কালশিটে দাগ নিয়েও দীপারা বাঁচে (পর্ব ১ ও ২)

0
মালবিকা লাবণি শীলা:

চোখের নীচের কালশিটে দাগটা লুকাতে মেকআপের সাহায্য নিতে গা জ্বলে যাচ্ছে! কিন্তু কিচ্ছু করার নেই। আজ আপু আসছে। দেখলে প্রশ্ন করে করে জেরবার করে দেবে! বাবা মা নেই দীপার, আপুই সব। কিন্তু দীপা কোনো অভিযোগ করতে চায়না নিজের স্বামীর বিরুদ্ধে। বিয়ের দুই বছরের মধ্যেও মহসীনের ভালো লাগা না লাগাটা ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি ও। এটা কি দীপার ব্যর্থতা? নাহ! মনে হয় মহসীন নিজেই জানেনা ও কি চায়! 
কাল রাতে কী ভীষণ আদরে দীপাকে আপ্লুত করেছে মহসীন! সোনা, লক্ষ্মী ডেকে ডেকে অস্থির করে তুলেছে! পাগল করে তুলেছে। অথচ আধঘন্টা পরেই হঠাৎ রেগে এতো জোরে একটা চড় দিয়ে বসলো! হতভম্ব দীপা কাঁদতেও পারেনি! রাতটা নির্ঘুম কেটেছে। সকালের দিকে অবসন্ন দেহে চোখে ঝাঁপিয়ে নেমেছে ঘুম। টেরও পায়নি মহসীন এর মধ্যেই বাইরে থেকে ঘুরে এসেছে। হালকা শব্দে চোখ মেলে দেখে, বেলী ফুলের অনেকগুলো মালা আর একটা গিফট প্যাক নিয়ে পাশে বসে আছে মহসীন।
কীভাবে রাগ করে থাকবে! অভিমান পুষে রাখবে জানা নেই দীপার, নিজের ওপর নিজেরই এতো রাগ হয় ওর! কেন বারবার একই ভাবে মহসীনকে ক্ষমা করে দেবে দীপা? এমন তো না যে দীপার বিদ্যাবুদ্ধি নেই! তবে একটা বিষয় খুব ভালোভাবে বুঝে গেছে দীপা, মহসীন ওকে ডিভোর্স দেবে না। ওকে একা থাকতেও দেবে না। দীপার মাথায় কিছুতেই আসে না ও কী করবে!
আজ ছুটির দিন, তাই টুকটাক রান্না ছাড়া কিছু করার নেই। বিয়ের পরে প্রচণ্ড সুখে কেটেছে কয়েকটা মাস। দীপার মনে হতো আপুর পরে সত্যিকার অর্থে কেউ এতো ভালোবাসে ওকে। হঠাৎই একদিন গায়ে হাত তুললো মহসীন! খুব কাঁদছিলো দীপা। ব্যথায় নয়, অপমানে। একটু পর মহসীন নিজে কেঁদে ওর পায়ে ধরে ক্ষমা চাওয়াতে দীপা সেই রাতেই বের হয়ে যায়নি। ওকে ক্ষমা না করেও তো থাকতে পারে না দীপা। এতো ছেলেমানুষি কীভাবে যে করতে পারে ও! পরের দিন ফুলে, শাড়ীতে, অলংকারে ওকে ডুবিয়ে দিয়েছে। আদরে আদরে ভুলিয়ে দিয়েছে সব যন্ত্রণা, অপমান।
দীপার আপু নীপা বিকেলের দিকে এসে পৌঁছে ছোটবোনকে এতো সাজগোজ করা দেখে বেশ অবাক এবং খুশী হলেন। বেশ সুখে আছে আদরের বোনটি। মহসীন তো অসাধারণ বিনয়ী আর ভদ্র, আজকাল এরকম ছেলে চোখেই পড়ে না! দুই বোনে অনেক গল্প হয়। কিন্তু দীপা আপুর চোখে চোখ রাখে না ধরা পড়ে যাবার ভয়ে। আপু যাবার পরেই এতোক্ষণের হাসিখুশী  মহসীন দীপার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে –
– বল তোর আপুকে আমার বিরুদ্ধে কী বলেছিস?
ওর শক্ত করে ধরা হাতের মুঠোতে দীপার চুল ছিঁড়তে থাকে পটপট করে। দীপা ভাবছিলো কবে ও এই আপাতস্বর্গ থেকে মুক্তি পাবে! অথবা ও আদৌ মুক্তি চায় কিনা! আধঘন্টা পরে মহসীন যখন কান্নাকাটি করে হাতেপায়ে ধরবে দীপার কি কোনোদিন সাহস হবে একটা চড় বা লাথি কষিয়ে দেবার? সমাজ তো তখন ঠিকই হাঁ হাঁ করে ছুটে আসবে! ওর চোখের নিচের কালশিটে সমাজের চোখেই পড়বে না!
যতদিন পর্যন্ত দীপা নিজে কিছু না করছে। দীপা জানে, বাঁচতে চাইলে ওর নিজেকেই কিছু করতে হবে। না, আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়। অন্যের অপরাধে নিজেকে কেন শেষ করবে দীপা?

চাচা চাচীর সংসারে বড় হচ্ছিলো ওরা দুইবোন। নামকরা স্কুলশিক্ষক চাচার সম্মান থাকলেও স্বাচ্ছন্দ্য নেই তেমন। নীপা দীপার শিল্পী বাবা কয়েক বছর আগে কিসের টানে ঘর ছেড়েছিলেন তা কেউ জানে না, সবাই এটুকু জানে সংসার তার জন্যে ছিলোনা, অথবা তিনি সংসারের। দুই সন্তানকে নিয়ে মা এসে চাচার বাড়িতে উঠলেন। নানা দুশ্চিন্তায় মা স্বাস্থ্য ভেঙে ভেঙে কিছুদিন বিছানায় পড়ে থেকে সব দুশ্চিন্তার অবসান ঘটিয়ে চলে গেলেন। শেষের দিকে দুই মেয়েকে দুর্বল স্বরে ডেকে পাশে বসিয়ে শুধুই কাঁদতেন তিনি। 
চাচা বেতনের পুরো টাকাটাই চাচীর হাতে দিয়ে নিজের লেখালেখির মঝেই ডুবে থাকতেন। যে লেখা ছাপানোর জন্যেও তাঁর কোনো উদ্যোগ দেখা যেতোনা। চাচীর আদর বা শাসন কোনোটারই বাহুল্য ছিলোনা। ডানপিটে দীপাকে সামলাতে হিমসিম খেতে হতো নীপার। ভালো ছাত্রী কিন্তু ভীষণ খামখেয়ালী দীপা ক্লাশের পর ক্লাশ টপকে গেলেও নীপাকে নিয়ে বিপদে পড়লেন চাচা চাচী। এসএসসির দেয়াল কোনমতেই পার হতে পারছেনা নীপা। সুন্দরী বলে বিয়ের প্রস্তাব আসে ঠিকই, কিন্তু এই সার্টিফিকেট ছাড়া শুধু রূপে ভুলবে সেরকম শিক্ষিত ছেলেই বা কই?
গ্রাম থেকে আসা এক আত্মীয়ের কথায় ঠিক করা হয় সদ্য দশম শ্রেণীতে ওঠা দীপা আর নীপা দুজনেই গ্রামের একটি স্কুল থেকে এসএসসি দেবে। যেখানে নকলের ঢালাও প্রচলন, নীপার পরীক্ষা খারাপ হলে দীপার খাতার মলাট বদলে নীপার সাথে পাল্টে দেয়া হবে। পরীক্ষা দিতে গিয়ে সরকারী স্কুল থেকে আসা দীপা অবাক হয়ে দেখে প্রহরারত শিক্ষকরাই নকলের সুবিধা করে দিচ্ছেন! কেউ কেউ নিজেরাই বলে বা লিখে দিচ্ছেন উত্তর! পাশ করে যায় দুজনেই।
নীপার বিয়ে হতেও সময় লাগেনা এক সরকারী কর্মকর্তার সাথে। কলেজ পার হয়ে দীপাও পা রাখে বিশ্ববিদ্যালয়ে। আহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়! এই সেই ক্যাম্পাস! যা একদিন ওদের বাবার পদচারণায় মুখর ছিলো। বরাবর খামখেয়ালী দীপার সময় কাটতে থাকে টিএসসির আর হলের আড্ডায়।
প্রথাগত সমাজ বা জীবনে অবিশ্বাসী দীপা স্বপ্ন দেখে নতুন সমাজের, নতুন জীবনের। সবার জন্যে উজ্জ্বল আগামীর। নিজেকে দেখে এই স্বপ্নের উৎস বিভাস ভাইয়ের পাশে। দুজন মিলে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাহায্য করেছে সাধারণ মানুষদের, দীপার খুব ইচ্ছে ছিলো বিভাস ভাই আর ও মিলে জীবনটা মানুষের কল্যাণে উৎসর্গ করবে। কিন্তু পড়া শেষ করে বিভাস অত্যন্ত স্বার্থপরের মতো চলে যায় দেশ ছেড়ে। দীপা সর্বহারা মানুষের মতো ভেঙে পড়েও নিজেকে সামলে নেয়। এতো দুর্বল মানসিকতা নিয়ে আর যা-ই হোক সমাজ বদলানো সম্ভব নয়। আগে নিজের অবস্থান ঠিক করতে হবে। পরে অন্যকে সাহায্য করা যাবে।
(চলবে)
লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৩,৯৮৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.