৭১ এ নির্যাতিত নারীর সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি কেন?

শ্রাবণী এন্দ চৌধুরী:

বেশ কিছুদিন ধরে একটি বিষয় লক্ষ্য করছি আমার প্রিয় কিছু মানুষের লেখায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় কত মেয়ে অত্যাচারিত হয়েছে? চিরকাল লেখা হয়েছে তিন লক্ষ, যেটা আমার মতো অনেকেই মেনে নেননি। হঠাৎ করে এখন দেখছি সেই সংখ্যাটি কমে দুই লক্ষ, দুই লক্ষাধিক দাঁড়িয়েছে।

আমরা ৭১ এর মেয়ে। বাংলাদেশেই ছিলাম। আমার উপর যথেষ্ট মানসিক অত্যাচার হয়েছে, সেই বৈকল্য আজো আমি বয়ে চলেছি। আমরা বাংলাদেশের একটি ছোট শহরে ছিলাম। পটুয়াখালী। সার্কিট হাউস আমাদের বাড়ির কাছেই ছিলো। সেখানে পাক আর্মিরা থাকতো। বিভিন্ন গ্রাম থেকে মেয়েদের এনে অত্যাচার করে মেরে ফেলা হতো, আর যারা বেঁচে থাকতো তাদের বন্দী করে রাখা হতো।

স্বাধীনতার পর সার্কিট হাউসে সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মচারিরা ঢুকে এক অবর্ণনীয় অবস্থা দেখেছিলেন। শতাধিক মেয়ে বন্দী। গায়ে সুতোও নেই। কেউ বদ্ধ পাগল, কেউ অন্ত:সত্ত্বা। এদের মধ্যে অনেকে চোখের সামনেই দৌড়ে গিয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিল। বাকিদের কেউ গ্রামে ফিরে যেতে পারেনি। কেউ অনাহারে, বিনা চিকৎসায় মারা গেছে, কেউ কেউ ভিক্ষা করেছে।

এই দশ মাসে পাকিস্তানি নরপশুরা যে কতো মেয়েকে ধরে এনে অত্যাচার করে মেরে ফেলেছে তার কোনো হিসাব নেই। অনেক মেয়ে গ্রামেই ধর্ষণের শিকার হয়ে মারা গেছে। অনেক পরিবার স্বীকারই করেনি তাদের পরিবারের মেয়েরা অত্যাচারিত হয়েছে। কেউ আবার সেই মেয়েদের গ্রহণ করেনি সমাজের ভয়ে। অনেকে পরে আত্মহত্যা করেছে, কিন্তু পরিবার জানতে দেয়নি কেন আত্মহত্যা করলো। এই ধরনের ঘটনা বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে, গঞ্জে, শহরে ঘটেছে।

আচ্ছা, তোমরা কেউ কি জানো সেই ভয়াল রাতে রোকেয়া হলে কতো মেয়ে ছিলো, কতো জন বুয়া ছিলো? হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া কেউ জানে না। জানতে দেয়া হয়নি। স্বাধীনতার পর শুধু বলা হয়েছে চুপ চুপ, কেউ যেন না জানে। যাদের ‘সম্ভ্রম’ হানি হয়েছে ভুলেও নাম মুখে আনবে না। কেউ কিছু জানতে চাইলে বলবে জানো না। তখন ‘সম্ভ্রমহানি শব্দটির গুরুত্ব বুঝিনি।

এখন বলি, ‘সম্ভ্রম’ আবার কী? আর যদি যায়ই, তবে আমার মা-বোনের যাবে কেন? সম্ভ্রম গেছে ওই খুনি শয়তান, পাষণ্ড, দানব পাকিস্তানিদের। তারা কি ফিরে গিয়ে তাদের বৌদের, মেয়েদের বলেছে যে তারা একেকজন কী নৃশংসতা চালিয়েছে যুদ্ধের পাশাপাশি, তারা একেকজন পারভার্ট, খুনি, ধর্ষক?

আজ আমরা যে স্বাধীন দেশে বাস করছি, এর পেছনে এই মেয়েদের অবদান স্বীকার করতেই হবে। তিন লক্ষের অনেক অনেক বেশি মেয়েরা অত্যাচারিত (ধর্ষিত) হয়েছে। ভাইরে, দুই লক্ষ বলে বাকীদের কেন অস্বীকার করছি? তাঁদের প্রত্যেকটি রক্তের ফোঁটার কাছে আমরা সবাই ঋণী।

শেয়ার করুন:
  • 387
  •  
  •  
  •  
  •  
    387
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.