সমাজ পরিবর্তনের নেতৃত্বে নারী আড্ডা ক্লাবের সদস্যরা

0

ফারুক রহমান:

নদীবেষ্টিত এলাকার মানুষকে প্রতিনিয়ত নদীভাঙনের আশংকায় থাকতে হয়। বর্ষা মৌসুম এলেই তারা ভাবনায় পড়ে যান কখন তাদের ভিটেবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে যায়! নদীভাঙনে শুধু তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুই হারিয়ে যায় না, তাদের সর্বস্ব হারাতে হয়। ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় আপনজনের সাথে সম্পর্ক।

এই জনপদের নারীদের জীবনে নদীভাঙন আর দারিদ্র্য দুই-ই ভয়াবহ প্রভাব রেখে যায়। নদীভাঙনে তারা সর্বস্বান্ত হওয়ার পাশাপাশি জীবনেও একা হয়ে পড়েন। সেই সুযোগে স্বামী নামে পুরুষটিও তাদের ফেলে অন্য নারীর কাছে চলে যায়। সমাজে তখন সেই নারীদের দেখা হয় বাঁকা চোখে। সন্তানসহ সেই নারীদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে। তবে দিন পাল্টে যাচ্ছে। মেয়েরা নিজেরাই এখন নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনে এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় কিছু বেসরকারি সংস্থা।

সামান্য সহযোগিতা আর কয়েকটি প্রশিক্ষণই বদলে দিয়েছে নদীপাড়ের এসব অসহায় নারীকে। এই নারীরা এখন আর কারও দয়া-দাক্ষিণ্যে বেঁচে থাকে না। তারা এখন নিজেরা যেমন স্বাবলম্বী হচ্ছেন। অন্য আরও অনেক নারীকেও স্বাবলম্বী হতে সহযোগিতা করছেন। গড়ে তুলেছেন ছোট ছোট সংগঠন। ছোট ছোট সঞ্চয়ের মধ্য দিয়ে স্বপ্ন দেখছেন বড় কিছু করার।

দেশের দক্ষিণ অঞ্চলের জেলা পিরোজপুর। নদী-খাল-আর জলাভূমি বেষ্টিত এই জনপদ। এখানকার মানুষের যোগাযোগের বড় মাধ্যম নদীপথ। তবে এই নদী প্রতিবছরই অনেক মানুষের সর্বস্ব কেড়ে নেয়। এখানকার নারীরা মূলত: নদীভাঙনে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব অসহায় নারীকে সহযোগিতা করতে, স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা ‘ডাক দিয়ে যাই’। সংগঠনটিকে সহযোগিতা করছে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা অক্সফাম বাংলাদেশ।

পিছিয়ে পড়া নারীদেরকে স্বাবলম্বী ও সমাজে নেতৃত্বদানের যোগ্যতা অর্জনের লক্ষ্যে অক্সফামের আর্থিক সহযোগিতায় Cash for Work (CFW) & Resilience through economic empowerment climate adaptation leadership and learning-REE-CALL projectএর আওতায় স্থানীয় উন্নয়ন সংগঠন ডাক দিয়ে যাই পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর ও ইন্দুরকানি উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে ২০১১ সাল থেকে কাজ করছে। 

প্রকল্পের শুরুতে পিরোজপুরের নাজিরপুর ও ইন্দুরকানি উপজেলায় ডাক দিয়ে যাই সংস্থা ১৪৬টি গ্রুপ তৈরি করে। সেখানে সদস্য রয়েছেন ৬০০০। এসব সদস্য তাদের গ্রুপে প্রতি মাসে একবার সভায় মিলিত হয়। যেখানে নারী নির্যাতন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, সামাজিক অন্যায়-অত্যাচার প্রতিরোধ, কিভাবে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হওয়া যায়, সন্তানদের শিক্ষাদান, সামাজিক কুংস্কার, ধর্মীয় গোড়ামি, স্থানীয় সরকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা করেন। তারা সেখানে আলোচনার ভিত্তিতে মাসিক ৫০-১০০ টাকা করে সঞ্চয়ও করছেন। এই সঞ্চয়ের টাকা তাদের সংগঠনের নামে (সিবিএ) ব্যাংক একাউন্ট খুলে সেখানে জমা হচ্ছে প্রতি মাসে। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন ব্যবসাতেও নিয়োগ করছেন এই টাকা।

নারীদের স্বাবলম্বী করতে প্রকল্পের আওতায় ২৪টি গ্রুপে স্মার্টফোন দেওয়া হয়েছে। স্মার্টফোনের মাধ্যমে তারা প্রযুক্তির ব্যবহার করে উপকৃত হচ্ছে। যুক্ত হচ্ছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধার ইন্টারনেট কানেকশনে।

মিলন রানী শিকদার:

পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার বেকারখাল শাখারিকাটি বাজারে কথা হচ্ছিল মিলন রানী শিকদারের সাথে। পাশাপাশি তার দুটি দোকান। একটি খাবার হোটেল অন্যটি মোবাইল এক্সেসরিজ ও বিকাশ এবং মোবাইল রিচার্জের দোকান। তার একমাত্র ছেলেটি এখন স্নাতক পড়ছে। ছেলেটি যখন কলেজে যায় তখন মিলন রানীকে একাই দুটি দোকান চালিয়ে সামাল দিতে হয়। মাত্র ১২ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল মিলন রানী শিকদারের। স্বামীর বাড়িতে যেয়ে যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল মিলনের, তা মনে হলে আজও তিনি শিউরে ওঠেন। স্বামীর বাড়িতে যেয়ে না খেয়েই তাকে বছরের পর বছর পার করতে হয়েছে। একসময় কোল আলো করে আসে এক পুত্রসন্তান। যে সন্তানকে তিনি একাই বড় করে তুলেছেন।

স্বামীর সংসারে প্রতিনিয়ত মারপিট, অত্যাচার, না খেতে থাকা, ঘুমানোর জায়গা না পেয়ে একসময় তিনি মনে করেছিলেন এ জীবনে আর বেঁচে থাকার কোন মূল্য নেই। তার অপরাধ ছিল সন্তান না হওয়া। কিন্তু দেরিত হলেও মিলন রানীর কোল আলো করে ঠিকই এক পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। কিন্তু ততদিনে তার স্বামী সিদ্ধান্ত বদলেছেন। মিলন রানী স্বামীর তার উপস্থিতিতে যখন অন্য এক নারীকে বিয়ে করে বাড়িতে নিয়ে আসেন তখন তার শ্বশুর-শাশুড়ি, ননদ-দেবর কেউই তার পাশে দাঁড়ায়নি। দরিদ্র বাবার বাড়িতে তাকে থাকতে হয়েছে খুব কষ্ট করে। একদিকে নিজের সন্তান। সবমিলিয়ে এক কঠিন মুহূর্ত গেছে তার জীবনে।

এদিকে, তার সন্তান হয়েছে কিন্তু স্বামী তাকে আর বাড়িতে জায়গা দেয়নি। ছেলেকে কোলে করে নিয়ে প্রায় ছয় মাস বাবার বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে স্বামীর বাড়িতে থেকেছেন। কিন্তু স্বামী তাকে ঘরে উঠতে দেয়নি। একদিন সন্তানকে বুকে আগলে এসে ওঠেন বাবা-মার কাছে। সেই তিনি এখন আর্থিকভাবে স্বচ্ছল। নিজের টাকায় ভাইদের ব্যবসা দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। নিজে জমি কিনেছেন। সেখানে তৈরি করবেন আধুনিক মডেলের একটি বাড়ি। বাড়ি করার মতো টাকা এখন তার হাতে আছে। তিনি কিনেছেন ধানের জমি, ভিটেবাড়ি।

এক সময় সিদ্ধান্ত নিলেন তাকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। এরই মধ্যে একদিন দেখা হয় ডাক দিয়ে যাই সংস্থার কর্মকর্তাদের সাথে। তারা তাকে নিয়ে তার দোকানে গঠন করলেন একটি গ্রুপ। বিভিন্ন পর্যায়ে প্রকল্প থেকে ও সরকারি প্রশিক্ষণও পেয়েছেন তিনি। তার গ্রুপের সদস্যরা এখন লক্ষাধিক টাকা সঞ্চয় করেছেন। তিনি এই গ্রুপের সভাপতি।

এলাকার মানুষ তাকে দেখে উদ্বুদ্ধ হয়। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে তার কাছে আছে পরামর্শ নিতে। এলাকার মানুষ তাকে জনপ্রতিনিধি হিসেবে দেখতে চায়। তার গ্রুপে এখন ৪৪ জন সদস্য আছেন। গ্রুপের সঞ্চয় থেকে সদস্যরা ঋণ নিচ্ছেন, জমা দিচ্ছেন। সব হিসাব মিলন রানী একাই সামলান। ইতোমধ্যে ১৫ জনকে ঋণ দেওয়া হয়েছে। তিনি বাজার কমিটি, মন্দির কমিটির সদস্য এবং এলাকার বিভিন্ন সংগঠনের সাথে যুক্ত। মাত্র ৬০ টাকা পুঁজিতে শুরু করেছিলেন চা এর স্টল। এরই মধ্যে ২০১৬ সালে তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে জয়িতা-২০১৬ পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।  মিলন রানী শিকদার এখন ঘুম থেকে ওঠেন ভোট ৪টায়। এই সময় থেকে শুরু হয় তার দিনের কর্মযজ্ঞ। সারাদিন তাকে ব্যস্ত থাকতে হয় নিজের ব্যবসা আর সামাজিক দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে।

সেলিনা বেগম:

শ্রীরামকাটি গ্রামটি নাজিরপুর উপজেলার প্রান্তিক জনপদ। যদিও এখন পিচের রাস্তা হয়েছে গ্রামের মধ্য দিয়ে। তবুও এই এলাকাটি এখনও নদী প্রধান। এই গ্রামে রয়েছে ডাক দিয়ে যাই সংগঠনের নারীর আড্ডা ক্লাব। এই ক্লাবে নারীদের আড্ডায় কথা হয় সেলিনা বেগমের সাথে।

সেলিনা জানালেন তার  স্বামী ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর বাড়ি থেকে কাজের সন্ধানে চলে যায়। কিন্তু দীর্ঘদিন বাড়িতে না ফেরায় এবং স্বামীর সাথে কোনপ্রকার যোগাযোগ করতে না পেরে মহাবিপদে পড়ে যান সেলিনা। এক পর্যায় নদীর ভাঙনে স্বামীর বাড়িতে বসবাসের ঘরও হারিয়ে ফেলেন তিনি। এ সময় তিন মেয়েকে নিয়ে চোখে অন্ধকার দেখেন সেলিনা। অনেক কষ্টে কিছুদিন স্বামীর ভিটে বসবাসের চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর সেখানে থাকা সম্ভব হয়নি। তিরিশের কোটায় বয়স তখন তার আশপাশের মানুষজন তাকে নানাভাবে বিরক্ত করতে শুরু করলো। দীর্ঘদিন স্বামী বাড়িতে আসে না। কোন খোঁজও নেই। একদিকে নিজের, অন্যদিকে মেয়েদের সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে বেকায়দায় পড়ে যান সেলিনা। এক পর্যায়ে তিন মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন। দরিদ্র বাবার বাড়িতে খাবার তো দূরে থাক, থাকার জায়গাও নেই। কী করবেন সেলিনা?

এর মধ্যে বাবার বাড়িতে আসার পর ভিজিটির চাল পাওয়ার সুযোগ হলো। কিন্তু তা দিয়ে তো সন্তানের পড়ালেখা, খাবার, কাপড় কোন কিছুই হয় না। শুরু করলেন কৃষিশ্রমিক হিসেবে মাঠে কাজ করা। কিন্তু দিন পার হতে চায় না। ভাইরা চাইলেন মেয়েদের তাদের বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে। আর সেলিনাকে পুনরায় বিয়ে দেবেন বলে জানিয়েও দিলেন।

কী করবেন সেলিনা? এক পর্যায়ে জানতে পারলেন নারী আড্ডা ক্লাবের। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে পালিয়ে, গোপনে যোগ দেয়া শুরু করছেন নারী আড্ডা ক্লাবে। সামাজিকভাবে নারী আড্ডা ক্লাবকে প্রথমে এলাকার মানুষ বিধর্মীদের কাজ বলে কাউকে আসতে দিতে চাইতো না। সে কারণে সেলিনার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ালো তার বাবা-ভাইরা। সেলিনা এই ক্লাবে এসে সদস্য হলেন। শুরু করলেন সঞ্চয়। পেলেন বিভিন্ন প্রশিক্ষণ। নিজেই ব্যাংকে টাকা জমা দিতে পারেন। যেতে পারেন একা একা উপজেলা সদর নাজিরপুরে। এখন তার মাসিক আয় ৮০০০ হাজার টাকা। বর্গা নিয়ে জমিতে ধানচাষ করছেন। সেলাই মেশিন কিনেছেন। সময় পেলে নকশীকাঁথা সেলাই করেন। তিন মেয়েকে স্কুলে পড়াচ্ছেন। বাড়িতে বেশ কয়েকটি ছাগল আছে। প্রতি বছর কিছু কিছু করে টাকা সঞ্চয় করছেন মেয়েদের ভবিষ্যত ভেবে। নারী আড্ডা ক্লাব তাকে দেখিয়েছে নতুন জীবন। তিনি এখন বাড়িতে বসে এখানকার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নিজে যেমন উপকৃত হয়েছেন অন্য অসহায় নারীদেরকে করছেন সহযোগিতা।

অঞ্জলী রানী হালদার

ঘুরে দাঁড়ানো নারী অঞ্জলী রানী হালদারের সাথে কথা হচ্ছিল তার দোকানে বসে। তিনি এখন একটি দোকান পরিচালনা করেন নাজিরপুর উপজেলা সদরে।

দরিদ্র পরিবারের সন্তান, আবার বিয়েও হলো আরও দরিদ্র পরিবারে। স্বামীর সংসারে যাওয়ার পর দেখলেন বাবার বাড়িতে যে অবস্থায় ছিলেন, সেখানে অবস্থা আরও করুণ। তিনবেলা খাওয়া হয় না। বিয়ে হয়েছে মাত্র ১২ বয়সে। একেবারে শিশু বয়সে। বিশ বছর বয়সের আগেই জন্ম নেয় তিন সন্তান। এরই মধ্যে সংসার জীবনে ঘটে যায় নানান চড়াই-উৎরাই। স্বামী-স্ত্রী দু’জনে চাই বুনে, মাঠে কাজ করে কোনরকমে চলছিল। হঠাৎ ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডরে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় তার সংসার। কারও কোন কাজ নেই। চাই বুনে বিক্রি করার জন্য বিভিন্ন গ্রাম্য মহাজনের কাছ থেকে সুদে টাকা নিয়ে কাজ করছিলেন। সে টাকার পরিমাণ তখন দাঁড়ায় প্রায় দুই লাখের মতো।

পাওনাদারের চাপে একসময় গ্রাম ছেড়ে চলে যান ঢাকায়। কাজ নেন গার্মেন্টসে। সেখানে কাজ করে কিছু টাকা জমিয়ে ঢাকায় স্বামীকে একটি পান-চা এর স্টল করে দেন। এক পর্যায়ে স্বামী-স্ত্রী দু’জনে ঢাকায় থাকেন, আর ছেলেমেয়েদের রেখে যান গ্রামে বাব-মা’র কাছে। সেখান থেকে কিছু টাকা জমিয়ে পাওনাদারদের টাকা পরিশোধ করা শুরু করলেন।

কিন্তু শুরু হলো আরেক বিপর্যয়। ছেলেমেয়েদের ঢাকায় নিয়ে যেতেও পারেন না। কারণ সেখানে যা আয়, তা দিয়ে খরচ মেটে না। আবার তারা বড় হচ্ছে, কাজেই মায়ের কাছেও রাখা সম্ভব হয় না। এক পর্যায়ে ফিরে এলেন পিরোজপুরে। ফিরে এসে ছোট্ট একটি চা এর স্টল দিয়ে শুরু হলো নতুন জীবন। এরই মধ্যে একদিন তার দোকানে আসলেন ডাক দিয়ে যাই সংস্থার এক কর্মকর্তা। সেখানে বসে তার সাথে তার জীবন কাহিনী শুনে তাকে নারী আড্ডা ক্লাবে যোগ দিতে বললেন।

সেখান যাওয়া আসার মাধ্যমে শুরু হলো অঞ্জলী রানী হালদারের নতুন জীবন। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ আর আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে এখন অব্ধলীর হোটেল, মুদি দোকান, চা’র স্টল, গরুর খামার চলছে একসাথে। স্বামী-সন্তানদের নিয়ে সুখেই আছেন। মাসে মাসে কিছু টাকাও জমাচ্ছেন। জমি কিনেছেন, সেখানে বাড়ি তৈরি করবেন। প্রতিবেশিরা তার কাছে আসে পরামর্শ নিতে। এখন তিনি ভাবেন, এতোটা পথ পাড়ি দিতে পারবেন কখনও কি ভেবেছিলেন? তবে সরকারি-বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাকে সহযোগিতা করলে তিনি আরও বড় উদ্যোগ নিতে পারবেন এমনটাই জানালেন।

রুমিয়া বেগম

স্বামী-শ্বশুর-শাশুড়ি আর চারপাশের লোকজন একসময় যাকে খারাপ চরিত্রের নারীর তকমা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল, সেই নারী রুমিয়া বেগম এখন আর কারও কাছে করুণার পাত্র নন। নিজে স্বাবলম্বী, সন্তানদের লেখাপড়া করাচ্ছেন, অনেক অর্থবিত্তের মালিক না হলেও এখন আর তার আগের মতো না খেয়ে থাকতে হয় না। সেদিনের সেই গ্রামের অসহায় নারী রুমিয়া এখন প্রতিবাদী নারীরও প্রতীক। গ্রামে কারও কোন বিপদ হলে সবাই তাকে আগে ডাকে। কেননা রুমিয়া শিখেছেন কিভাবে অসহায়ত্বকে পিছে ফেলে, প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে জীবন সংগ্রামে টিকে থেকে লড়াই করতে হয়।

কিন্তু এই পথ পাড়ি দিতে রুমিয়া বেগমকে অনেক ঘাম ঝরাতে হয়েছে। পিরোজপুরের নাজিরপুর গ্রামের কিশোরী রুমিয়া বেগম যেদিন বধূবেশে স্বামীর বাড়িতে গিয়েছিলেন, তখন তার বয়স মাত্র ১২ বছর। স্বামীর সংসারে সুখ তো দূরের কথা, তিনবেলা খাওয়া জুটতো না। এর মধ্যে ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডর তার জীবনকে বিপর্যস্ত করে দেয়। স্বামী সিডরের আগে বাইরে গিয়েছিল ব্যবসার কাজে। আর ফেরেনি। পরে খোঁজ পেলেও জানতে পারেন স্বামী আরেকজনকে বিয়ে করে সংসার করছেন।

কী করবেন তাহলে রুমিয়া? কিছুদিন থাকলেন স্বামীর ভিটেয়। কম বয়সের নারী স্বামী ছাড়া কি শ্বশুরবাড়িতে থাকা যায়? কী অধিকার আছে তার? বের হতে হলো স্বামীর ভিটে থেকে। চলে আসলেন নাজিরপুর উপজেলার কালিগঙ্গা নদীর তীরে বাবার বাড়িতে।

স্থানীয় বেরসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ডাক দিয়ে যাই এর একটি প্রকল্পের কর্মীদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে যোগ দিলেন নারী আড্ডা ক্লাবে। সেখানে শিখলেন অনেক কিছু। শিখেছেন সভার রেজুলেশন লেখাও। সরকারি দপ্তরগুলোতে কোথায় কী সেবা পাওয়া যায়, তা এখন জানেন। একাকি নারী হিসেবে উপজেলা সদরে যেয়ে সকল কাজ সম্পন্ন করেন। ব্যাংকে টাকা জমা দেন একা একাই। স্মার্টফোন ব্যবহার এখন আর তার কাছে কিছুই না। এসব কিছুই সম্ভব হয়েছে অক্সফামের আর্থিক সহযোগিতা আর ডাক দিয়ে যাই সংগঠনের একান্ত প্রচেষ্টায়। রুমিয়া এখন একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবেই এলাকায় পরিচিত। তবে, আর একটু আর্থিক সহযোগিতা পেলে এগিয়ে যেতে পারবেন এমনটাই আশা করছেন।

সীমা হালদার

পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার অজ পাড়াগাঁয়ে স্বামী বাসুদেব হালদারের সাথে একেবারে শিশু বয়সে বিয়ে হয়ে যায় সীমা হালদারের। ১৫ বছর বয়সে সীমার কোলে আসে শিশু কন্যা। একদিকে নিজে শিশু, অপরদিকে তাকে আরও একটি শিশুকে পালন করতে হয়। আবার স্বামীর সাহচর্য, শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সেবা, সংসার সামলানো। কঠিন এক সময় গেছে সীমার। এসব মনে হলে সীমা ভাবেন, কোনক্রমেই তার মেয়েটিকে উপযুক্ত বয়সের আগে বিয়ে দেবেন না।

এই কঠিন সময়ে সীমার জীবন ছিল নরককুণ্ড। একদিকে নিজের বয়স, মন, শারীরিক সক্ষমতা। সব মিলিয়ে তিনি হাঁপিয়ে ওঠেন। এদিকে স্বামীর আয় নেই। সংসারে অশান্তি আরও প্রকট। শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের চাপে একদিন আলাদা সংসার পাতলেন। কিন্তু সংসার চলবে কী করে? শুরু করলেন সংগ্রাম। মাঠে কাজ, ঠিকে কাজ, যা পান তাই করেন। স্বামীও কিছু আয় করেন। তাতে তো সংসার চলে না। চেষ্টা করতে লাগলেন কোন সহযোগিতা পাওয়া যায় কি-না। গ্রামে তো অনেক সংস্থা অনেক রকম সহযোগিতা করে ঋণ দেয়। তিনি পেতে পারেন কিনা চেষ্টা করলেন। কিন্তু সেখানেও বিপত্তি। তাদের ভিটেবাড়ি বা জমিজমা নেই। নেই ব্যবসা, কে দেবে ঋণ। খুঁজে খুঁজে যোগাযোগ করলেন ডাক দিয়ে যাই সংস্থার কর্মকর্তাদের সাথে। এই সংগঠনটির মাধ্যমেই তার পরিচয় হয় নারী আড্ডা ক্লাবের সাথে। অনেক চেষ্টার পরে তিনি সেখানে সদস্য হলেন।

প্রকল্পটির আওতায় তাকে সামান্য আর্থিক অনুদান দেয়া হয়। সেখান থেকে তিনি নানামুখি প্রশিক্ষণ পেয়ে এখন স্বাবলম্বী। বাড়িতে হাঁস-মুরগি, কবুতর পালন করছেন। গরু মোটাতাজা করছেন। স্বামীকে ব্যাটারিচালিত ভ্যান কিনে দিয়েছেন। জমি বর্গা নিয়ে চাষ করছেন। ঘর তৈরি করেছেন। ব্যাংকে প্রতি মাসে সঞ্চয় করছেন। এলাকার মানুষ, আত্মীয়স্বজনরা এখন তাকে একটু বেশি খাতির করে। পাড়ায় কোনো সমস্যা হলে তার কাছে আসে নারীরা পরামর্শ নিতে। মধ্য তিরিশের সীমা হালদার এখন এলাকায় নারী অধিকারকর্মী হিসেবেও কাজ করছেন। এসব কিছুই সম্ভব হয়েছে প্রশিক্ষণ, তার একাগ্রতা আর সংগ্রামের মাধ্যমেই। অসহায় নারীদের আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সংগ্রাম করছেন প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসে। তিনি চান একটু আর্থিক সহযোগিতা-তাতে তার কাজের পরিধি আরও বাড়াতে পারবেন।

প্রকল্পের টেকনিক্যাল অফিসার খাদিজা আক্তার বলেন, আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা অক্সফামের আর্থিক সহযোগিতায় উপকারভোগী অসহায় নারীদেরকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করতে এবং সমাজের মূল স্রোতে নিয়ে আসতে প্রকল্প থেকে সার্বিক সহযোগিতা করা হচ্ছে। সুফলভোগী নারীরা এখন পিছিয়ে পড়া এলাকায় বসবাস করেও প্রযুক্তির ব্যবহার ও বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা এখন সংগ্রাম করে সমাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এসব সদস্যরা মাসে একবার নারী আড্ডা ক্লাবে সভায় মিলিত হয়। সেখানে তাদের সকলের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে নিজেরাই সমাধানের পথ বের করেন। তাদেরকে আরও সহযোগিতা করতে পারলে তারা একদিকে যেমন নিজেদের অধিকার আদায়ে সক্ষমতা অর্জন করবেন। অন্যদিকে আত্মনির্ভরশীল হয়ে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হবেন। এর দেশ ও সমাজের উন্নতি হবে।

প্রকল্পের প্রোগ্রাম কোঅর্ডিনেটর শ্যামল চন্দ্র পাল বলেন, প্রত্যেকটি দলে সকল সদস্য মাসে একবার সভায় অংশগ্রহণ করে। তখন তারা নিজেদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে। সেখান থেকে তারা সমস্যা উত্তরণের জন্য কী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, তা ঠিক করেন। তিনি নারীদের এই নয়টি দলের সাথে প্রতি মাসে একবার সভা করেন। এছাড়া প্রতিদিন তিনি কোনো কোনো সদস্যের বাড়িতে যান তাদের খামার দেখতে। বিভিন্ন সময় সদস্য নারীরা তার কাছে ফোন করেন বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে। তিনি তখন তাদেরকে যোগাযোগ করিয়ে দেন বিভিন্ন দপ্তরে।

সংস্থাটির উপ-নির্বাহী পরিচালক শাহনাজ পারভীন বলেন, নিভৃত পল্লীর এসব নারী প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর এখন তারা মোবাইল ফোনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেও তথ্য সংগ্রহ করতে শিখেছে। তারা আত্মবিশ্বাসী হতে শিখেছে। এখন এসব নারী আর নিজেদেরকে অবলা মনে করে না। তারা সঞ্চয় করে নিজ নিজ সংসারে অবদান রাখছে। প্রকল্পটি বাংলাদেশের প্রান্তিক নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য একটি মডেল হতে পারে। নারীরা এই প্রকল্পে সংযুক্ত হয়ে নিজস্ব প্রযুক্তিতে বিভিন্ন উদ্ভাবনী কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

লেখাটি ২২৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.