছি: ছি: কী বেপর্দা বেহায়া ‘মেয়েমানুষ’ রে বাবা!! কী অশ্লীল কথা বলে নিজের পাপ বাড়াচ্ছে আর তাদের পাপও বাড়াচ্ছি!! অাল্লাহর গজব পড়বে বা এই রকমই কিছু!! এসব তো অনেক শুনেছি কাজ করতে গিয়ে। তাদের জন্য অাসলে বারবার ধর্মের দোহাই দিতেই হয়, ‘আনাস বিন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত: নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, যখন পুরুষ তার স্ত্রীর সাথে সহবাস করে, তখন সে যেন পরিপূর্ণভাবে (সহবাস) করে। আর তার যখন চাহিদা পূরণ হয়ে যায় (শুক্রস্খলন হয়) অথচ স্ত্রীর চাহিদা অপূর্ণ থাকে, তখন সে যেন তাড়াহুড়া না করে। [মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, হাদিস নং-১০৪৬৮] । এমনকি স্ত্রীর যৌনাঙ্গকে সঙ্গমের জন্য প্রস্তুত না করেই তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়াকে- যা স্ত্রীর জন্য অত্যন্ত কষ্টকর- ইসলামে ‘পশুর ন্যায় সঙ্গম করা’ বলে অভিহিত করা হয়েছে এবং সঙ্গমের আগে শৃঙ্গার এবং আবেগপূর্ণ চুম্বন করাকে ‘সুন্নাতে মু্‌ওয়াক্কাদাহ’ বলা হয়েছে। “সঙ্গমের আগে শৃঙ্গার এবং আবেগপূর্ণ চুম্বন করা সুন্নাতে মু্‌ওয়াক্কাদাহ এবং এর অন্যথা করা মাকরূহ।” (ফাইজ আল-ক্বাদির, ৫/১১৫, দ্রষ্টব্য: হাদিস নং ৬৫৩৬)।
৬. 
এমনও দেখেছি কাজ করতে গিয়ে যে, বিয়ের পরই স্বামী কোন পদ্ধতি ব্যবহার না করেই শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে যান। স্ত্রী যতবারই বলেছে কনডম ব্যবহার করতে, ততবারই তার স্বামী অকথ্য ভাষায় গালাগালি করেছে এবং মারধর করেছে। মারধর করে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের সময় অনেক সময় স্ত্রী অজ্ঞানও হয়ে যেতো। তারপর যখন স্ত্রী সন্তানসম্ভবা হলো, তখন তাকে সন্তান নষ্ট করে ফেলতে বললো!! 
অথবা সন্তান নষ্ট করতে বললো স্বামী, স্ত্রীর মতামত না নিয়েই ডাক্তারের কাছে গেল; কিন্তু স্বামী ডাক্তারের সম্মতি না পেয়ে কিছু বুদ্ধিদাতার সাহায্য নিলো, যারা ওষুধ ও শেকড় দিয়ে গর্ভপাতের পরামর্শ দিলো। স্ত্রীর ওপর জোরজবরদস্তি শুরু হলো। তারপরেও স্ত্রীর গর্ভ যখন নষ্ট হলো না, তখন স্বামী স্ত্রীর সম্মতি ছাড়াই বারবার যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতো। 
নারীদের ‘কাঠি, কপার-টি’ ইত্যাদি নানা ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করানো হচ্ছে। প্রতিটিই পদ্ধতি হিসেবে অত্যন্ত ভয়াবহ; কিন্তু ব্যবহারকারী সব নারীর একই কথা, স্বামীরা জোর করে নিয়ে এসেছে। অনেকে আবার লুকিয়ে এসে খুলেও গিয়েছে ব্যথা লাগে বলে; কিন্তু আবার তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই পরতে হয়েছে।
৭.
দরিদ্র এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ!! দারিদ্র তাদের অভ্যাস, চিন্তায় অার চর্চায়, দারিদ্র সমস্ত সমাজ ব্যবস্থাতেই!! নারীর ‘অধস্তন’ পরিচয় আরও প্রকট হয়ে উঠেছে!! আমাদের এই সমাজে পাবলিক-প্রাইভেট সব পরিসরেই শিক্ষিত, স্ব স্ব ক্ষেত্রে যতই ক্ষমতাশালী হয়ে থাকুক না কেন, তাদের কন্ঠস্বর খুব কম ক্ষেত্রেই প্রতিরোধ করতে পারে বা প্রতিরোধ করে সফল হতে পারে। যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে নারীর ইচ্ছা-অনিচ্ছা, সম্মতি, মতামত এসবই সমানভাবে গুরুত্বের দাবি রাখে। আর গুরুত্ব না দিয়ে নারীকে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয় প্রতি মুহুর্তে; সেই সাথে থাকে অবহেলা আর তুচ্ছ করার প্রবণতা, যা আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোরই প্রতিচ্ছবি মাত্র। 
অামি অাসলেই জানি না যে কীভাবে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব!! শুধু জানি একটি সম্পর্কে সম্মান আর ভালবাসার সাথে সাথে হয়তো পারস্পরিক বোঝাপড়াটি থাকাটাও অত্যন্ত জরুরি।
লেখক: নৃবিজ্ঞানী, গবেষক ও ব্লগার, জার্মানি
শেয়ার করুন:
  • 852
  •  
  •  
  •  
  •  
    852
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.