মা শুনে যেতে পারলেন না

জাহীদ রেজা নূর : আমার মনে পড়ছে মা নূরজাহান সিরাজীকে। আলী আহসান মুজাহিদের ফাঁসির রায় ঘোষণা হলো। মা শুনে যেতে পারলেন না। গত ২১ ডিসেম্বর তিনি চলে গেছেন। একাত্তরের ১০ ডিসেম্বর আমার বাবা ‘দৈনিক ইত্তেফাক’-এর নির্বাহী ও বার্তা সম্পাদক সিরাজুদ্দীন হোসেনকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল আলবদর বাহিনী। এর পর থেকেই আমার মা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কী অসহায় জীবনযাপনই না করে গেলেন! সেই ১০ ডিসেম্বরের অভিশপ্ত রাতে ঘুম থেকে উঠে পাঁচ বছর বয়সী আমি দেখেছিলাম মায়ের কান্না। বাবা যে একেবারেই চলে গেছেন, সেটা কি আর তখন বুঝতে পেরেছিলাম! জীবনযাপনে দিনে দিনে পরিবর্তন আসা শুরু করার পর ধীরে ধীরে তা অনুভব করেছি। নূরজাহান সিরাজী, বাবার আদরের ‘নূরী’ আমাদের চলার পথ সহজ করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করে গেছেন। বাবাকে হারানোর বছর কুড়ি পর যখন একটু একটু করে অভাব কেটে যেতে থাকল, তখন আমরা চেষ্টা করেছি মাকে একটু ভালো কিছু খাওয়াতে। কিন্তু এত দিনের অভ্যাসের কারণে বাসি খাবারই খেয়ে গেছেন তিনি। সবার খাওয়া শেষে যা বাঁচত, সেটাই ছিল মায়ের খাওয়া। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত চাহিদাহীন ছিলেন তিনি।
ছোট্ট একটা শরীরে কী অসাধারণ শক্তি ধারণ করতেন নূরজাহান সিরাজী! ভাবতে অবাক লাগে, দুঃসময় পাড়ি দেওয়ার সময় কখনোই আমাদের ভেঙে পড়তে দেননি। ঈদের সময় আমরা ছোট তিন ভাই-ই কেবল পেতাম নতুন জামাকাপড়। আগের বছরে বানানো ট্রাউজার তত দিনে গোড়ালি ছেড়ে ওপরে উঠে আসত। আমরা ছিলাম বাড়ন্ত, তাই নতুন জামাকাপড় না দিলে পরার মতো কিছু থাকত না। মনে পড়ে, এক ঈদে আমাদের তিনজন ছাড়া শুধু সেলিম ভাইকেই (পঞ্চম ভাই) ফুটপাতের ঝুড়ি থেকে ৪০ টাকা দিয়ে একজোড়া স্যান্ডেল কিনে দেওয়া হয়েছিল। সবচেয়ে বড় তিন ভাইয়ের দুজন বাইরে গেলে তৃতীয় জনকে বসে থাকতে হতো বাড়িতে, কারণ বাইরে যাওয়ার পোশাকই ছিল দুজনের মতো। একজন ফিরলেই কেবল অন্যজন বাইরে যেতে পারত। সোহাগ পরিবহনে যখন গ্রামের বাড়ি মাগুরার শরুশুনা গ্রামে যেতাম, তখন আমাদের পরিবার বাদে অন্য সবাইকেই সকালের নাশতা দিত পরিবহন কর্তৃপক্ষ। ছোট আমরা অবাক হয়ে অন্যদের নাশতা খাওয়া দেখতাম। টিকিট কাটার সময় ওই নাশতার টাকাও জোগাড় করা যেত না বলে কম দামে নাশতা ছাড়া টিকিটই কাটতে হতো। আমার মা এ সবই সহ্য করেছেন। তখন তাঁর চোখের জল কীভাবে লুকাতেন মা, জানতে ইচ্ছে করে।
নূরজাহান সিরাজীর কথা বলতে গেলে শেষ হবে না। সে কথা থাক। শুধু বলব, জীবনের এই পুরোটা পথ মানুষটি পাড়ি দিয়েছেন একাকি সংগ্রাম করে। মাঝে মাঝে শুধু বলতেন, ‘তোর বাবার খুনের কি বিচার হবে না?’
আমরা কোনো উত্তর দিতে পারতাম না। কারণ, তত দিনে টেলিভিশনের কল্যাণে আমার মা দেখেছেন মতিউর রহমান নিজামী আর আলী আহসান মুজাহিদের গাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা বলা হয়েছিল। বিচার শুরু হওয়ার পর আমরা আশায় বুক বেঁধেছিলাম। সিরাজুদ্দীন হোসেন কখনোই আমাদের ছেড়ে যাননি। তাঁর লেখার মাধ্যমেই বারবার নতুন করে চিনে নিতাম তাঁকে। এরই মধ্যে ন্যুরেমবার্গ ট্রায়াল, কম্বোডিয়া, রুয়ান্ডা, কসোবোর গণহত্যা ও তার বিচার নিয়ে তথ্য জানার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হলো। প্রজন্ম ’৭১-এর শহীদ-সন্তানেরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে বারবার সোচ্চার হয়েছে বিভিন্ন সময়। আমার মা যখনই পেরেছেন, আমাদের সঙ্গে রাস্তায় নেমেছেন।
আমার মনে পড়ে, বছর পাঁচেক আগে শহীদ মিনারে ২৫ মার্চ কালরাতে আমার মা মশাল জ্বালিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বারবার গেছেন স্মৃতিসৌধে। রক্তচাপ আর হৃৎপিণ্ডের অসুখ তাকে নিরস্ত করতে পারেনি। আমরাই বকা দিতাম, ‘কী করছেন, মা! আপনার এখন বাড়িতে রেস্ট নেওয়া দরকার।’ অসহায়ভাবে আমাদের দিকে তাকাতেন। সেই অসহায় চাহনির এমন শক্তি ছিল যে, আমরাই বিব্রত হতাম। বুঝতাম, আমরা হারিয়েছি বাবাকে, তিনি হারিয়েছেন স্বামীকে। ৩২ বছর বয়সে আট সন্তান নিয়ে তিনি বিধবা হয়েছেন। ছেলেরাই তাঁর জীবন। কিন্তু যখনই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি নিয়ে দাঁড়াতে হয়েছে, তখন তাঁর অন্য রূপ। ৪২ বছরের সংগ্রামী জীবনে তিনি বারবার স্বামী হত্যার বিচার চেয়েছিলেন। তাই, তাঁকে রাজপথে দাঁড়ানোয় বাদ সাধিনি আমরা।
বদর বাহিনীর প্রধান আলী আহসান মুজাহিদ আমাদের এই কষ্ট বুঝবে না। এই একই কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে ৩০ লাখ শহীদের স্বামী/স্ত্রী ও সন্তানদের। একাত্তরে মুজাহিদ কী কী করেছে, তার বিবরণ পাওয়া যাবে তাদেরই মুখপত্র ‘সংগ্রাম’ পত্রিকায়। বাংলাদেশকে অস্বীকার করেও যে এই দেশের মন্ত্রী হওয়া যায়, সেটা দেখিয়েছে মুজাহিদ। মুজাহিদের প্রতি আমাদের কোনো প্রতিশোধস্পৃহা নেই। আমরা কেবল চাইছি, কলঙ্কমুক্ত হোক দেশ। যে আদিপাপ আমাদের প্রতি মুহূর্তেই ক্ষতবিক্ষত করে, সে পাপ মোচন হওয়া দরকার। আলী আহসান মুজাহিদসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকর হওয়ার মাধ্যমেই খুলে যেতে পারে আদিপাপ থেকে মুক্ত হওয়ার পথ।
আমি শুধু আমার মা নূরজাহান সিরাজীকে বলব, ‘মা, ৪২ বছর আপনি যে যন্ত্রণা ভোগ করে গেছেন, তা লাঘব করতে পারিনি আমরা। আমাদের ক্ষমা করুন। কিন্তু মুজাহিদের ফাঁসির রায় শোনার পর আপনার মুখটাই সবার আগে মনে ভেসে উঠল কেন, সেটাও বোঝার চেষ্টা করুন। এবার যখন মিরপুরে আপনার কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়াব, তখন এই আমি বা আমরা ভাইয়েরা অন্তত আপনাকে বলতে পারব, মা, আপনার প্রতীক্ষার অবসান ঘটেছে। আফসোস, আপনি শুনে যেতে পারলেন না।’

(দৈনিক প্রথম আলো থেকে সংগৃহীত)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.