পার্বত্য চট্টগ্রাম: রাজনীতির মারপ্যাঁচে দেশহীন এক জনপদ (পর্ব – ৩)

শাশ্বতী বিপ্লব:

নৃগোষ্ঠীর নেতারা ১৯৪৭ এ পার্বত্য অঞ্চলকে ভারত, পাকিস্তান মিয়ানমারের মাঝে ভাগ করে দেয়ার বিরোধিতা করছিলেন শুরু থেকেই। কিন্তু ভাগাভাগি যখন আর ঠেকানো গেলো নাতখন চাকমা অন্যান্য নৃগোষ্ঠী মূলত ভারতের সাথে থাকার দাবি তোলে (Mohsin 1997; Chakma, S. 1986) এই ভাগাভাগিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভবিষ্যত শাসন ব্যবস্থা নিয়ে নৃগোষ্ঠীর নেতারা বেশ কিছু প্রস্তাবনাও উত্থাপন করে।

তারা তিনজন সার্কেল চিফের অধীনে তিনটি মূল সার্কেলকে জাতিগত স্বতন্ত্র মর্যাদা দেয়ার দাবি জানায়যা কিনা প্রশাসনিকভাবে ভারত পাকিস্তান থেকে আলাদা থাকবে এবং সার্কেল চিফ দ্বারা শাসিত হবে। মারমা চিফ আবার বার্মার সাথে ইউনিয়ন করার প্রস্তাব করেন। তবে সকল চিফরাই প্রকারান্তরে এক ধরনের রাজতন্ত্র পাওয়ার আশা ব্যক্ত করেন।

এর মাঝে ব্রিটিশ শাসনামল পরবর্তীতে স্বদেশী আন্দোলনের সময় পার্বত্য অঞ্চলের নৃগোষ্ঠীদের মাঝেও নতুন নেতৃত্ব তৈরি হয়েছে। দেশভাগ নিয়ে এবং দেশভাগের পর পার্বত্য অঞ্চল কীভাবে শাসিত হবে তা নিয়ে এই নেতাদের মাঝেও দুই রকমের মত দেখা যায়।

কামিনী মোহন দেওয়ানের নেতৃত্বে মডারেট দল সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের (monarchy) দাবি তোলে। অন্যদিকে স্নেহা কুমার চাকমার নেতৃত্বে  র‌্যাডিকেলরা প্রজাতন্ত্র সরকার ব্যবস্থার পক্ষে মত দেয়।

দুটোর কোনটাই ধোপে না টেকায় তিন নৃগোষ্ঠীর প্রধান মিলে ১৯৪৬ সালেদ্য হিমালয়ান এসোসিয়েশনগঠন করে। তারা পার্শ্ববর্তী ত্রিপুরা, কুচবিহার এবং খাসি পর্বতমালাসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য একধরনের দেশীয় রাজ্যের (princely stateস্ট্যাটাস দাবি করে। সেইসাথে তারা ভারত সরকারের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের অধীনে একটি কনফেডারেশনের প্রস্তাব আনে। কিন্তু এর কোনটাই শেষ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য হয় না।

এরপর কংগ্রেস নেতা জওহরলাল নেহেরুর মাধ্যমে ভারতের শেষ ভাইসরয় লর্ড লুই মাউন্ট ব্যাটেনের উপর চাপ সৃষ্টি করা হয় যেন র‌্যাডক্লিফ কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করে। কিন্তু বাউন্ডারী কমিশনের স্যার সিরিল র‌্যাডক্লিফ মাউন্ট ব্যাটেনের সে প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন। র‌্যাডক্লিফ যুক্তি দেখান যে, পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র সমুদ্র বন্দর চট্টগ্রাম অরক্ষিত হয়ে পড়বে যদি পার্বত্য চট্টগ্রাম ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। ঠিক যেমন পশ্চিম বাংলার রাজধানী কলকাতা অরক্ষিত হয় পড়বে যদি মুসলিম প্রধান মালদহ, নদীয়া আর মুর্শিদাবাদ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট র‌্যাডক্লিফ কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রামকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করেন।

পার্বত্য নেতারা দেশভাগ কখনোই মন থেকে মেনে নেয়নি। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট স্নেহা কুমার চাকমা রাঙামাটিতে ভারতীয় পতাকা উত্তোলন করেন এবং মারমারা বান্দরবনে বার্মিজ পতাকা উত্তোলন করেন। সহিংস প্রতিবাদ সত্ত্বেও ২১ শে আগস্ট পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বন্দুকের মুখে ভারতীয় পতাকা নামিয়ে নেয়া হয়।

(চলবে)

পর্ব – ২ এর লিংক: https://womenchapter.com/views/21196

পর্ব – ১ এর লিংক: https://womenchapter.com/views/21068

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.